Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিদ্বেষের বছর পেরিয়ে

প্রতিটি নতুনই বয়ে চলে পুরোনোর স্মৃতিচিহ্ন। সেই চিহ্ন কখনও প্রকট, কখনও ইন্দ্রিয়াতীত প্রচ্ছন্ন

বিদ্বেষের বছর পেরিয়ে
  • ১ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রতিটি নতুনই বয়ে চলে পুরোনোর স্মৃতিচিহ্ন। সেই চিহ্ন কখনও প্রকট, কখনও ইন্দ্রিয়াতীত প্রচ্ছন্ন। ঠিক যেমন এ দেশের বাংলাভাষী নাগরিকরা বছরভর বয়ে চলেছে বাঙালি বিদ্বেষের যন্ত্রণা। আজ নেহাত বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণেই ভিন রাজ্যে হেনস্তা হতে হচ্ছে বাঙালিকে। একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বাংলাভাষী মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হেনস্তা করেছে স্থানীয়রা, এমনকি পুলিশও। বছর শেষেও সেই বিদ্বেষ বাঙালির হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত করেছে। এই বাংলার মানুষ দেখেছে, বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ বা বৈধ অভিবাসী, হিন্দু হোক বা মুসলিম, আইনি পরিচয়পত্র থাকুক বা না-থাকুক, ভারতীয় হোক বা জাল পরিচয়পত্র-সহ বাংলাদেশি, বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক হোক বা বাংলাদেশি শ্রমিক— বাংলাভাষী মানেই ‘বহিরাগত’। কিন্তু এই ভাষা সন্ত্রাসের শেষ কোথায়? নতুন বছরে কি এই যন্ত্রণায় ছেদ পড়বে?
স্রেফ সন্দেহের বশে এক দলকে জেলে পোরা যায়, অত্যাচার করা যায়, মেরে হাত-পা ভেঙে দেওয়া যায়, এমনকি চাইলে জোর করে সীমান্তের ওপারেও ছুড়ে দেওয়া যায়। তাঁদের থাকার জায়গায় বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া, ঘরদোর ভেঙে দেওয়া তো বুলডোজাররাজের যুগে জলভাত। দেশের নাগরিক কি না তা ভালো করে যাচাই করারও দরকার নেই, রাষ্ট্রের দেওয়া নানা কিসিমের পরিচয়পত্রকে বিশ্বাস করতেও পুলিশের বয়ে গিয়েছে। বাংলাভাষী শ্রমিক হলেই অনুপ্রবেশকারী বলে খেয়াল খুশি মতো এমন নিপীড়ন চালাতে পারে রাষ্ট্র। অপরাধ প্রমাণ করার দরকার পড়ে না, সন্দেহ হলেই হল। স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পেরিয়ে এমনই এক ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রের মুখোমুখি আমরা।

