Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

এ কেমন চিকিৎসক! জীবিতকে মৃত ঘোষণা, অ্যাম্বুলেন্স টেকনিশিয়ানের চেষ্টায় পুনর্জন্ম কিশোরীর

নার্সিংহোমের চিকিৎসক থেকে প্রাইভেট চিকিৎসক—দু’জনেই চোখের পাতা উল্টে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন ধড়ে প্রাণ নেই। অনেক আগেই মারা গিয়েছে আপনাদের মেয়ে।

এ কেমন চিকিৎসক! জীবিতকে মৃত ঘোষণা, অ্যাম্বুলেন্স টেকনিশিয়ানের চেষ্টায় পুনর্জন্ম কিশোরীর
  • ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৪:০২
Prefer us on Google

সৌমিত্র দাস, কাঁথি:  নার্সিংহোমের চিকিৎসক থেকে প্রাইভেট চিকিৎসক—দু’জনেই চোখের পাতা উল্টে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন ধড়ে প্রাণ নেই। অনেক আগেই মারা গিয়েছে আপনাদের মেয়ে। কান্নাকাটি করতে করতে মেয়ের শেষকৃত্যের জন্য খুঁড়ে ফেলেছিলেন কবরও। চলছিল অন্যান্য প্রস্তুতিও। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ অ্যাম্বুল্যান্স টেকনিশিয়ানের উপস্থিত বুদ্ধি, অদম্য জেদ ও তৎপরতায় কবরের মুখ থেকে ফিরল কিশোরী! টেকনিশিয়ানের জেদে নবজন্ম পেল সে। যমদূতের হাত থেকে চৌদ্দ বছরের কিশোরীকে কার্যত ছিনিয়ে আনলেন তিনি। নতুন জীবন পেল কাঁথির দুলালপুর পঞ্চায়েতের এড়্যাফতেপুর গ্রামের বাসিন্দা ওই কিশোরী। ঘটনাটি সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানাবে। মেয়ের পুনর্জন্ম হওয়ায় খুবই খুশি পরিবারের লোকজন।  শুধু তাই নয়, যাঁদের জন্য এই পুনর্জন্ম, সেই অ্যাম্বুল্যান্স টেকনিশিয়ান, হাসপাতাল সুপার ও অন্যান্য চিকিৎসকদের ফুলের মালা পরিয়ে কৃতজ্ঞতা জানান পরিবারের লোকজন ও পরিজনরা। সেই সঙ্গে কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন ওই দুই চিকিৎসকের। 

Advertisement


জানা গিয়েছে, ওই কিশোরী পড়াশোনায় অমনোযোগী। মায়ের বকুনিতে সপ্তাহখানেক আগে অভিমানে বিষপান করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে তাকে মাজনা গ্রামীণ হাসপাতাল ও পরে কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান বাড়ির লোকজন। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাম্রলিপ্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। কিন্তু, তমলুকে নিয়ে যাওয়ার পথে কিশোরীর শারীরিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তৎক্ষণাৎ তাকে তমলুকের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে নিয়ে যান বাড়ির লোকজন।  সেখানকার এক চিকিৎসক ভর্তি নেওয়ার আগে অ্যাম্বুলেন্সে উঠে ওই কিশোরীর চোখ পরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ঘটনার মোড় ঘুরে যায় এখানেই। ওই অ্যাম্বুলেন্সে ছিলেন কাঁথি হাসপাতালের আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স টেকনিশিয়ান রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল। রবীন্দ্রনাথবাবু লক্ষ্য করেন, চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করলেও পালস অক্সিমিটার ও অন্যান্য যন্ত্রে রোগীর প্রাণের স্পন্দন স্পষ্ট। এমনকী, তিনি প্রতিবাদ করলে ওই চিকিৎসক যন্ত্রটি খারাপ বলে উড়িয়ে দেন। হতাশ পরিবারের লোকজন মেয়েকে নিয়ে কাঁথিতে ফিরে অন্য এক প্রাইভেট চেম্বারের চিকিৎসকের কাছে  নিয়ে যান।  তিনিও তাকে মৃত বলেই ঘোষণা করেন। এরপরই স্বজন হারানো পরিবারের লোকজন কান্নায় ভেঙে পড়েন।  দেহটি নিয়ে আসা হয় এলাকায়। এর আগে ধর্মীয় রীতি মেনে এলাকায় মাইকে মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা হয়। পাশাপাশি কবর খোঁড়ার কাজও সম্পন্ন হয়ে যায়। কিন্তু হাল ছেড়ে দেননি টেকনিশিয়ান রবীন্দ্রনাথবাবু। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, জীবিত মানুষকে ভুলবশত কবর দেওয়া হতে চলেছে। তিনি গ্রামবাসী ও পরিবারকে বহু বুঝিয়ে একপ্রকার জোরাজুরি করে শেষবারের মতো কিশোরীকে কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজি করান। শেষমেশ কবরস্থান থেকে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় কিশোরীকে। আইসিইউতে চিকিৎসা শুরু হতেই ধীরে ধীরে সাড়া দিতে থাকে ‘মৃত’ কিশোরী। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় সাতদিনের লড়াই শেষে মঙ্গলবার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে সে। রবীন্দ্রনাথবাবু বলেন, ‘আমি ক্ষীণ প্রাণের স্পন্দন অনুভব করেছিলাম। তাই হাল ছাড়িনি। কিশোরীকে পুনর্জন্ম দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এটা আমার কাছে গর্বের।’ এদিকে জীবিতকে মৃত বলে ঘোষণার ঘটনায় দুই চিকিৎসকের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন এলাকাবাসী। তাঁরা চাইছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ করা হোক। এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের সুপার অরূপরতন করণ বলেন, ‘কিশোরীটিকে যে নতুন জীবন দেওয়া গিয়েছে, তাতে আমরা খুশি। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে স্বাস্থ্যদপ্তরকে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলব।’  কিশোরীর প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ায় কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স টেকনিশিয়ান, সুপার ও চিকিৎসকদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তার পরিবার।-নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