Bartaman Logo
২৮ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আরশোলার বংশবৃদ্ধি

আরশোলার আন্দোলনে জেন জি প্রজন্মের নতুন রূপ প্রকাশ। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি মেনে নেওয়ার ফলে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। বিস্তারিত পড়ুন।

আরশোলার বংশবৃদ্ধি
  • ২৮ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত

Advertisement

কয়েকটি দৃশ্য
তাড়া করেছে পুলিশ। ছুটছে আন্দোলনকারীরাও। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল তারা। ঘিরে ফেলল পুলিশকে। লাঠি প্রস্তুত পুলিশেরও। হঠাৎ চারপাশে আরশোলার মতো থিকথিক করা যুব সম্প্রদায় গেয়ে উঠল ‘জন গণ মন অধিনায়ক...’। পুলিশের গোটা বাহিনী, র‌্যাফ, কিউআরটি সব অ্যাটেনশন মোডে। জাতীয় সংগীত হচ্ছে যে! সবাই অপ্রস্তুত। নেমে গিয়েছে লাঠিসোঁটা। ঠোঁট নড়ছে অফিসার থেকে কনস্টেবল প্রত্যেকের। অদ্ভুত আন্দোলন বটে জেন জি’র।
ব্যারিকেডে আটকে দেওয়া হয়েছে পথ। মিছিল যাবে না। ব্যারিকেডে ধাক্কা দিতে শুরু করল পড়ুয়ারা। উলটোদিকে পুলিশের বাধা। সরছে না ওরা। চালাও জল কামান। কিন্তু এ কী! এই আন্দোলনকারীরা দেখি পালানোর বদলে ওই জলের মধ্যেই নাচানাচি করছে! একেবারে ওয়াটার পার্ক বানিয়ে দিয়েছে চত্বরটাকে!
আর এক ব্যারিকেডের গল্প। বেশ কয়েক স্তরীয়। টপকে ওপারে যাওয়া যাচ্ছে না। জেন জি’র তাতেও পরোয়া নেই। তারা ওই ব্যারেকেড খুলে মাথায় করে নিয়ে ছুটতে শুরু করেছে। কেউ আবার ঠেলাগাড়ির মতো গড়িয়ে তার উপর উঠে পড়ছে। এটা আন্দোলন?
তাড়া করতে করতে ক্লান্ত পুলিশ কর্তা। বসে পড়েছেন পথের ধারে। ঘামছেন দরদরিয়ে। পিছনে হাজির হয়ে গিয়েছে জেন জি’র কয়েকজন ‘প্রতিনিধি’। হাতে খবরের কাগজ, কার্ডবোর্ড। যে পুলিশ কর্তা এতক্ষণ তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলেন, তাঁরই মাথায় হাওয়া করছে ছেলেমেয়েরা। 
পুলিশকর্মীর কাঁধে ব্যাগ। অন্য কাঁধে বন্দুক। মাথায় হেলমেট। পিছনে দাঁড়িয়ে গেল দু’জন... ‘আঙ্কল, ব্যাগে কী আছে? কাঁদানে গ্যাসের শেল? আমাদের দিকে ছুড়বেন না? ছুড়ুন না, প্লিজ।’
এরা হল জেন জি। এটাই তাদের আন্দোলনের ধরন। তারা দেখে না ব্যক্তিস্বার্থ। এই প্রজন্ম অপেক্ষা করে। তারপর আওয়াজ তোলে। ন্যায়ের পক্ষে। ওই যে মেয়েটি উঠতে পারছে না... পায়ে পুলিশের লাঠির বাড়ি খেয়েছে। সে কি নিট পড়ুয়া? না। তাও সে এসেছে। মার খেয়েছে। তারপরও বাড়ি যায়নি। বসে আছে ফুটপাতের ধারে। ঠিক যেখানে পুলিশকর্মীরা বসে আছে লাঠি-ঢাল নিয়ে। তারাই মেরেছে এই আন্দোলনকারীদের কিছুক্ষণ আগে। সে বলছে, ‘আঙ্কল, উঠতে পারছি না। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলুন।’ কী বলবেন এদের? রসিক? নাকি সহজাতভাবে সকলকেই আপন করে নেওয়ার ক্ষমতাধারী? রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলতে এরা এতটুকু দ্বিধা করে না। আবার সেই রাষ্ট্রশক্তির যারা ধারক-বাহক, তাঁদেরও মনে করিয়ে দেয়... আপনার বাড়িতেও ছেলেমেয়ে আছে। তারাও পড়াশোনা করছে। এই ঘুণধরা সিস্টেমের মধ্যেই হাতড়াচ্ছে সাফল্যের চাবিকাঠি। এরপরও এই প্রজন্মকে কুর্নিশ জানাব না?
