মৃণালকান্তি দাস: ইউনুস জমানার অবলুপ্তির পর যাঁরা ভেবেছিলেন বাংলাদেশ থেকে এবার হাত গুটিয়ে নেবে পাকিস্তান, তাঁদের ভাবনায় কতটা গলদ রয়েছে তার প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ছোট্ট খবরে। জানা গিয়েছে, বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ বেশ কিছু আমলাকে পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিসেস অ্যাকাডেমিতে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। এর সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করেছে ইসলামাবাদ। যদিও বলা হয়েছে, এই প্রশিক্ষণ বাংলাদেশি আমলাদের ‘নেতৃত্ব ও দক্ষতা’ উন্নয়নের জন্য, কিন্তু পাকিস্তানের আসল উদ্দেশ্য আরও প্রসারিত। ইসলামাবাদ চায়, বাংলাদেশি আমলাদের মস্তিষ্কে উগ্র ভারত-বিরোধী ভাষ্যের সঞ্চার, যা আগামী দিনে নয়াদিল্লির মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠবে!
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশকে অকুণ্ঠ সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়েছিল। এই সহযোগিতার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিয়েছেন অনেকে। বাংলাদেশের দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদ যাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরা মনে করেন, ভারতের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানকে দুর্বল করা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা মিললেও, কিন্তু বিরাট একটা পাকিস্তানবান্ধব রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশে রয়েই গিয়েছে। সেইসব শক্তিই এখন বাংলাদেশকে পাকিস্তানের খপ্পরে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। মুখে যাই বলুক না কেন, তাদের একাধিক প্রজেক্ট চলছে ইসলামাবাদের অঙ্গুলিহেলনেই!
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পর আওয়ামি লিগের নেতৃত্বে বাংলাদেশে ভারতের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ রাজনীতি স্বাভাবিকভাবে বিকাশ ঘটেছিল। রাতারাতি খুলে গিয়েছিল ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, কূটনীতি, পর্যটন ও সরকারি পর্যায়ে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত। বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর পাকিস্তান চেষ্টা করেছে বাংলাদেশে নতুনভাবে সুযোগ খুঁজতে আর ভারত চেষ্টা করেছে অর্জিত সুযোগগুলি ধরে রাখতে। তবে ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের আগে পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মোটামুটি একটা স্থিতিশীল পর্যায়ে ছিল। তথাকথিত ‘জুলাই বিপ্লব’ আনে বিরাট পরিবর্তন। মুখোশ খুলে প্রকাশ্যে আসে পাকিস্তানবান্ধব রাজনৈতিক শক্তিগুলি। এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল ইসলামাবাদ!
ইউনুস সরকারের সময় আমদানি বাণিজ্য ছাড়া প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। ভিসা, পর্যটন, কূটনীতি, স্থল করিডর এবং এমনকি ক্রিকেট সম্পর্কেও দেখা গিয়েছে নানা সংকট। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের জেন-জি প্রজন্ম তীব্র ভারত বিরোধিতায় ঝুঁকে পড়ে। এই সুযোগে প্রথম থেকেই পাকিস্তান চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের একটা নতুন কাঠামো তৈরি করতে। মহম্মদ ইউনুস নিজেই একাধিকবার পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পাকিস্তান সমর্থন খুঁজে পায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেও। ইসলামাবাদের বুঝতে অসুবিধে হয়নি, জামাতে ইসলামি ও এনসিপি কট্টর পাকিস্তানবান্ধব এবং বিএনপিকেও কোনোভাবেই পাকিস্তানবিরোধী বলা যায় না। বিএনপি প্রয়োজনে যেকোনো দিকে হেলতে পারে।
ইউনুস জমানায় পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী ইসহাক দার ইউনুস সরকারের সময় বাংলাদেশ সফরে আসেন। তিনি বিএনপি, জামাত ও এনসিপি নেতাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাক্ষাৎ করেন। তাঁর সঙ্গে আসেন পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী। বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, স্বাক্ষরিত হয় বন্ধুত্বের নানা চুক্তি। যদিও কোনো চুক্তি এখনও তেমন সাফল্যের মুখ দেখেনি। এই সময় ভারতের কিছুই করার ছিল না। নয়াদিল্লি অপেক্ষা করছিল বাংলাদেশের নির্বাচন এবং নতুন সরকারের। বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর শোক জানাতে বাংলাদেশে এসে বার্তা দেন, গণতান্ত্রিক পথে সরকার ক্ষমতায় এলে ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ইচ্ছুক। বিএনপিও হাত বাড়িয়ে দিতে সময় নেয়নি।
