নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: রানাঘাটে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলি নিয়ে প্রশাসনের রিপোর্টে উঠে এসেছে নিয়ম না মানার কাহিনি। স্বাস্থ্যদপ্তরে ইতিমধ্যেই সেই রিপোর্ট পৌঁছে গিয়েছে। চলছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া। জানা গিয়েছে, নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলিতে বেআইনই আইন! নেশামুক্তি কেন্দ্রের নামে সরকারি নিয়মকানুন না মেনেই চলছে ব্যবসা। কোথাও আবার মানসিক সমস্যা রয়েছে এমন রোগীকে ভর্তি করে আটকে রাখা হয়েছে নেশামুক্তি কেন্দ্রে। অধিকাংশ নেশামুক্তি কেন্দ্রের নেই ক্লিনিকাল এস্টাব্লিশমেন্টের ছাড়পত্র। স্বাস্থ্যদপ্তরের নিয়ম বলছে, একটি নার্সিংহোম করতে যা যা ছাড়পত্র এবং পরিকাঠামো লাগে, একটি নেশামুক্তি কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও সেগুলি প্রযোজ্য। কিন্তু সেই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিনের পর দিন প্রকাশ্যে চলছে বেআইনি ব্যবসা। রানাঘাট মহকুমার অন্তর্গত প্রায় ডজনখানেক এরকম নেশামুক্তি কেন্দ্র আপাতত প্রশাসনের নজরে।
কীভাবে প্রকাশ্যে এল বিষয়টি? মাস কয়েক আগে ধানতলার একটি নেশামুক্তি কেন্দ্রে খোঁজ মেলে এক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর। তখনই সরকারি স্বাস্থ্য আধিকারিক, পুলিস, পুরসভা, ব্লক প্রশাসনের মিলিত একটি কমিটি তৈরি হয় নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলি সার্ভে করার জন্য। সেই সার্ভেতেই উঠে এসেছে এই সমস্ত ভয়ংকর তথ্য। যেমন, রানাঘাট শহরে তিনটি নেশামুক্তি কেন্দ্রই হয়ে উঠেছে বেআইনি ঠেক। এরমধ্যে অগ্রণী ফাউন্ডেশন নামে একটিমাত্র কেন্দ্রের ‘সি-লাইসেন্স’ বা ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট লাইসেন্স থাকলেও নিয়মিত স্টাফ অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টার, ভিজিটরস লগবুক, চিকিৎসক কিছুই মেলেনি। আবার সেখানে এমন রোগীর খোঁজ মিলেছে যাঁর মানসিক সমস্যা থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু নেশার সঙ্গে যোগ নেই! অথচ এতদিন সেখানেই ভর্তি ছিলেন সেই ব্যক্তি। যদিও ওই কেন্দ্রের মালিক দেবদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আমরা সমস্ত নিয়মকানুন মেনেই কেন্দ্র চালাচ্ছি। পুরসভা দেখে গিয়েছে সবটাই। আবার রক্ষা ফাউন্ডেশন নামে অপর একটি নেশামুক্তি কেন্দ্র বছরের পর বছর শহরের বুকে চলছে ‘সি-লাইসেন্স’ ছাড়াই। নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে একগাদা লোকজনকে ভর্তি রাখার দৃশ্য উঠে এসেছে। রক্ষা ফাউন্ডেশনের মালিক তমাল দাস লাইসেন্স না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। বলেন, সোসাইটি রেজিস্ট্রেশনের উপরে বাকি সেন্টার যেভাবে চলছে সেইভাবেই চালাচ্ছিলাম। সি-লাইসেন্স ছাড়া চালানো যায়। ওই লাইসেন্স ছাড়া রিহ্যাব সেন্টার চালানো যাবে না এমন কোনও সরকারি নির্দেশিকা ছিল না। আমি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছি।
রানাঘাট পুরসভার তরফে সার্ভে আধিকারিক সুদীপ্ত মুখোপাধ্যায় বলেন, অগ্রণীর সি-লাইসেন্স থাকলেও চিকিৎসক এবং সাইক্রিয়াটিস্ট সহ অন্যান্য কিছুই নেই। সমাজের একজন প্রতিষ্ঠিত অবসরপ্রাপ্ত লোক, যাঁর নেশার সঙ্গে যোগ নেই এরকম লোককেও রাখা হয়েছিল সেখানে। রক্ষা ফাউন্ডেশনে কিছুই নেই। অনেকক্ষেত্রেই পরিবারের কোনও সদস্যের মানসিক সমস্যার কারণে তাঁকে নেশামুক্তি কেন্দ্রে পাঠিয়ে তাঁর সম্পত্তি ভোগ করা যদি একটি পরীক্ষিত রাস্তা হয়ে যায়, তাহলে সমাজের অবক্ষয় রোধ করা যাবে না। একই বিষয়ে নদীয়া জেলার সরকারি স্বাস্থ্য আধিকারিক পুষ্পেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, লাইসেন্স ছাড়াই অধিকাংশ নেশামুক্তি কেন্দ্র চলছে। আমরা রিপোর্ট তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠাচ্ছি। পুলিসকেও জানানো হবে। সি-লাইসেন্সের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।