তন্ময় মল্লিক: ‘৪ মে’র পর কাউকে বিজেপিতে নেওয়া হবে না।’ ক্ষমতায় আসার আগেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই ঘোষণা করেছিলেন। রাজ্য সভাপতির এই সিদ্ধান্তকে কুর্নিশ জানিয়েছিলেন দলের বহু কর্মী সমর্থক। কিন্তু, তিনি ‘ভালো তৃণমূলী’দের দলে নেওয়ার ইঙ্গিত দিতেই বিজেপির কর্মী সমর্থকদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ‘রেজিমেন্টেড পার্টি’ হওয়া সত্ত্বেও বিজেপির বহু নেতা কর্মী এর সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ এটা সরকার পতনের কারণ হবে বলেও ভবিষ্যদ্বাণী পর্যন্ত করেছেন। ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই অবস্থান বদল করে শমীকবাবু জানিয়ে দিয়েছেন, আপাতত তিন মাস বিজেপির দরজা বন্ধ। এখন প্রশ্ন, ‘ভালো তৃণমূলী’দের দলে নেওয়া নিয়ে বিজেপিতে কি বিরোধ বেঁধেছে, নাকি ‘বিদ্রোহীদের লেজে খেলাচ্ছে?
বিজেপি নেতৃত্ব তৃণমূলের কাকে কাকে দলে নেবে, কী শর্তে নেবে, বা আদৌ নেবে কি না, সেটা সময় বলবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরেও বিজেপির রাজ্য সভাপতি হঠাৎ তৃণমূল নেতাদের কেন নিতে চাইছেন? কেন তিনি বলতে গেলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে বহু মানুষ আছেন এবং অতীতেও ছিলেন যাঁরা পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় মুখ খুলতে পারেননি বা মুখ খুলে বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন। তাঁরা কড়া নাড়লে তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে।’
শমীকবাবুর এই বক্তব্যে শুধু রাজ্য রাজনীতিতেই নয়, বিজেপির কর্মীদের মধ্যেও তোলপাড় শুরু হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপি কর্মী সমর্থকরা এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকে বলেছেন, ‘এই ভুলটা করবেন না। একই ভুল করেছিল তৃণমূল। সিপিএমের সুযোগ সন্ধানীরা তৃণমূলে ঢুকে দলের নিয়ন্ত্রক হয়ে গিয়েছিল। তাতে লড়াই করে দলকে ক্ষমতায় আনা তৃণমূল কর্মীরা হতাশায় বসে গিয়েছিলেন। এক্ষেত্রেও তারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তাই দয়া করে এই ভুলটা করবেন না।’ যাঁরা এই সমস্ত পোস্ট করেছেন তাঁরা কেউ নিজেকে বিজেপির লড়াকু সেনা, কেউ বিজেপি অনুরাগী হিসাবে দাবি করেছেন।
তবে, শুধু সাধারণ কর্মী সমর্থকরাই নন, নন্দীগ্রামের বহু চর্চিত বিজেপি নেতা প্রলয় পালও রাজ্য সভাপতির সিদ্ধান্তের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছেন। প্রলয়বাবু তাঁর ফেসবুক পেজে বলেছেন, ‘ক্ষমা করবেন মাননীয় রাজ্য সম্পাদক শমীক ভট্টাচার্য মহাশয়। সেদিন আপনাকে স্যালুট জানিয়েছিলাম যেদিন আপনি বলেছিলেন, তৃণমূলের জন্য সমস্ত রকম ঝাঁপ বন্ধ। আর আজকের দিনে যখন দাঁড়িয়ে বলছেন, ভালো তৃণমূল কংগ্রেসকে নিতে হবে। সেই স্যালুটটা দিতে পারলাম না। কারণ তৃণমূল কংগ্রেসের ভালো বলে কিছু হতে পারে না।’