Advertisement


যে কোনও জাতি তার ভাষার সঙ্গে আমৃত্যু এক গভীর বন্ধনে জড়িয়ে থাকে। যে কোনও জাতির জাতিসত্তা গঠনে ভাষা ও সংস্কৃতির অবদান সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভাষার মধ্যে একটা জাতির জীবন, মরণ ও অবস্থান। ভাষাই সব সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি। আর গেরুয়া শিবির বারবার সেই ভাষাদেহকে কালিমালিপ্ত করেছে। ক্ষতবিক্ষত হয়েছে বাঙালির মানসভুবন। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি দিল্লি-হরিয়ানা-উত্তরপ্রদেশে প্রশাসনিক উদ্যোগে বাঙালি-বিদ্বেষের যে বীজ বপন করেছিল, তারা নিশ্চিতভাবেই জানত যে, বিদ্বেষের বিষবৃক্ষে সামাজিক বৈধতার ফল ধরতে সময় লাগবে না। বাংলাভাষী বাঙালিমাত্রেই ‘বাংলাদেশি’, এই কথাটি দেশের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত জনসমাজ বিশ্বাস করে ফেলবে। হিন্দুত্ববাদী বিদ্বেষের কারবারিদের সেই অঙ্ক বুঝতে ভুল হয়নি।
রাজনীতির ধর্মই হল, তা ক্রমে সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে প্রবেশ করে— বিশেষত, সেই রাজনীতি যদি বিদ্বেষের হয়, তবে তা ছড়িয়ে পড়ে দ্রুততর বেগে, অধিকতর ব্যাপ্তিতে। বিজেপির হিন্দি আগ্রাসনের রাজনীতিও সে ভাবেই ছড়িয়েছে। গেরুয়া শিবির চায়, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থানের রাজনীতি। গত কয়েক বছরে বিজেপি ক্রমেই দেশজুড়ে হিন্দির আধিপত্য কায়েমে ব্যস্ত। সেই আধিপত্যের উল্টো দিকটি হল, অন্যান্য ভাষার অবমাননা। পশ্চিমবঙ্গের পথ দিয়ে ভারতে বাংলাদেশি মুসলিমদের অনুপ্রবেশ ঘটছে, দীর্ঘ দিন ধরে এই প্রচার চালিয়ে যাওয়ার ফলও মিলেছে— উত্তর বা পশ্চিম ভারতে বহু মানুষের চোখেই এখন আর বাঙালি ও বাংলাদেশির মধ্যে কোনও ফারাক নেই।


