Bartaman Logo
২৮ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিতর্ক তাড়া করছে

শিক্ষামন্ত্রকের বিতর্কে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। ১৯টি রাজ্যে ১১৬টি প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ। বিস্তারিত পড়ুন।

বিতর্ক তাড়া করছে
  • ২৮ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সরকারের যে মন্ত্রক দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর, মোদি জমানায় সেই শিক্ষামন্ত্রক নিয়েই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ছেলেখেলা করা হয়েছে! মেডিকেলে ভরতির প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তোলপাড়ের মধ্যেই যে তথ্য সামনে উঠে এসেছে, তাতে শুধু শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নয়, প্রধানমন্ত্রীরও ‘সাধু সেজে’  থাকা সংগত কি না সেই প্রশ্নও উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ থেকে ২০২৬-এই বারো বছর ১৯টি রাজ্যে অন্তত ১১৬টি প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ সরকারিভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি। শুধু নিট নয়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক নিয়োগের যোগ্যতা নির্ধারক নেট পরীক্ষাকে ঘিরেও অভিযোগ বিস্তর। আবার শুধু প্রশ্ন ফাঁস নয়, মোদি জমানায় কেন্দ্রে ও মূলত ডবল ইঞ্জিনের একাধিক রাজ্যে টাকার বিনিময়ে সাদা খাতা জমা দিয়ে নম্বর পাওয়া, নির্বিচারে গ্রেস মার্কস পাইয়ে দেওয়া, দুর্নীতির গন্ধ পেয়ে রাতারাতি পরীক্ষা বাতিল করে দেওয়া— প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে এসব ঘটে চললেও সুরাহা বা শাস্তির তেমন কোনো নজির প্রায় নেই। আসলে সর্ষের মধ্যেই ভূত ঢুকে বসে রয়েছে। রাষ্ট্রের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার ও মানসিক নির্যাতনের বলি হয়েছেন কমপক্ষে ১০০ জন পড়ুয়া! ২০১৩-তে নিট পরীক্ষার শুরুতে ভাষা নিয়ে দেশজোড়া বিতর্কের পর ওঠে সিলেবাস বিতর্ক। এরপর আসে ভুয়ো পরীক্ষার্থী বিতর্ক! তারপর একে একে ডোমিসাইল বিতর্ক, কাট অব মার্কস-এর বিতর্ক, প্রাইভেট মেডিকেল কলেজগুলিতে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া নিয়ে, সংরক্ষণ নিয়ে বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক প্রশ্ন ফাঁস বিতর্ক। এসবের বলি হয়েছে বহু তাজা প্রাণ। এর দায় কি কেন্দ্রের মোদি সরকার অস্বীকার করতে পারে? 

Advertisement

এই বারো বছরের ‘পাপের’ দিকে আঙুল তুলে জেন-জিরা পথে নামতেই এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং! কিন্তু সামগ্রিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের নামে তিনি যেসব পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছেন তা আপাতদৃষ্টিতে ভালো বলে মনে হলেও তাতেও বিতর্ক ও সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে, কেন এত দেরিতে সরকারের বোধোদয় হল? আর ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে নতুন যাঁকে শিক্ষামন্ত্রী করা হয়েছে, সেই প্রহ্লাদ যোশিকে নিয়েও বিতর্ক কম নেই। তাঁর বিরুদ্ধে বড়ো কোনো দুর্নীতি বা ফৌজদারি মামলার অভিযোগ না থাকলেও তাঁর পরিবারের কোনো কোনো ব্যক্তির দুর্নীতি এবং তা থেকে নিজের দায়ভার ঝেড়ে ফেলার অভিযোগ রয়েছে নতুন শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে। সবচেয়ে বড়ো অভিযোগ হল, গুজরাতে বিলকিস বানোর ধর্ষকদের মুক্তির পক্ষে নাকি জোরালো সওয়াল করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, এর মধ্যে কোনো ভুল নেই! বিরোধীদের অভিযোগ, ২০১৯-২৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী থাকাকালীন সংসদে গুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে আলোচনার সময় সীমিত করে দেওয়া, শোরগোলের মধ্যে তড়িঘড়ি বিল পাস করিয়ে নেওয়ার কাজে সিদ্ধহস্ত ছিলেন নতুন শিক্ষামন্ত্রী। তাই বিতর্ক মোদি সরকারের পিছু ছাড়ছে না। শুধু মন্ত্রী নন, নরেশ পাল গাঙ্গোওয়ার নামে যে আমলাকে নতুন শিক্ষাসচিব করা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধেও অভিযোগ হল, পারিবারিক ব্যবসায় কোটি টাকার বেশি ভরতুকি আদায় করেছেন ওই আমলা। মোদিজির নামজপ করে এঁরাই নাকি মন্ত্রকের সমস্ত জঞ্জাল সাফ করবেন! হতে পারে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি সঠিক নয়। তবু প্রশ্ন থাকে, কোনোরকম ‘বিতর্ক’ নেই স্বচ্ছ ভাবমূর্তির এমন কাউকেই কি মোদি প্রশাসন খুঁজে পাচ্ছে না! যেখানে আন্দোলনকারী ‘ককরোচ’ ছাত্ররা শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের জোরালো দাবিতে সরব। 
শুধু মন্ত্রী-সচিব বদলই নয়, যুব সমাজের সমর্থন ফিরে পেতে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠনের কথাও ঘোষণা করেছেন নরেন্দ্র মোদি। আপাতদৃষ্টিতে এটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু অতীতের দিকে তাকালে এ বিষয়ে মোদি সরকারের আন্তরিকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কারণ, এই প্রধানমন্ত্রীই ২০২৪-এ নিট-সহ কিছু পরীক্ষায় গোলমালের পরে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছিলেন। সেই কমিটির ১০১টি সুপারিশ পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই আবার একটি টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণাকে অনেকে ‘লোকদেখানো’ মনে করছেন। অনেকে আবার একে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হিসাবে দেখছেন। এমনটা মনে করার আরও কারণ হল, প্রশ্ন ফাঁসের মোকাবিলায় ২০২৪-এ একটি আইন তৈরি করে সরকার। সেখানে ৩-১০ বছর জেল এবং ১ কোটি টাকা জরিমানার সাজার কথা বলা হয়েছিল। সেই সময় সংসদে প্রধানমন্ত্রী স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ঘোষণা করেছিলেন, প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। যারা ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলছে তাদের কাউকে ক্ষমা করা হবে না। মোদির সেদিনের হুঁশিয়ারি যে স্রেফ কথার কথা ছিল, এই ২৬-এ প্রশ্ন ফাঁস এবং পরবর্তী ঘটনাক্রমই তার বড়ো প্রমাণ। এখন জরিমানার টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে আর তড়িঘড়ি টাস্কফোর্স গঠন করলেই কি গোড়ার গলদ সমূলে বিনাশ করা যাবে? সে প্রশ্ন উঠছে। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসবাণীতে যুবসমাজ ও পড়ুয়ারা সত্যিই কতটা ভরসা পাবেন সে প্রশ্ন না তুলেও বলা যায় একটা আশঙ্কা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