বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: ডাক বিভাগের হাত ধরে পেমেন্টস ব্যাংক চালু করেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। মূল লক্ষ্য হল, গ্রাহকের দুয়ারে ব্যাংকিং পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া। দেশে ডাকঘরের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৬৫ হাজার। প্রায় ৪০ কোটি মানুষ এখানে পরিষেবা নেন। তাই ডাককর্মীরাই যাতে গ্রাহকের বাড়ি পৌঁছে টাকা তোলা বা জমা করার সুযোগ করে দিতে পারেন, তার জন্যই চালু করা হয় ‘ইন্ডিয়া পোস্ট পেমেন্টস ব্যাংক’ (আইপিপিবি)। এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ইতিমধ্যে ১৩ কোটি ছাড়িয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা কত সহজ হয়েছে, এই পরিসংখ্যান সামনে রেখে তার প্রচারে কোনো খামতি রাখেনি কেন্দ্র। কিন্তু গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাঁরা বলছেন, দুয়ারে ব্যাংকিং বলে কোনো পরিষেবাই আর অবশিষ্ট নেই। খাতায়কলমে একটা ব্যবস্থা আছে ঠিকই। কিন্তু গ্রাহকের কাছে তা অধরা। পরিষেবা না মেলায় গ্রাহকরাও পোস্ট পেমেন্টস ব্যাংকে লেনদেনে উৎসাহ হারিয়েছেন। সূত্রের খবর, ৬ কোটির বেশি অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছে শুধু লেনদেন না হওয়ার কারণেই। ডাকবিভাগের করুণ দশা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক ক্যাাগ রিপোর্টেও। সেখানে বলা হয়েছে, সম্পূর্ণ ভূতুড়ে মোবাইল নম্বরে যাওয়া ওটিপি দিয়ে খোলা হয়েছে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট! বাস্তবে তা কীভাবে সম্ভব, ভেবে পাচ্ছেন না দপ্তরের কর্তারা। তাঁদের কথায়, শুধু অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বাড়িয়ে সাফল্য দেখাতে গিয়ে লাগামছাড়া বেনিয়ম হয়েছে।
আইপিপিবিতে দুয়ারে পরিষেবা চালুর সময় লেনদেন পিছু ২৫ টাকা খরচ করতে হত গ্রাহককে। শুধু ডাকঘর বা পেমেন্টস ব্যাংকই নয়, আধার যাচাইয়ের মাধ্যমে যে কোনো ব্যাংকে নগদ জমা বা তোলার সুযোগ করে দিতেন ডাক কর্মীরা। পরে সেই চার্জ নেওয়া বন্ধ করে বিনামূল্যে পরিষেবা চালু করে কেন্দ্র। তারপরই গোটা ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে বলে অভিযোগ। ডাককর্মীদের বক্তব্য, যে অ্যাপের মাধ্যমে পরিষেবার বুকিং হত, সেটি বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। হেল্পলাইন নম্বরে পরিষেবা বুকিং করলে তা আর কার্যকর হয় না বললেই চলে। ‘পরিষেবা দেওয়া হয়েছে’ বলে সরকারিভাবে নথিবদ্ধ হয়। কিন্তু গ্রাহকরা কিছুই পান না। ডাককর্মীরা বলছেন, সাধারণ কাজের চাপ এত বেশি যে এই পরিষেবা একপ্রকার বন্ধই করে দিতে হয়েছে।
ক্যাগ আরও দাবি করেছে, যে সময় লেনদেন পিছু ২৫ টাকা ধার্য ছিল, তখনও ‘ডোরস্টেপ ব্যাংকিং’-এর ৫৭.৪৬ শতাংশ ক্ষেত্রে হয় লোক পাঠানো হয়নি, অথবা অনুরোধের দু’দিন বা তারও বেশি সময় পর কর্মী গিয়েছেন। ২০২৩ সালে চার্জ মকুবের পর পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়। তিতিবিরক্ত গ্রাহকও আইপিপিবিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ক্যাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট সেভিংস অ্যাকাউন্টের ৫৮ শতাংশই ‘ডরম্যান্ট’ বা নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ সেগুলিতে শেষ দু’বছর কোনো লেনদেন হয়নি। যদিও দপ্তরের কর্তাদের দাবি, বর্তমানে পরিস্থিতি এতটা খারাপ নয়। লাগাতার গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের ফলে নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৫০ শতাংশের নীচে নামানো গিয়েছে।
ক্যাগ বলছে, কাস্টমার ইনফরমেশন ফোলিওয় ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরগুলি অনেক ক্ষেত্রেই ভূতুড়ে। যেমন দশটি ৯ বা ১০টি ৭ দিয়ে এক-একটি মোবাইল নম্বর! অথচ সেগুলির মাধ্যমে ওটিপি যাচাই করেই নাকি সিআইএফের সঙ্গে ‘লিংক’ করা হয়েছে মোবাইল! অর্থাৎ বেনজির বেনিয়ম স্পষ্ট ক্যাগের রিপোর্টেই।