ঠিক যেমন পশ্চিম পাকিস্তানের শাহকুল ১৯৭১-এর আগে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মুসলিম মনে করত না। তাদের উপলব্ধি ছিল, মুসলিম কখনও বাঙালি হয় না। ওটা হিন্দুদের একচেটিয়া ব্যাপার। মুসলিম মানেই পাকিস্তানি। উর্দুভাষী। আর আজ গেরুয়া শিবির মনে করে— হিন্দু হলে শুধু হিন্দুস্তানি হবে, হিন্দিভাষী হবে। বাঙালি কেন হবে? বাংলায় কেন কথা বলবে? ভারতে থেকে বাংলায় কথা বলছ? তার মানে তুমি বাংলাদেশি। তার মানে তুমি অনুপ্রবেশকারী। ঘুসপেটিয়া! বাংলা ও বাঙালির উপর আজ যে আক্রমণ, তার অন্যতম কারণ, বাঙালির সঙ্গে মুসলিম পরিচয় আজ এক হয়ে গিয়েছে। বাংলাভাষী মানেই মুসলিম! এর মধ্যে যতটা ‘হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ’, ততটাই, বা তার থেকে বেশি ‘হিন্দু সাম্রাজ্যবাদ’। এই ভাবনা থেকেই দিল্লিতে বিজেপি নেতা অমিত মালব্য বলেছিলেন, বাংলা বলে কোনও ভাষা নেই, আছে কেবল বাংলাদেশি ভাষা।
পরাধীন ভারতে ধর্ম-ধর্ম উন্মাদনার পরও ধর্মের ভিত্তিতে দেশ-ভাগাভাগিটা সম্পূর্ণ করা যায়নি। কারণ, মাটির ভিতরে শিকড়ে-শিকড়ে জড়ানো সমাজ-সংস্কৃতি উপড়ে ফেলা অসম্ভব। উনিশশো বিশ-ত্রিশ-চল্লিশের দশকে বাংলার ইতিহাস এও বলে, সেদিন যখন ধর্মের অন্ধতা তীব্র হয়ে উঠছিল, তখন বাঙালির এক বিরাট অংশ— হিন্দু ও মুসলিম দুই সমাজই বাংলা সত্তার কথা বলেছিল। দেশভাগের পরিকল্পনায় বড় বাধা ও বিরোধিতা তৈরি হয়ে উঠেছিল বাংলাতেই। যা ব্রিটেন ও দিল্লির যুগপৎ ঔপনিবেশিক চাপে দ্রুত হারিয়ে যায়। বাংলাই সেই ভাষা-সংস্কৃতি, যা নিয়ে পোস্ট-কলোনিয়াল যুগেও ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ’ দেখেছে এই উপমহাদেশ। এই সব ইতিহাস আজ ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে যে, অনেক চ্যালেঞ্জ ও সংঘাতের মধ্যেও ১৯৪৭-এর পর ভারতীয় রাষ্ট্র দিতে চেয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, ভাষানিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার পরিসর। আর এখন আমরা দেখছি উগ্র অসহিষ্ণুতা, মৌলবাদে ফেরার ডাক। সেই ডাক এখন পশ্চিমবঙ্গেও। ঠিক যেমন ইসলামি মৌলবাদ বার বার বাংলা ভাষাকে ‘হিন্দু’ বলে দাগিয়ে উর্দু চাপানোর চেষ্টা করেছে, আজ হিন্দু মৌলবাদ বাংলা ভাষাকে ‘মুসলিম’ বলে দাগিয়ে হিন্দি চাপানোর চেষ্টা করছে। মুসলিম, অনুপ্রবেশ, সন্ত্রাসবাদ— তিনটি প্রসঙ্গকে পরস্পরের পরিপূরক হিসাবে দেশবাসীর কাছে উপস্থিত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়ে গেরুয়া শিবির ময়দানে নেমেছে। ধর্মীয় বিদ্বেষের নিক্তিতে মুসলিম আর জাতি-বিদ্বেষের নিক্তিতে বাঙালি— দুইকে মিলিয়ে-মিশিয়ে বিদ্বেষ-বিভাজনের এক ককটেল পলিটিক্স নামিয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা।
মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সরকারের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী ইন্দর সিং পারমার। বিরসা মুন্ডার জন্মতিথিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘ব্রিটিশ শাসকেরা হিন্দু ভারতীয়দের আস্থা বদলানোর কুচক্র চালাত, তারই অংশ ছিলেন ইংরেজদের দালাল রাজা রামমোহন রায়।’ এর আগে অসমের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‍‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাইবার জন্য দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে দু’জনকে গ্রেফতার করেছে হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। আসলে বিজেপি যে ভারতীয় ‘নবজাগরণে’র পথিকৃৎ বাঙালি মনীষীদের বিরুদ্ধে, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। ওদের ডিএনএ-তে জমা বাঙালি-বিরোধিতা প্রকট হচ্ছে প্রতিদিন। বিজেপির পক্ষে উদার মানবতাবাদী, চরম অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ এবং নিজে মুসলিম হয়েও আজীবন অন্ধ, গোঁড়া মৌলবাদের বিরোধিতা করে যাওয়া কাজি নজরুল ইসলামকে মেনে নিতে অসুবিধা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
গত কয়েকবছরে উত্তরপ্রদেশ, অসম-সহ বেশ কয়েকটি বিজেপিশাসিত রাজ্যে স্কুলপাঠ্য সিলেবাস থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে রবীন্দ্রনাথের লেখা। সম্প্রতি কর্ণাটকের বিজেপি সাংসদ বলেছেন, ‘ব্রিটিশদের খুশি করতেই রবীন্দ্রনাথ জনগণমন গানটি লিখেছিলেন।’ যে সংঘ ও হিন্দু মহাসভা গোটা স্বাধীনতা সংগ্রামের পর্যায়ে কখনও ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশ নেয়নি, বরং বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাদের কাছ থেকে আজ দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট নিতে হবে রাজা রামমোহন রায় এবং রবীন্দ্রনাথকে? গেরুয়া শিবিরের ডিএনএ-তে বঙ্গ ও বঙ্গজ বিদ্বেষ প্রবহমান, জানা ছিল। কিন্তু সেটার মাত্রা, সেটার তীব্রতা কতটা, তা বোধহয় অনেকেরই অনুমেয় ছিল না। এখন তা পরিস্ফুট একাধিক ঘটনায়— বাংলার ইতিহাস, বাঙালির ঐতিহ্য ছেঁটে ফেলার ব্যবস্থায়। বিদ্যাসাগারের মূর্তি ভাঙা থেকে ‘জনগণমন’ বর্জনের ডাক দেওয়া, র-সু-ন (রবীন্দ্রনাথ-সুকান্ত-নজরুল) সংস্কৃতির প্রতি বিষোদ্গার থেকে শুরু করে রামমোহনকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালাল বলা, সব কিছুই এঁদের সংঘী বিশ্বাসের পরিধিজাত।