কিন্তু বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী যেসব শক্তি আওয়ামি লিগের সময় দমিত ছিল, তারা এখন ক্ষমতার বৃত্তের কাছাকাছি। আওয়ামি লিগের অনুপস্থিতিতে তারাই দেশের রাজনীতির বিকল্প শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটাই পাকিস্তানের জন্য বিরাট সুযোগের পথ করে দিয়েছে। পাকিস্তানের টার্গেট, বাংলাদেশের সর্বত্র হস্তক্ষেপ। এর পিছনে রয়েছে আমেরিকা-চীনের ইন্ধন। সেটাই ভারতের জন্য উদ্বেগের। যদিও বিএনপি সরকার প্রকাশ্যে জানিয়েছে, ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায়। তার কারণ, পাকিস্তানের বাণিজ্যিক পরিকাঠামোর দুর্বলতা। বাংলাদেশের ১৭ কোটি লোকের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ অক্ষুন্ন রাখা যেকোনো সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বাজারে চাল, ডাল, পেঁয়াজের সংকট অনেক সময় অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য অস্থির করে তোলে। ইউনুস সরকারের তীব্র ভারতবিরোধিতার সময়ও ভারত থেকে পণ্য আমদানি বেড়েছিল ৭.৮ শতাংশ। বাংলাদেশ যতদিন বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন না করে, ততদিন ভারতের উপর নির্ভরতা থাকবেই। এটা বিএনপি সরকারের অজানা নয়। তবে নয়াদিল্লির বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ যেভাবে ঘনিষ্ঠতা দেখাচ্ছে, সেটা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
জানা গিয়েছে, চুপিসারে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘নলেজ করিডোর’ গড়ে তোলার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ। এর গভীরে লুকিয়ে আছে আত্মঘাতী ফাঁদ। গত ১১ মে ঢাকায় এই কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন করে শিক্ষামন্ত্রী আনম এহসানুল হক মিলন ‘নলেজ করিডোর’কে দুই দেশের সহযোগিতার এক ‘নতুন দিগন্ত’ বললেও একটি মৌলিক প্রশ্ন তিনি সচেতনভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন। প্রশ্নটা হল, সব সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে নিম্নগামী একটি রাষ্ট্রে গিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এমন কী শিখবে, যা তারা নিজের দেশে কিংবা বিশ্বের অন্যান্য উন্নত ও নিরাপদ রাষ্ট্র থেকে শিখতে পারছে না? গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপে যে দেশের অবস্থান পৃথিবীর সর্বনিম্নে, যেখানে প্রতি তিনজন শিশুর একজন শিক্ষাবঞ্চিত আর খোদ নিজেদের শিক্ষা বাজেটই কেটে করা হয়েছে এক-তৃতীয়াংশ, সেই দেশ থেকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?
২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, পাকিস্তানের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বিশ্বের শীর্ষ ৩৫০-এর তালিকায় নেই। কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৩৫৪তম এবং নাস্ট ৩৭১তম অবস্থানে। স্কুল পর্যায়ের চিত্রও একই ধরনের। পাকিস্তানের ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের সাম্প্রতিক ২০২৪-২৫ সালের পিএসএলএম সমীক্ষা অনুযায়ী, পাকিস্তানে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার হার মাত্র ৬৩ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। যেখানে বাংলাদেশের এই হার ৭৯ শতাংশ। ইউনিসেফের তথ্য, পাকিস্তানে ৫ থেকে ১৬ বছরের ২.৫১ কোটি শিশু স্কুলের বাইরে রয়েছে, যা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সেভ দ্য চিলড্রেনের মতে এই সংখ্যা ২.৬ কোটি— অর্থাৎ প্রতি তিনজন স্কুলগামী শিশুর মধ্যে একজন শিক্ষাবঞ্চিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, যারা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল, তাদের মধ্যে অর্ধেক পঞ্চম শ্রেণিতেই স্কুলছুট হয় এবং ৭০ শতাংশ ঝরে পড়ে দশম শ্রেণিতে পৌঁছানোর আগেই। প্রতি তিনজনে মাত্র একজন যথাসময়ে মাধ্যমিক শেষ করতে পারে। শুধু তাই-ই নয়, পাকিস্তান এমন এক দেশ, যারা বর্তমানে তাদের জিডিপির মাত্র ০.৮ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করছে। যা ২০১৮ সালে ছিল ২ শতাংশ। যেখানে ইউনেস্কোর মানদণ্ড অনুযায়ী ৪ থেকে ৬ শতাংশ হওয়া উচিত। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে জনশিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে ২৯ শতাংশ।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে এবং ২ লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি করেছে। ৫৫ বছর পার হলেও পাকিস্তান তার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চায়নি। দেয়নি কোনো ক্ষতিপূরণও। তাদের পাঠ্যপুস্তকে আজও ভুল ইতিহাস পড়ানো হয়। অথচ, আজ বিএনপির শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন যখন ‘ধর্ম, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের মিল’ নিয়ে কথা বলেন, তখন তিনি দুই জাতির অভিন্ন অভিজ্ঞতা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান। এর পিছনে কি দীর্ঘমেয়াদি কোনো অভিসন্ধি রয়েছে?
