Bartaman Logo
২৯ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে

একটি নির্বাচিত সরকার জনগণের জন্য এবং জনগণের স্বার্থে তখনই কাজ করবে, যদি সেটি প্রকৃতই জনগণের হয়। অর্থাৎ যে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার তৈরি হবে তার গোড়ায় কোনো গলদ থাকবে না।

কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে
  • ২৯ মে, ২০২৬ ০৪:০০

একটি নির্বাচিত সরকার জনগণের জন্য এবং জনগণের স্বার্থে তখনই কাজ করবে, যদি সেটি প্রকৃতই জনগণের হয়। অর্থাৎ যে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার তৈরি হবে তার গোড়ায় কোনো গলদ থাকবে না। এমন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে যাবতীয় স্বচ্ছতা মেনে এবং প্রশ্নাতীত নিরপেক্ষতার সঙ্গে। পূর্ণ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রথমেই চাই নির্ভেজাল ভোটার তালিকা। সেখানে এমন ব্যক্তিদের নাম থাকবে না যারা এ-দেশের নাগরিক নয়। মৃত ব্যক্তিদের নাম রয়ে গেলে এবং কারো নাম একাধিক জায়গায় থাকলেও নির্বাচনের স্বচ্ছতা নষ্ট করে দেওয়া সম্ভব। তাই ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে, বিশেষভাবে সংশোধিত ভোটার তালিকা তৈরির উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। এবার এসআইআর শুরু হয়েছিল বিহার থেকে। এই প্রক্রিয়া অতঃপর সম্প্রসারিত হয় পশ্চিমবঙ্গসহ ১২টি রাজ্যে। তবে এসআইআরে লক্ষ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। একযোগে প্রশ্নের মুখে পড়ে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি, মোদি সরকার এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। প্রতিবাদ নেমে আসে রাজপথে। অতঃপর বিবাদ গড়ায় সংসদ এবং উচ্চ ও সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত। 

Advertisement

সেই মামলাতেই বুধবার সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, বিহারে সম্পন্ন এসআইআর বৈধ, অসাংবিধানিকও নয়। অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার অধিকার ইসিআইয়ের রয়েছে। কিন্তু এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া মানেই সেই ব্যক্তি ‘বিদেশি’ বা ‘নাগরিক নন’—এই সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। সেই অধিকার কমিশনের নেই। ২০২৫ সালের ৭ জুলাই থেকে শুরু হয় এসআইআর শুনানি। ৪৯ দিনের শুনানি শেষে গত ২৯ জানুয়ারি রায় ‘রিজার্ভ’ রেখেছিল সুপ্রিম কোর্ট। বিহার, বাংলা প্রভৃতি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন মেটার পরই রায় শোনাল দেশের শীর্ষ আদালত। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর স্বাক্ষরিত সুদীর্ঘ রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম না-থাকলেই ‘ভারতের নাগরিক নন’, এমনটি কাউকে বলা যাবে না। নাগরিকত্ব বিচারের ক্ষমতা ইসিআইয়ের নেই। সেটা খতিয়ে দেখবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতো যোগ্য কর্তৃপক্ষ। যদিও ভোটাধিকার প্রাপ্তির প্রাথমিক শর্ত নাগরিকত্বই। তাই নির্বাচন কমিশন স্রেফ দেখতে পারে, একজন ভোটার ভারতীয় নাগরিক কি না। কারো নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ইসিআই নিতে পারে না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, যাঁদের নাম ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় নেই, তাঁদের তালিকা নির্বাচন কমিশন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে চার সপ্তাহের মধ্যে পাঠিয়ে দেবে। আর ওই তালিকা প্রেরণের কাজটি করতে হবে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুসারে। তারপর সেই সরকারি কর্তৃপক্ষ (মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক) ঠিক করবে বাদ পড়া ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ, রাজ্যে পরবর্তী কোনো নির্বাচনের আগেই। লোকসভা, বিধানসভা, পুরসভা, পঞ্চায়েত প্রভৃতি আসন্ন নির্বাচনের পূর্বেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এসআইআরে বাদ পড়া ব্যক্তিরা তাঁদের নাম পরবর্তী ভোটার তালিকায় তোলার জন্য এই পর্বে আবেদন করতে পারবেন। উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সরকারকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় উঠবে। 
এদিনের রায় মূলত বিহারের এসআইআর মামলার প্রেক্ষিতে হলেও তার প্রভাব পড়বে সারা দেশেই। একইসঙ্গে বিরূপ প্রশ্ন উঠছে পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের এক ঘোষণা ঘিরে। শুভেন্দু অধিকারীর সরকার জানিয়েছে, এসআইআরে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে কিংবা যাঁরা ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন, তাঁরা সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না! রাজ্যের নয়া সরকার বাহাদুরের এই ফরমান সমর্থনযোগ্য নয়। তার বড়ো কারণ, ভোটার তালিকায় নাম বাদ মানে, সুপ্রিম মতেই, একজন ‘বিদেশি’ নন। তার উপর বহু নাগরিকের ক্ষেত্রে ট্রাইবুনালের মতামত এখনো বাকি। ট্রাইবুনালে আরজি জানাবার পর বহুজনের নাম ভোটার তালিকায় একে একে ফিরছেও, তাঁরা ফের ‘ভোটার’ স্বীকৃতি পাচ্ছেন। বস্তুত তড়িঘড়ি এসআইআরের বলি হয়েছেন বহু নরনারী। এই দুর্ভোগ তাঁদের জীবনে কোনোভাবেই প্রাপ্য ছিল না। একে তাঁরা অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যে কাটাচ্ছেন, তার উপর সরকারি প্রকল্পের প্রাপ্য সুবিধা থেকে তাঁদের বঞ্চিত করা যায় না। সেটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে হয়ে যাবে বইকি! কোনো মানবিক সরকার এই পাপাচার করতে পারে না। তাই সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা প্রদান বিষয়ক নয়া নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে রাজ্যকে।

সম্পর্কিত সংবাদ