তবু ভরসা এটুকুই, বাঙালি স্বধর্ম-চ্যুত হয়নি। জাতি-ধর্ম-বর্ণভেদ নস্যাৎ করে সকল বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রদীপ শিখা জ্বালিয়ে রেখে বাংলা এবং বাঙালি পথে নেমেছে সবার আগে। প্রথমেই দেখা গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। পর পর অন্যেরাও। এর পিছনে রাজনীতি একেবারে নেই, তা নয়। তবে তার চেয়েও বেশি আছে দৃঢ় মানসিকতা। যুগ যুগ ধরে বঙ্গ চেতনায় যা সঞ্চারিত। এই শক্তি অনিঃশেষ।
বাঙালি কোনও আগ্রাসী জনগোষ্ঠী নয়। তাঁর প্রব্রজনের ইতিহাস কোনও রক্তক্ষয়ী আগ্রাসনের ইতিহাস নয়। ইতিহাসে কেউ কখনও তাকে যোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করেনি। ‘সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে’র দ্বীপমালার লোকস্মৃতিতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা কোণে বাঙালির প্রাক-পুরাতন প্রপিতামহদের বিচরণের কাহিনিও সাক্ষ্য দেয় বাঙালি ছিল শান্তির বার্তাবহ। বেশিরভাগ বাঙালি-মনে এখনও মূল্যবোধের সঞ্চার বহাল— যা নিঃসন্দেহে জাতিভেদ, গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িক বিষ ও আঞ্চলিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। তাই চারিদিকে এত অসহিষ্ণুতার বিষ ছড়িয়ে পড়লেও বাংলা ও বাঙালি কখনও উগ্র-জাতীয়তাবাদী রাজনীতি দ্বারা লালিত বা উৎসাহিত হতে চায়নি। যখন ওড়িশা, অসমে বাঙালিদের উপর যথেচ্ছ অত্যাচার চলে, এমনকি, তখনও নয়। রাষ্ট্রকর্তৃক নিগ্রহ, অপমান ও অবিচার তাঁর নিত্যদিনের প্রাপ্তি সত্ত্বেও, বাঙালি কখনও অভিমানবশতও বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়নি, দেশমাতৃকার প্রতি বেইমানি করেনি। ইতিহাস সাক্ষী!


বছর শেষে বাঙালি মননে ঘনিয়ে আসা বিদ্বেষের অন্ধকার প্রাপ্তির আলো অনেকখানি কেড়ে নিয়ে গিয়েছে। সেই ম্লানতা থেকে একা বাংলাই বা বাঁচবে কেমন করে! তাই পাওয়া, না-পাওয়ার হিসেব কষতে গেলে শেষ পাতায় যা পড়ে থাকে, তা হল একরাশ উদ্বেগ, শঙ্কা। বর্ষ শুরুর বাতাস তাই অসূয়া ও অবিশ্বাসে ভারী। ২০২৫-র ক্যালেন্ডার বদলানোর দিনে কী ভাবছে বাঙালি? বারেবারে তাকে মুক্তি দিয়েছে রবীন্দ্রনাথ। কবি লিখে গিয়েছেন মহামানবের এক অমর জয়গাথা— বাঙালির নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সেই গান: উদয়শিখরে জাগে মাভৈঃ মাভৈঃ রব/ নব জীবনের আশ্বাসে।/ জয় জয় জয় রে মানব-অভ্যুদয়,/ মন্দ্রি উঠিল মহাকাশে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