আন্দোলনের নয়া রূপ
আমরা দেখেছি একটি মেয়েকে। মুম্বইয়ের রাস্তায় প্রিজন ভ্যানের সামনে দাঁড়াতে। আমরা দেখেছি আরও একটি মেয়েকে... যন্তরমন্তরের বাইরে পুলিশকর্মী, র‌্যাফের হাতে গোলাপ ফুল তুলে দিতে। তাঁরা লজ্জায় মাথা নীচু করছেন। কেউ উঠে চলে যাচ্ছেন। পালাচ্ছেন ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলোর সামনে থেকে। এই ফুল তাঁরা হাত পেতে নিতে পারছেন না। এদের উপরই তো আগের দিন পেলেট গান চালিয়েছেন তাঁরা। লাঠি মেরেছেন। কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছেন। আন্দোলনের এই রূপ আমরা আগে দেখিনি। ‘বিশুদ্ধবাদী’রা ভ্রু কুঁচকেছেন। তাদের হুল্লোড় নিয়ে সমালোচনা করেছেন। সুবিধাবাদীও বলেছেন। তাতেও নড়েনি এই প্রজন্ম। ১৯৯৭ থেকে ২০১২... এই পরিসরে জন্ম তাদের। এদের অনেক ভাষা আমরা বুঝি না। অনেক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারি না। কিন্তু এরপরও এরা এগিয়ে চলেছে। যে প্রতিবাদের স্বর আমরা এত বছরে তুলতে পারিনি, এই প্রজন্ম তারই আগুন জ্বেলেছে। একটি আন্দোলন, যা ‘আরশোলা’র নামে শুরু হয়েছিল, তা আর শুধু ওই একটি শ্রেণিতেই থমকে থাকেনি। আন্দোলন যদি কেউ হাইজ্যাক করে থাকে, তাহলে তা জেন জি’রা।  কেন্দ্রীয় সরকার আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছে। মেনে নিয়েছে দাবি। ইস্তফা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। সরকারিভাবে বলেছেন, এই আন্দোলনের আড়ালে রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি বা জেহাদিরা যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে, সুবিধা নিতে না পারে, তাই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত। এই ন্যারেটিভে কিন্তু জেন জি’র কৃতিত্ব এতটুকু খাটো হচ্ছে না। তারা রয়েছে তাদের সেলিব্রেশনে। সিস্টেম বদলের লক্ষ্যে ছুটছে তারা। ফুটছে তারা। আশাবাদী, বদল হবেই। সরকার না বদলালেও তার মাথায় বসে থাকা কর্তারা বদলাবেন। সিস্টেম বদলাবে। সবার জন্য সমান হবে শিক্ষা ব্যবস্থা। যোগ্যতার ভিত্তিতে বাছাই হবে। টাকা বা খুঁটির জোরে নয়। 
শ্রেণিহীন সমাজ
এই প্রজন্ম নাম জানতে চায়। পদবি নয়। কাজ জানতে চায়। ধর্ম নয়। মানসিকতা জানতে চায়। পকেটের জোর নয়। এ এক অদ্ভুত প্রজন্ম। আগের জেনারেশন কি তাদের এই শিক্ষা দিয়েছে? বোধ হয় সবটা নয়। এটা তাদের ‘অ্যাকোয়ার্ড নলেজ’। লব্ধ জ্ঞান। শিক্ষা। সংস্কারও। নিঃশব্দে নতুন এক সমাজ গড়ার ডাক দিয়ে রেখেছে তারা। শ্রেণিহীন সমাজ। যেখানে বিভেদ নেই। ধর্মেও নেই, জিরাফেও নেই। তাদের আন্দোলনে জুনেইদ খান হাঁড়ির পর হাঁড়ি বিরিয়ানি নিয়ে আসেন। বিনা পয়সায় বিলি করেন। গুরুদ্বার থেকে আসে হালুয়া। সবার জন্য। গেরুয়া পোশাকের হাতে হাত রেখে এগিয়ে যান ফেজ টুপি। ফুচকাওয়ালা সারাদিনের আয়ের ভাবনা ফুৎকারে উড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন যন্তরমন্তরের সামনে। ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে সারাদিন ধরে ঢুকতে থাকে খাবার, ত্রিপল, স্যানিটাইজার। কাদের জন্য? ওই ছেলেমেয়েগুলো। যারা বাড়ির বাইরে চলে এসেছে, ছেড়েছে কমফর্ট জোন, এসির হাওয়া। আর এই বাবা-মায়েরা যে বিনা দ্বিধায় খাবার-দাবার পাঠিয়ে গিয়েছেন, তার কৃতিত্ব কার? কে বোঝাল তাঁদের? এই প্রজন্মই। জেন জি। সমাজে বিভাজনের বিষদাঁত ভেঙে দেওয়ার ভাবনা তাদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয়, তাহলে জেন জি’কেই। প্রশ্ন তুলছে তারা... মানতে হবে? কেন মানব? কেন তুলব না অধিকার বুঝে নেওয়ার প্রখর দাবি? কেন স্বপ্ন দেখব না দিনবদলের? কী বলবেন এদের? সেকু? মাকু? ওসব টার্মিনোলজি বা পুঁথিগত আদর্শের ধার ধারে না এই ছেলেমেয়েরা। ‘ভাষা’টাই শুধু এদের একটু জটিল। বাকি ভাবনা সরলরেখায় চলে। একেবারে সোজাসাপ্টা। ধর্ম-টর্ম বুঝি না। সবাই মিলে একসঙ্গে চলতে পারলে, খেতে পেলেই হবে। আর শিক্ষা যেন সবার হয়। পুঁথিগত শিক্ষা নয়। ব্যবহারিক। সামাজিক শিক্ষা।
আন্দোলন শেষ?
অভিজিৎ দিপকে বলেছেন, আন্দোলন শেষ হয়নি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ককরোচদের প্রতিবাদ বজায় থাকবে। তা হতে পারে ‘স্পেস টেকনোলজি ব্যবহারে’র পরও ভেঙে যাওয়া সড়ক। কিংবা জ্বালানি। ইতিমধ্যেই ই-২০ পেট্রলের বিরোধিতায় নতুন জনতা পার্টি জন্ম নিয়েছে। তার ফলোয়ার বাড়ছে লাফিয়ে। শাসকের আশঙ্কা, এ আবার নতুন আন্দোলনের জন্ম দেবে না তো? আরও বড়ো প্রশ্ন, জেন জি এতে আবার নেমে পড়বে না তো? এখন তারা পোস্টার লিখছে, ‘না লাঠি সে না কিলোঁ সে, হামনে কর দিখায়া রিলো সে’। আর নতুন আন্দোলন দানা বাঁধলে ‘গন্নে কা জ্যুস’ নিয়ে কিছু একটা বেঁধে ফেলবে। আবার বলবে, ‘কী আঙ্কল, আঁসু গ্যাসের ব্যবস্থা নেই?’ হিন্দু-মুসলিম তত্ত্বে এদের ভাগ করা যাবে না। কোন ফরমুলায় এদের কায়দা করা যায়, শাসক তা এখনও আবিষ্কার করে উঠতে পারেনি। তাই, সাধু সাবধান। ওই যে একটি ওয়েব সিরিজে শোনা গিয়েছিল... ‘রাবণ কেন দোষী? সে তো বীর ছিল। জ্ঞানী ছিল। রাবণ যদি নিজের রূপেই সীতা মায়ের অপহরণ করত, তাহলেও ঠিক ছিল। কিন্তু সে সাধু সেজে প্রতারণা করেছিল। তার জন্য সাধুদের ভাবমূর্তি চিরতরে নষ্ট হয়েছে। যুগ যুগ ধরে সেটাই বহন করতে হচ্ছে সমাজকে।’ আজ তো তার থেকে পৃথক কিছু হচ্ছে না? জেন জি কিন্তু এসব আর মানবে না। তারা আন্দোলনের মাঝেই মারতে আসা পুলিশের হাতে খৈনি ধরিয়ে দেবে। আবার তারই পাশাপাশি তুলে ধরবে ভগৎ সিংয়ের স্লোগান... ‘কালাদের যদি শোনাতেই হয়, আওয়াজ আরও জোরদার করতে হবে।’ আওয়াজ উঠেছে। এই দফায় অপারেশন লোটাসের হাত ধরে হয়তো ডিলিমিটেশন বিল পাশ হয়ে যাবে। ঘুঁটি আরও সাজবে। ভোট-গণতন্ত্রকে আঁটোসাঁটো করতে কোমর বাঁধবে সরকার। তারপরও কিন্তু এই জেনারেশন বলবে, ‘পিকচার অভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত। ওয়াস্তাগুণা হুইয়া।’ আরশোলার বংশবৃদ্ধি কিন্তু হচ্ছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