Bartaman Logo
৩১ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সংশয় কি অহেতুক?

ভোটের আগে বিলি করা ফর্মে পাতার সংখ্যা ছিল ১। তাতে নাম ঠিকানা সহ মাত্র ৬ রকম তথ্য জানানোর কথা বলা হয়েছিল। ভোটে জিততেই সেই পাতার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১/১২।

সংশয় কি অহেতুক?
  • ৩১ মে, ২০২৬ ০৪:০০

ভোটের আগে বিলি করা ফর্মে পাতার সংখ্যা ছিল ১। তাতে নাম ঠিকানা সহ মাত্র ৬ রকম তথ্য জানানোর কথা বলা হয়েছিল। ভোটে জিততেই সেই পাতার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১/১২। সব মিলিয়ে ৩০ রকম তথ্য জানাতে বলা হয়েছে। ভোটের প্রতিশ্রুতি ছিল, জিতলে শুধু প্রকল্পের নাম বদলাবে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার হয়ে যাবে অন্নপূর্ণা যোজনা। সব লক্ষ্মীরা (যাঁরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পেতেন) ‘অটোমেটিক’ অন্নপূর্ণা হয়ে যাবেন। এখন বলা হচ্ছে, নৈব নৈব চ। কারণ লক্ষ্মীর শরীরে প্রচুর ‘মেদ’ বসেছিল। কিছু পুরুষও ‘লক্ষ্মী’ সেজে অনুদান নিচ্ছিল। লক্ষ্মীর শরীরের সেই মেদ ঝরিয়ে নতুন চেহারায় অন্নপূর্ণাকে হাজির করা হবে। এ জন্য তিন মাস সময় থাকবে। ফলে ১ জুন থেকে অন্নপূর্ণা যোজনা চালুর ঘোষণাও পুরোপুরি কার্যকর করা যাচ্ছে না। প্রতিশ্রুতি মতো অন্নপূর্ণা যোজনায় মাসে ৩০০০ টাকা করে অনুদান পেতে আরও কিছুদিনের অপেক্ষা। তবে সরকার আশ্বস্ত করেছে, ততদিন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের নিয়মে ১৫০০ টাকা করে পাওয়া যাবে। অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা ও ফর্ম নিয়ে বিস্তর ধোঁয়াশা ও জলঘোলা হতে শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে, ফর্মে জানতে চাওয়া তথ্য নিয়ে। পাশাপাশি ফর্ম জমা দেওয়া শুরু হওয়ার আগেই মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে ৩০ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। ফলে শেষপর্যন্ত কারা অন্নপূর্ণার অনুদানের জন্য বিবেচিত হবেন— তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে অনেকেই সরকারের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান। যদিও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আশ্বস্ত করে বলেছেন, বিচলিত হবেন না, গুজবে কান দেবেন না। 

Advertisement

মূলত সব শ্রেণির, সব অংশের মহিলাদের স্বাধীনভাবে, পরনির্ভরশীল না হয়ে অর্থ খরচের সুযোগ করে দিতে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের ঘোষণা করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। ঘটনা হল, এই সামাজিক প্রকল্পের সাফল্য দেখে বিজেপি শাসিত একাধিক রাজ্য মহিলাদের জন্য অনুদান প্রকল্প চালু করে। তথ্য বলছে, ২০২১-এর বিধানসভা ও ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে মহিলাদের সিংহভাগ ভোট তৃণমূলের ঝুলিতে যাওয়ার অন্যতম কারণ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। এবারের বিধানসভা ভোটে সেই সাফল্য ধরে রাখতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুদান বাড়িয়ে মাসে সাধারণদের ক্ষেত্রে ১৫০০ টাকা করেন মমতা। বিজেপি মমতার চালেই বাজিমাত করতে নাম বদলে অন্নপূর্ণা যোজনা প্রকল্পের কথা ঘোষণার মাধ্যমে মাসে ৩০০০ টাকা অনুদান দেওয়ার প্রচার শুরু করে ভোটের আগে। একটি ফর্মও প্রকাশ্যে আনে। সন্দেহ নেই, এই দ্বিগুণ অনুদানের টোপ মহিলাদের মধ্যে টনিকের মতো কাজ করে। তখন অন্নপূর্ণার যোজনার টাকা পাওয়ার জন্য কোনো শর্ত বা তথ্য দেওয়ার কথা বলা হয়নি। ফলে এবারের নির্বাচনে মহিলাদের প্রচুর ভোট পায় বিজেপি। এখন প্রতিশ্রুতি পূরণের পালা। কিন্তু শুরুতেই বিতর্ক, বিভ্রান্তি আর অজানা আশঙ্কার কালো মেঘ জমেছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুদানপ্রাপ্ত বহু মহিলার মনে। দেখা যাচ্ছে, যেখানে আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা, বয়স উল্লেখ করে এবং অনুদানের টাকা সরাসরি ব্যাংকে পাঠানোর জন্য অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য জানানোই এই প্রকল্পের জন্য যথাযথ হতে পারত, সেখানে গোটা পরিবারের যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য কেন জানতে চাইছে সরকার তা নিয়ে সঙ্গত প্রশ্ন উঠেছে। আবেদনকারীর পরিবারের সকলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ডিটেলস, পরিবারের জাতিগত পরিচয়, বাচ্চারা টিকা নিয়েছে কি না, সকলের পেশা-আয়, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য তথ্যের মতো আরও অনেক কিছু জানতে চায় সরকার। আবেদনপত্রে পরিবারের সংজ্ঞাও বলে দেওয়া হয়েছে। অনেকের মতে, জনগণনা ও জাতিগণনায় সাধারণত যেসব তথ্য জানতে চাওয়া হয়— অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য তার চেয়েও খুব একটা কম তথ্য চাওয়া হয়নি। সবচেয়ে বড়ো কথা হল, এইসব পারিবারিক তথ্য অসাধু হাতে পড়ে ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে তার দায় কি সরকার নেবে? তাই আবেদনপত্রে লিখিতভাবে পরিবারের নাড়িনক্ষত্র জানাবেন কি না তা নিয়ে অনেকেই বেশ দোটানায় পড়েছেন। তাঁরা ভাবছেন, আগে তো এমন শর্ত আরোপ করা হয়নি। 
প্রবল চাপের মুখে পড়ে সরকার অবশ্য এখন ফর্ম সরলীকরণের কথা বলছে। কিন্তু এর পাশাপাশি আবার গোটা পরিবারের যাবতীয় তথ্য চাওয়ার পিছনে যেসব যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা যথেষ্ট হাস্যকর। রাজ্যের সমাজকল্যাণমন্ত্রীর যুক্তি, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আরও অনেক প্রকল্প আসতে চলেছে। তাই একলপ্তে তথ্য সংগ্রহ করে রাখা হচ্ছে। কিন্তু এর প্রয়োজন কী? সরকার চাইলে অন্যভাবেও এই তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। উপরন্তু যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, পরিবারের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে—তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। এটা ঠিক যে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের তালিকায় থাকা ‘জল’ বের করার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। তা কখনো প্রকৃত অনুদানপ্রাপ্ত মহিলাদের হেনস্তার বিনিময়ে বা দুশ্চিন্তায় ফেলে হতে পারে না। অতএব অনুদান দেওয়ার ছলে সরকারের অন্য কোনো ‘এজেন্ডা’ পূরণের চেষ্টা না করাই ভালো। তাতে ভাবমূর্তি রক্ষিত হবে।

সম্পর্কিত সংবাদ