ভারত শুধুমাত্র ভারতীয়দেরই স্থায়ী বসবাসের জন্য। ভারতের কোষাগারের অর্থ কেবল তাঁদেরই কল্যাণে, উন্নয়নে ব্যয়িত হবে। এটাই ভারত রাষ্ট্রের ঘোষিত নীতি এবং বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর স্পষ্ট অবস্থান। রাষ্ট্রীয় নীতিটি নতুন নয়, বরাবরের। তবু পূর্ববর্তী শাসকরা এই নীতির বাস্তবায়নে যত্নবান ছিলেন না বলেই বর্তমান শাসক দল/জোট বিজেপি/এনডিএর অভিযোগ। কেন্দ্রের এনডিএ সরকারও তাই মনে করে। তাদের দাবি, অবিজেপি দলগুলি দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কেবল ভোটের রাজনীতি করে চলেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার মতলবে তারা উন্নয়ন ছেড়ে গুরুত্ব আরোপ করেছে ভোটব্যাংক নির্মাণে। অবিজেপি দলগুলির ভ্রান্ত রাজনীতি মানুষের স্বার্থপূরণে অক্ষম। দেশকে সুন্দর করে গড়ার পরিবর্তে মানুষের দুর্ভোগ বৃদ্ধি করেছে তাদের নেতৃত্ব। স্বভাবতই অবিজেপি দলগুলিকে এমন কিছু মানুষের উপর ভরসা রাখতে হয়েছে যাদের অনেকে এই দেশের মানুষই নয়। তারা একাধিক পড়শি দেশের নাগরিক। সোজা কথায়, তারা অনুপ্রবেশকারী। এই সমস্যা পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা প্রভৃতি পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতেই প্রবল। এজন্য বিজেপি পার্টি এবং তাদের সরকারগুলি পূর্ববর্তী শাসকদেরকে দায়ী করে। তাদের ব্যর্থতা, দুর্বলতার বিরুদ্ধে বিজেপি লাগাতার সরব রয়েছে।
স্বাধীনতা-উত্তর আট দশকের মধ্যে বেশিরভাগ সময় কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসীন ছিল কংগ্রেস/ইউপিএ সরকার। অল্পসময়ের জন্য সরকারের থাকার সুযোগ পেয়েছিল জনতা পার্টি এবং একাধিক মিলিজুলি সরকার। রাজ্যে রাজ্যেও সরকার গড়ে কংগ্রেস দীর্ঘকাল বিপুল ক্ষমতা ভোগ করেছে। ব্যতিক্রম দক্ষিণ ভারত এবং পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি। শেষোক্ত অঞ্চলগুলিতে কমিউনিস্ট পার্টি এবং আঞ্চলিক দলের প্রাধান্য বজায় ছিল বহুবছর। যেমন পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় একাদিক্রমে বহুবছর কায়েম ছিল সিপিএম-শাহি। সিপিএম বিদায় হতেই পশ্চিমবঙ্গে গদিয়ান হয় তৃণমূল কংগ্রেস। বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেড় দশকের রাজ্যপাট সবেমাত্র শেষ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ সমস্যা এখনো মারাত্মক বলেই মনে করে বিজেপি। পূর্ববর্তী শাসকদের ধারাবাহিক পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার মতো করেই বাংলাকে অনুপ্রবেশমুক্ত করার পণ করেছে দল হিসাবে বিজেপি এবং ডবল ইঞ্জিন সরকার (কেন্দ্রের মোদি সরকার এবং রাজ্যের শুভেন্দু সরকার)। এই কাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে অবশ্য পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত এসআইআর পর্বে। বিশেষভাবে সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে ইতিমধ্যেই কয়েক লক্ষ পুরানো নাম বাদ গিয়েছে। অন্যদিকে, এসআইআর পর্বে বঙ্গ বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকার কঠোর অবস্থান নিতেই এরাজ্যে বসবাসকারী বহু পরিবার প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। তখন তারা দলে দলে চুপি চুপি রওনা দেয় বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে। ওই পরিবারগুলি মিডিয়ার কাছে কবুল করে যে, তারা অনুপ্রবেশকারী। মাত্র দু-চার, বড়ো জোর আট-দশ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে এখানে উঠে এসেছে। তাদের আগমন মূলত জীবিকার তাগিদে। এখানে তাদের অনেকে ইতিমধ্যে আধার, রেশন, প্যান ও ভোটার কার্ড বানিয়ে নিয়েছে। আর ওইসব নথির সাহায্যে কিছু লোক সক্ষম হয়েছেভারতীয় পাসপোর্টও হাতিয়ে নিতে। তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, বিধবা ভাতা, স্বাস্থ্যসাথীর মতো সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পেরও সুবিধা কারো কারো হস্তগত। সব মিলিয়ে স্থায়ী নাগরিকের মতোই সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে তারা।
এবংবিধ অনাচার কাহিনি সামনে এনে, নির্বাচনি প্রচারে বিজেপি সংকল্প ঘোষণা করেছিল যে, তারা রাজ্যে সরকার গড়েই অনুপ্রবেশ সমস্যার বিরুদ্ধে ‘অল আউট’ খেলবে। সেই আপসহীন লড়াই শুরু করেছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। সমানে সংগত করছে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। তারা গ্রহণ করেছে অনবদ্য ‘থ্রি-ডি’ ফর্মুলা—ডিটেকশন, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’! এইমতো রাজ্যের নানা স্থানেচালু হয়েছে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ বা ‘হোল্ডিং সেন্টার’। মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, সরকারি নিয়মে যে বা যারা বিদেশি (বাংলাদশ, মায়ানমার প্রভৃতি দেশের নাগরিক) চিহ্নিত হবে, কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনেই তাদের পত্রপাঠ পাঠিয়ে দেওয়া হবে নিজ নিজ দেশে। এদেশে কিছুদিন তাদের আটকে রেখে সময় ও অর্থের অপব্যয় করা হবে না বলেও ঘোষণা করেছেন তিনি। দেশ অবশ্যই দেশের মানুষের জন্য। এই নীতির বিরুদ্ধে কিছু বলার থাকতে পারে না। তবে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বিদেশি’ বিতাড়নের কাজটি যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গেই হওয়া দরকার। হুজুগ, আবেগ বা ঘৃণা প্রদর্শনকে দূরে রাখতে হবে। সংযমের অভাব অন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। দেখতে হবে, কোনো কারণে যেন একজনও প্রকৃত ভারতীয় নাগরিককে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার ভুল না-করা হয়। ভোটের স্বার্থে বিদেশিদের প্রশ্রয় দেওয়া বা তোষণের চেয়েও বেশি অপরাধ হবে দেশের নাগরিকে দেশের বাইরে ঠেলে দিলে। তাই সাধু সাবধান!