দীর্ঘ ১৬ বছর পর জনগণনা ’২৭-এর যাত্রা শুরু হল শনিবার। দেশে শেষবার জনগণনা বা আদমশুমারি হয়েছিল ২০১১ সালে। নিয়মমতো দশ বছর পর, ২০২১ সালে গণনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণ দেখিয়ে তা পাঁচ বছর পিছিয়ে দিয়ে এখন শুরু করা হল। এর আগে শেষ গণনায় ভারতের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১২১ কোটি। মনে করা হচ্ছে, এবার তা বেড়ে ১৪৫ কোটি হতে পারে। মোদি জমানায় ভারত প্রায় সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়লেও জনসংখ্যায় বিশ্বের ‘এক নম্বরের’ খেতাব ছিনিয়ে নিয়েছে চীনের কাছ থেকে। এবারই প্রথম সম্পূর্ণ ডিজিটাইজ পদ্ধতিতে গণনা হবে দু’টি পর্যায়ে। প্রথম পর্যায়ে গৃহ গণনার পাশাপাশি বাড়ির আসবাব ও সম্পদের তথ্য সংগ্রহও নাকি করা হবে! দ্বিতীয় পর্যায়ে নাম, বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম, জাতের বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হবে। জনগণনার প্রয়োজন কেন এবং কতটা সেই প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ নেই। কারণ, গত দেড় দশকেরও বেশি সময়ে দেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বহু পরিবর্তন ঘটে গেলেও সেই ২০১১ সালের আদমশুমারির রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প তৈরি করে চলেছে, যা একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়। তাই অনেক দেরিতে হলেও জনগণনার সিদ্ধান্ত স্বাগত। এই রিপোর্ট প্রকাশিত হলে দেশের মানুষের আসল ছবিটা যাওয়া যাবে। সেটা অবশ্য কতটা সন্তোষজনক হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
জনগণনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য একইসঙ্গে জাতগণনার সিদ্ধান্ত। এই নিয়ে প্রথম দিকে আপত্তি তুললেও শেষপর্যন্ত বিরোধীদের তরফে ওঠা জাতগণনার দাবি মেনে নিয়েছে মোদি সরকার। ঘটনা হল, ১৯৩১ সালে প্রথম জনগণনার সময় জাতগণনা হলেও পরবর্তীকালে আর কখনো তা হয়নি। ২০১১ সালে কেন্দ্রের ইউপিএ সরকার আর্থ-সামাজিক গণনা করলেও পরবর্তীকালে সেই রিপোর্ট কোনো অজানা কারণে প্রকাশ্যে আনেনি মোদি সরকার। হয়তো এর কারণ সংরক্ষণের জুজু। জনগণনায় তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতির হিসাব পাওয়া গেলেও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির তথ্য পাওয়া যায় না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বর্তমানে সরকারি ক্ষেত্রে তফসিলি জাতির জন্য ১৫ শতাংশ এবং উপজাতির জন্য ৭.৫ শতাংশ সংরক্ষণ চালু আছে। এর সঙ্গে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে যুক্ত হয়েছে ওবিসিদের জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ। পরবর্তীকালে ২০১৯ সালে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণের ঘোষণা হয়। সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে বর্তমানে সংরক্ষণ রয়েছে ৫৯.৫ শতাংশ। রাজ্যবিশেষে অবশ্য এর পার্থক্য আছে। এই প্রেক্ষিতে বিজেপির আশঙ্কা, জাতগণনা হলে ওবিসি জনসংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা বেশি। তার ভিত্তিতে ওবিসি সংরক্ষণের কোটা বাড়ানোর জোরালো দাবি উঠতে পারে, যা বর্ণহিন্দু গেরুয়াবাহিনীর কাছে রীতিমতো আতঙ্কের। এই আশঙ্কা সত্ত্বেও জনগণনার সঙ্গে জাতগণনা সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিতে বাধ্য হয়েছে মোদি সরকার। কারণ এই দাবি উপেক্ষা করার আর কোনো পথ খোলা ছিল না তাদের কাছে।
এদিকে দেখা যাচ্ছে, যেকোনো সরকারি কাজ শুরু হলেই তার প্রথম বলি হতে হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে। মোদি জমানায় এ দেশে এবং এ রাজ্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত, অবহেলিত, বঞ্চিত ক্ষেত্রগুলির একটি তালিকা যদি তৈরি করা হয়, তাহলে তার প্রথম নামটি হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার গুরুত্ব মোদি জমানায় প্রায় তলানিতে। শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে শাসকদের তরফে অনেক লম্বা-চওড়া ভাষণ শোনা গেলেও তাকে অবহেলিত করে রাখার নজির ভূরি ভূরি। এককথায় বলতে গেলে, গোটা দেশেই সরকারিস্তরে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা কার্যত লাটে উঠেছে। এর অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হল বিভিন্ন সরকারি কাজের জন্য স্কুলকে বেছে নেওয়া। চলতি বছরের কথাই ধরা যাক। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর কাজের জন্য ঢালাও হারে শিক্ষকদের নিযুক্ত করা হয়েছিল। ফলে প্রায় তিন মাস সময়কাল সরকারি স্কুলের পঠনপাঠন প্রায় শিকেয় ওঠে। এই কাজের শেষেই চলে আসে এ রাজ্যে নির্বাচন। ভোট এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর থাকার জন্য রাজ্যের বহু স্কুলের নিয়মমাফিক পঠনপাঠন বন্ধ থাকে প্রায় দু’ মাস। জুন মাস থেকে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে শুরু করতেই এবার জনগণনার কাজে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেউ না মানলে জেল-জরিমানার হুঁশিয়ারি রয়েছে। এমনিতেই অধিকাংশ স্কুলে পড়ুয়ার তুলনায় শিক্ষক কম। বহু স্কুল শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে। এহেন পরিস্থিতিতে সরকারিভাবে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে, জনগণনা ও স্কুল— দু’টি কাজই একসঙ্গে সামলাবেন শিক্ষকরা। কিন্তু তা যে শুধু কথার কথা, তা অনেকেই জানেন। সুতরাং জনগণনা, তারপর পুজোর ছুটি— দেখেশুনে মনে হতে পারে, যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থাটাই লাটে উঠতে পারে। পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে তাতে বোঝাই যাচ্ছে পঠনপাঠনের সমস্যা নিয়ে আদৌ মাথাব্যথা নেই সরকারের। যদি থাকত তাহলে অন্তত বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধান করা হত। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে কই!