বিজেপির নীচুতলার কর্মীদের বক্তব্য, একুশের নির্বাচনের আগে ‘যোগদান মেলা’ করে পাইকারি হারে তৃণমূলের নেতাদের নেওয়া হয়েছিল। এমনকি, তাঁদের টিকিট পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, লাভ হয়নি। উলটে তাঁরাই দলের হারের কারণ বলে দলীয় সমীক্ষায় উঠে এসেছিল। অথচ এবার বড়ো মাপের কোনো তৃণমূল নেতাকে যোগদান না করিয়েই দল বিপুল সাফল্য পেয়েছে। এই অবস্থায় তৃণমূলের বহু অত্যাচারী নেতা কর্মী গেরুয়া আবির মেখে বিজেপি হতে চাইছে। তা নিয়ে দলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। এরপর রাজ্য নেতৃত্ব দরজা খুলে দিলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বীজ পাকাপাকিভাবে পোঁতা হয়ে যাবে।
তৃণমূলের নেতা-নেত্রীদের বিজেপিতে নিলে নীচের তলায় যে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে, সেটা শমীকবাবুও জানেন। তারপরেও কেন বিজেপিতে ‘ভালো তৃণমূলে’র অন্তর্ভুক্তির কথা বললেন? রাজ্যে বিজেপি ২০৮টি আসন পেয়েছে। দু’ চারটি জেলা বাদ দিলে এই জয়ের পিছনে দলের সংগঠনের ভূমিকা তেমন নেই বললেই চলে। সেটা শমীকবাবুর চেয়ে ভালো কেউ বোঝেন না। তিনি জানেন, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি মানুষের ক্ষোভ এবং ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার হলে রাজ্যের হাল বদলাবে, এই আশাতেই মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। কিন্তু, সব কিছুরই একটা ‘হানিমুন’ পর্ব থাকে। সেই সময় সবই ভালো লাগে। ত্রুটি চোখে পড়ে না। রাজ্যে নতুন সরকারের এখন ‘হানিমুন পর্ব’ চলছে। ফলে এখন সরকার যা বলছে, যা করছে, সবই মানুষের ভালো লাগছে। কিন্তু, ‘হানিমুন’ পর্ব কেটে গেলে মানুষ হিসাব কষা শুরু করবে। কী চেয়েছিল এবং কী পাচ্ছে, তার হিসাব। তখন ত্রুটিগুলো বড়ো হয়ে দেখা দেবে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে লাগে সংগঠন। শাসক দলের সংগঠন মজবুত হলে সরকারের ফাঁকফোকর মেরামতির কাজ সহজ হয়।
বঙ্গ বিজেপির ‘প্রাণভোমরা’ নরেন্দ্র মোদির সরকার। তিন বছর পর লোকসভার নির্বাচন। চব্বিশের নির্বাচনে বিজেপি ‘ইসবার চারশো পার’ স্লোগান দিয়ে আড়াইশো টপকাতে পারেনি। কেন্দ্রীয় সরকার চলছে দুই শরিকের ‘ক্র্যাচে’ ভর দিয়ে। এই পরিস্থিতিতে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনতে গেলে বাংলা থেকে দলকে অনেক বেশি আসন শমীকবাবুদের দিতে হবে। বাংলার নতুন সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বিজেপির রাজ্য সভাপতিও বিরোধী দলের কোমর ভাঙতে তৎপর হয়েছেন। তিনি অঙ্ক কষেই ‘ভালো তৃণমূলে’র প্রসঙ্গটি বাজারে ছেড়েছেন বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে।
দল নির্বাচনে ব্যর্থ হলে নেতৃত্বের দিকে আঙুল তোলাটা ডানপন্থী দলের কালচার। শুধু আঙুল তোলার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকে না, চলে কাদা ছোড়াছুড়ি। এরাজ্যে তৃণমূল হেরে যাওয়ায় সেটাই শুরু হয়েছে। এতদিন যাঁরা তৃণমূলের হয়ে এলাকায় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, ক্ষমতা ভোগ করেছেন, নানান সুযোগ সুবিধে পেয়েছেন তাঁদের অনেকেই এখন শীর্ষ নেতৃত্বের দিকে আঙুল