Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আবার ‘জুমলা’!

তার আগে নিশ্চয়ই মতুয়ারা নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন। তাঁদের ভোটার তালিকায় নাম তুলতে অসুবিধা হবে না।

আবার ‘জুমলা’!
  • ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পশ্চিমবঙ্গে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার নিয়ে আশঙ্কাই কি তবে সত্যি হতে চলেছে? গত ১৬ ডিসেম্বর ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর যে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ মতুয়া ‘নো ম্যাপিং’ ভোটার (যাঁদের নাম ২০০২-এর ভোটার তালিকায় নেই)-এর আওতায় রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। খোদ গাইঘাটার বিজেপি বিধায়ক তথা ঠাকুরবাড়ির অন্যতম সদস্য সুব্রত ঠাকুর জানিয়েছেন, বনগাঁ মহকুমায় ১ লক্ষ ৩৫ হাজার ‘নো ম্যাপড’ ভোটার রয়েছেন। এঁদের ৮৫ শতাংশই মতুয়া। নিয়ম মতো, তাঁদের প্রত্যেককে শুনানিতে ডাকা হতে পারে। সেখানে কমিশনের নির্ধারিত ১১টি নথির কোনও একটি প্রমাণপত্র হিসাবে দাখিল করে ভোটাধিকার পেতে হবে। কিন্তু মতুয়াদের কাছে কোনও নথি নেই জেনেই ‘সিএএ’তে নাগরিকত্বের আবেদনপত্রকেই ‘রক্ষাকবচ’ হিসাবে দেখিয়ে ভোটাধিকার মিলবে বলে প্রচার করেছিল বিজেপি। কিন্তু নাগরিকত্ব না পেলে ভোটার তালিকায় নাম তোলা যাবে না বলে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়ায় এখন বিপাকে পড়ে বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব বলতে শুরু করেছে, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হতে এখনও মাস দুয়েক সময় হাতে আছে। তার আগে নিশ্চয়ই মতুয়ারা নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন। তাঁদের ভোটার তালিকায় নাম তুলতে অসুবিধা হবে না। কিন্তু বিজেপির এই দ্বিতীয় দফার ‘জুমলায়’ আশ্বস্ত হতে কি পারছেন মতুয়ারা? কারণ দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের নিয়ে টালবাহানা চলছে। তাঁদের অভিজ্ঞতা হল, ভোট এলেই তাঁদের নিয়ে চলে দড়ি টানাটানি! 

Advertisement

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান, পরে বাংলাদেশ থেকে দফায় দফায় হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত মতুয়ারা এ রাজ্যে এসেছেন। তাঁদের বসবাস মূলত দুই চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, হুগলি এবং উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায়। এ রাজ্যে মতুয়াদের সংখ্যা ঠিক কত, তা নিয়ে নানা মত থাকলেও তা তিন কোটির কম হবে না বলেই মনে করা হয়। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ১০ থেকে ১৫ শতাংশের নাম রয়েছে ২০০২-এর সংশোধিত ভোটার তালিকায়। অর্থাৎ, তাঁদের ভোটাধিকার নিয়ে বিশেষ চিন্তা নেই। কিন্তু বাকিদেরই শুনানিতে নথির প্রমাণ দিয়ে ভোটাধিকার অর্জন করতে হবে, যা তাঁদের কাছে নেই। ঘটনা হল, এতকাল এই মতুয়ারা বহাল তবিয়তে ভোট দিয়ে এসেছেন। কারণ, তাঁদের কাছে ভোটার কার্ড, প্যান কার্ডের মতো একাধিক নথি রয়েছে। কিন্তু কমিশন নির্ধারিত নথির তালিকায় এসব জায়গা পায়নি। তাই এতদিনের অর্জিত ভোটদানের অধিকার নতুন করে পেতে তাঁদের একমাত্র ভরসা নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র। কিন্তু এখানেও বিজেপির দ্বিচারিতা প্রকট। মোদি সরকার ২০১৯ সালে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ চালু করে। অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশ সহ পড়শি কয়েকটি রাষ্ট্র থেকে মূলত ধর্মীয় উৎপীড়নের কারণে সেখানকার যেসব সংখ্যালঘু এদেশে শরণার্থী বা উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিয়েছেন, সেই মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়াই এই আইনের একমাত্র উদ্দেশ্য। কিন্তু তারপর প্রায় ছ’বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকৃত ছবিটা হল, ইতিমধ্যে কয়েক লক্ষ মতুয়া নাগরিকত্ব পেতে আবেদন করেছেন অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে। কিন্তু নাগরিকত্বের শংসাপত্র পেয়েছেন মাত্র কয়েক হাজার মানুষ। বিপদটা ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলায় এখন বঙ্গ বিজেপি নেতারা বলতে শুরু করেছেন, আগামী দু’মাসে সবাই নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন। এই নতুন ‘জুমলায়’ নতুন করে বিভ্রান্ত হচ্ছেন মতুয়ারা। 
অথচ এই মতুয়াদের নাগরিকত্বের টোপ দিয়ে ভোটের রাজনীতিতে বেশ খানিকটা সাফল্য আদায় করে নিয়েছে গেরুয়াবাহিনী। এক সময় মতুয়ারা ছিল কংগ্রেসের ‘ভোট ব্যাংক’। পরবর্তীকালে তা বামেদের দখলে চলে যায়। ২০১১-তে রাজ্যে পালাবদলের সময় থেকে মতুয়ারা রয়েছেন ‘দিদি’র সঙ্গে। কিন্তু এই সময়েই নাগরিকত্বের স্বপ্ন দেখিয়ে তৃণমূলের ভোটব্যাংকে ভালোরকম থাবা বসিয়েছে বিজেপি। তথ্য বলছে, রাজ্যের ১০০টি বিধানসভা আসনে মতুয়াদের ভালো সংখ্যক ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ২১টি আসনে মতুয়া ভোটই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই আসনগুলিতেই চমকপ্রদ সাফল্য দেখিয়েছে বিজেপি। ২০২১-এর সর্বশেষ বিধানসভা ভোটে মতুয়া গড় বলে পরিচিত ২১টি আসনের মধ্যে তৃণমূল ১২টি এবং বিজেপি ৯টি আসন দখল করে। সেই ধারা অব্যাহত রাখতে বিজেপি এবারও মরিয়া। কিন্তু যে নাগরিকত্বের টোপ দিয়ে গত দশ বছর ধরে মতুয়াদের ভোট অনেকটা টেনেছে বিজেপি, এবার তা ব্যুমেরাং হয়ে যাবে কি না— সেই আশঙ্কা বঙ্গ বিজেপির অন্দরে চোরা স্রোত বইয়ে দিয়েছে। বিশেষত খসড়া ভোটার তালিকা সামনে আসার পর বিজেপি নেতৃত্বের অনেকটা দিশেহারা অবস্থা। এই অবস্থায় শনিবার রানাঘাটে জনসভা করতে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হয়তো কোনও ‘ম্যাজিক’ দেখাবেন— সেই আশাতে বুক বাঁধছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল। এখন দেখার, ভোটের অঙ্ক মেলাতে মোদি কোন ‘বায়বীয়’ তত্ত্ব হাজির করেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