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। ফুলব্রাইট (ইউএসএ), কমনওয়েলথ (ইউকে), এরাসমাস মুন্ডাস (ইউরোপ), জাপানের মেক্সট, কোরিয়ার কেজিএসপি কিংবা ভারতের আইসিসিআর-এর মতো বিশ্বমানের স্কলারশিপ রয়েছে। এই দেশগুলি নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের তুলনায় বহুগুণ এগিয়ে। এই সব স্কলারশিপের জন্য শিক্ষার্থীদের কীভাবে প্রস্তুত করা যায়, সেই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ না করে সব সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে নিম্নগামী একটি রাষ্ট্র পাকিস্তানে শিক্ষার্থীদের পাঠানোর ব্যাপারে অতি উৎসাহের কী কারণ থাকতে পারে? এটা কি শিক্ষাব্যবস্থাকে পরীক্ষামূলক ল্যাবরেটরি বানানোর প্রয়াস, নাকি পড়ুয়াদের মস্তিষ্কে পাকিস্তান প্রেমের বীজ বোনার চক্রান্ত? যার পরিণতি— চূড়ান্ত ভারত বিরোধিতা!
শুধু শিক্ষাক্ষেত্র নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে থাবা বসিয়েছে পাকিস্তান। জানা গিয়েছে, চলতি বছরের ১১ মে, সোমবার ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর বর্ষপূর্তিতে বাংলাদেশে পা রাখে পাক বিমানবাহিনীর সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। এর নেতৃত্বে ছিলেন ইসলামাবাদ বায়ুসেনার স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এয়ার ভাইস মার্শাল ঔরঙ্গজেব আহমদ। ঢাকা বিমানবাহিনীর পদস্থ কর্তাদের সঙ্গে প্রথমবার বৈঠক করেন তাঁরা। সূত্রের খবর, উন্নত যুদ্ধবিমান চালানোর প্রশিক্ষণের জন্য আগামী দিনে বিমানবাহিনীর পাইলট এবং কারিগরি কর্তাদের (টেকনিক্যাল স্টাফ) পাকিস্তানে পাঠাবে ঢাকা। সেখানে অত্যাধুনিক লড়াকু জেট ওড়ানো, মাঝ-আকাশের কসরত ও লড়াই এবং সামরিক বিমানের রক্ষণাবেক্ষণের পাঠ নেবেন তাঁরা। এর পুরোটাই সারগোদার মুসাফ বায়ুসেনা ঘাঁটিতে করার প্রস্তাব দিয়েছে ইসলামাবাদ। শুধু তাই-ই নয়, এ বছরের জানুয়ারিতে ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ লড়াকু জেট নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করে পাক প্রশাসন। ইসলামাবাদ জানায়, সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিমানটি কেনার ব্যাপারে আগ্রহী বাংলাদেশ। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, ঢাকা-ইসলামাবাদের এই সখ্য ভারতের জন্য মোটেই
স্বস্তির নয়।
মুক্তিযুদ্ধের সাড়ে পাঁচ দশক পরে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক এখনও এক সংকটসীমায় দাঁড়িয়ে, যাকে রাষ্ট্রসংঘের প্রাক্তন মহাসচিব কফি আনান একসময় ‘ফর্ক ইন দ্য রোড’ বলেছিলেন। এই কাঁটাচামচের একদিকে এগোলে মিলতে পারে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা। অন্য পথে গেলে অনিবার্য সংঘাত। কোন পথে তারা এগোবে, এই সিদ্ধান্ত শুধু ভারতকে নয়, বাংলাদেশকেও নিতে হবে। বাংলাদেশকেই ঠিক করতে হবে, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শত্রুতামূলক পরিকল্পনার সহযোগী হবে কি না!