Bartaman Logo
৩০ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শিবাজির রাজ্যাভিষেক ও রবীন্দ্রনাথ

উরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন বা আরব সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ পৃথিবীর যেসব প্রান্তে হয়েছে, সেখানের প্রাচীন সভ্যতা একেবারে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে।

শিবাজির রাজ্যাভিষেক ও রবীন্দ্রনাথ
  • ৩০ মে, ২০২৬ ০৪:০০

জিষ্ণু বসু: ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন বা আরব সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ পৃথিবীর যেসব প্রান্তে হয়েছে, সেখানের প্রাচীন সভ্যতা একেবারে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। সেটা দক্ষিণ আমেরিকার মায়া সভ্যতাই হোক বা মিশর কি মেসোপোটেমিয়ার সভ্যতাই হোক। এত উন্নত ঐতিহ্যশালী সভ্যতার আজ কোনো চিহ্ন নেই। আজ পেরুতে কোথাও সূর্যদেবতা পাচাকামাকের মন্দির নেই, কায়রোর রাস্তায় হাঁটলে রামেসাস নামের কোনো ব্যক্তি পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভারতবর্ষ বেঁচে আছে, ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।’

Advertisement

এই অসাধ্য সাধন হওয়ার পিছনে দুটি কারণ খুব স্পষ্ট। প্রথমতঃ স্বদেশি সমাজ। ভারতের ভারতীয়ত্ব বা ধর্ম কোনো রাজপরিবারের বা পুরোহিতকূলের উপর নির্ভরশীল ছিল না। বরং সমগ্র সমাজে ছড়িয়ে ছিল। রাজস্থানে রাজা হূনেদের কাছে হেরে গেলেন, কিন্তু সমাজ হারেনি। শক, হূন সমাজদেহে লীন হয়ে গেল। সেই নতুন রাজারাই ভারতের ধর্মকে বাঁচাতে রাজপুত হয়ে লড়াই করলেন।
অসমে মায়ানমারের থেকে আসা সুকাপ্পা অহম রাজ্য স্থাপন করলেন। সেখানের রাজা হেরে গেলেন কিন্তু সমাজ হারেনি। সুকাপ্পা বংশ মাত্র ৬০ বছরের মধ্যে সাগরদেও হয়ে গেলেন। তাঁরা মা কামাক্ষার অপরূপ মন্দির তৈরি করলেন।
আর দ্বিতীয় কারণ হত ভারতবর্ষের সতত সংঘর্ষের ইতিহাস। এই অহম রাজ্যের লাচিত বরফুকন সরাইঘাটের যুদ্ধে প্রবল প্রতাপশালী মুঘল সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে। ঠিক তেমনই ভূমিকা ছিল শিবাজি মহারাজের। শিবাজি, এক তথাকথিত অন্ত্যজ ঘরের একটি ছেলের মনে হল,
‘‘এক ধর্ম রাজ্য পাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত বেঁধে 
দিব আমি।’’
সেদিন মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী শাসক ছিলেন। বিশাল তাঁর সেনাবাহিনীর। কিন্তু অসহিষ্ণু ছিলেন, নিষ্ঠুরও ছিলেন। সেই প্রবল পরাক্রমশালী আলমগীরকে রুখে দিয়েছিলেন শিবাজি রাজে। ১৬৭৬ সালের জৈষ্ঠ্যশুক্লা ত্রয়োদশীর দিন রাজ্যাভিষেক হয়েছিল শিবাজি মহারাজের। গুরু রামদাস কাশী থেকে পণ্ডিত এনে অসবর্ণ শিবাজির রাজ্যাভিষেক করালেন।
শিবাজিকে গুরু রামদাস তাঁর গৈরিক উত্তরীয় দিয়েছিলেন পতাকা করতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিনিধি কবিতায় লিখলেন, ‘‘বৈরাগ্যের উত্তরীয় পতাকা করিয়া নিও কহিলেন গুরু রামদাস।’’
শিবাজি মহারাজের সঙ্গে সেদিন সারা দেশ যোগদান করেনি বলে বিশ্বকবি দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
‘‘সেদিন এ বঙ্গদেশ উচ্চকিত জাগেনি স্বপনে,/ পায়নি সংবাদ—/ বাহিরে আসেনি ছুটে, উঠে নাই তাহার প্রাঙ্গণে শুভ শঙ্খনাদ—’’।
অগ্নিযুগের শুরুতে বাল গঙ্গাধর তিলক সারা ভারতকে একসূত্রে বাঁধার জন্য শুরু করেছিলেন শিবাজি উৎসব। বঙ্গদেশ কিন্তু সেদিন শিবাজি উৎসবে শঙ্খনাদে জেগে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি করলেন তাঁর নতুন কবিতা ‘শিবাজি উৎসব’।
এবছর হিন্দু সাম্রাজ্যদিবস, শিবাজি মহারাজের রাজ্যাভিষেকের তারিখ ছিল ২৮ মে। এবার শিবাজি উৎসবে, হিন্দু সাম্রাজ্যদিবসে কি নতুন করে বাংলা উচ্চকিত হয়েছে?
বঙ্গজননী ‘শান্তমুখে বিছাইয়া আপনার কোমলনির্মল/ শ্যামল উত্তরী’ সেই বীর রাজাধিরাজ-এর জন্য অপেক্ষা করে আছেন। ‘স্বদেশ সমাজ’ তাঁর রাজ্যাভিষেক দিবস পালন করেছে প্রদীপে আর মঙ্গলঘটে।
লেখক সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে কর্মরত

সম্পর্কিত সংবাদ