তুলছেন। তাঁদের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, তৃণমূলে প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার লোভ সংবরণ করতে না পারায় দল থেকে বেরতে পারেননি। তাই দল ক্ষমতা থেকে চলে যেতেই মনের আনন্দে নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু করেছেন। বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন। ক্ষমতার ক্ষীর খাওয়া নেতা-নেত্রীদের সমালোচনা শুনে মানুষ হাসছে আর বলছে, ‘হাতি কাদায় পড়লে চামচিকিতেও লাথি মারে।’
নির্বাচনে কোনো দল পরাজিত হলে হারের কারণ বিশ্লেষণ করাটা সেই দলের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। তিন তিনটি টার্ম রাজ্যের ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের এই শোচনীয় পরাজয়ের কারণ কী, তা বিশ্লেষণ করা দরকার। কিন্তু, সেই আলোচনাটা হওয়া উচিত দলের মধ্যেই। দলে সেই পরিবেশ না থাকলে শৃঙ্খলাপরায়ণ নেতারা চুপ করে থাকেন, অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। কেউ কেউ দল ছেড়ে অন্য দলেও যান। কিন্তু দল হেরে যাওয়ায় বা পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ায় যাঁরা প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন তাঁরা নিজেদের ‘বিপ্লবী’ ভাবতেই পারে। কিন্তু, আম জনতার কাছে তাঁদের একটাই পরিচয়, ‘ধান্দাবাজ’।
বিজেপি শেষপর্যন্ত দরজা খুলবে কি না এবং খুললেও কাদের জন্য খুলবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিজেপি সূত্রের খবর, তৃণমূলের নেতা-নেত্রীদের দলে নেওয়ার ব্যাপারে একটা গাইডলাইন তৈরি হবে। সেই গাইডলাইন মেনে যাঁরা বিজেপিতে যোগ দিতে চাইবেন, দলের কোর কমিটিতে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ৪ মে’র আগে তৃণমূলের নেতা-নেত্রীরা বলতেন, ‘যেতে পারি, কিন্তু কেন যাব?’ আর এখন পরিস্থিতি একেবারে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে। বিজেপি বলছে, ‘নিতে পারি, কিন্তু কেন নেব?’
শমীকবাবু বলেছেন, ‘দলের তৃণমূলীকরণ কিছুতেই হবে না। তবে, ভালো তৃণমূলের জন্য দরজা খোলা থাকবে।’ তাঁর এই কথায় তৃণমূলের নেতা-নেত্রীদের একাংশের মধ্যে একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে। ‘ভালো তৃণমূলী’ সাজার প্রতিযোগিতা। আর ‘ভালো তৃণমূলে’র বৈশিষ্ট্য কী, সেটাও বিজেপির রাজ্য সভাপতি বুঝিয়ে দিয়েছেন,‘পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় মুখ খুলতে পারেননি বা মুখ খুলে যাঁরা দলের বিদ্বেষের শিকার হয়েছিলেন।’ ইঙ্গিত স্পষ্ট, বিজেপিতে যোগ দিতে গেলে তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তোপ দাগতে হবে। বিজেপির দিকে পা বাড়ানো নেতা-নেত্রীরা সেই শর্ত মেনে তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তোপ দাগা শুরু করেছেন।
এরপরেও একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যাঁরা পিঠ এবং সম্পদ বাঁচানোর জন্য তৃণমূলকে গালাগালি করছেন বিজেপি তাঁদের না নিলে কী হবে? তখন সব চেষ্টাই জলে যাবে। তাঁদের অবস্থা হবে, ‘না ঘর কা না ঘাট কা।’