Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

অচেনা দ্বীপের খেয়া

কী সুন্দর মায়াময় এই বিশাল পৃথিবী! সুনীল সাগর থেকে উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, ঊষর মরুভূমি থেকে গহীন অরণ্য, গগনচুম্বী অট্টালিকার নগরী থেকে প্রাচীন জনপদ—সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য।

অচেনা দ্বীপের খেয়া
  • ৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কী সুন্দর মায়াময় এই বিশাল পৃথিবী! সুনীল সাগর থেকে উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, ঊষর মরুভূমি থেকে গহীন অরণ্য, গগনচুম্বী অট্টালিকার নগরী থেকে প্রাচীন জনপদ—সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য। তারই সন্ধানে ছুটে বেড়ায় ভ্রমণ পিয়াসী মন। তাই তো পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে উড়ে চলা।  দলবদ্ধভাবে কিংবা একা।

Advertisement

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: দলবদ্ধ হয়ে ঘোরার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আছে। কোনও বিশেষ দ্রষ্টব্য একজনের চোখ এড়িয়ে গেলে অন্যের চোখে ধরা পড়ে। ইতিপূর্বে কেউ সেই স্থানে আগে বেড়াতে এসে থাকলে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা অন্যদের কাজে আসে। তাছাড়া, দলবদ্ধভাবে ঘোরার সময় একটা বাড়তি নিরাপত্তা তো থাকেই।
আবার আমরা যাঁরা সোলো ট্রাভেলার একা একা দেশ-বিদেশের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াই আমাদের এ ঘোরার মধ্যেও অন্য ধরনের একটা আনন্দ আছে। একবার যাদের একক ভ্রমণের নেশা পেয়ে বসেছে, তারা সে নেশা থেকে আর মুক্ত হতে পারেনি। একক ভ্রমণের সব চাইতে বড় ব্যাপার হল স্বাধীনতা।
প্রমোদ নগরী পাটায়া। শুধু সমুদ্র সৈকতই নয়, মনোরঞ্জনের কতরকম ব্যবস্থা যে এখানে মজুত আছে তা বলা মুশকিল। সে দিন সকালে কোথাও যাওয়ার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আমার ছিল না। বিকেলে অবশ্য আমার ড্রাইভার কাম গাইডের আসার কথা পাটেয়া তথা থাইল্যান্ডের বিখ্যাত ‘আলকাজার’ ডান্স শো দেখতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমার হোটেল থেকে সমুদ্র সৈকত মাত্র পাঁচ-দশ মিনিটের হাঁটা পথ। সকালে ভরপেট ব্রেকফাস্ট করে পৌঁছে গিয়েছিলাম সমুদ্র তটে। সে জায়গা থেকে অর্ধচন্দ্রাকৃতি তট রেখায় অবস্থিত পুরো পাটেয়া শহরটাকেই দেখা যায়। সমুদ্র তটে সার সার অস্থায়ী দোকান। সেখানে বিক্রি হচ্ছে ডাব, নানা ধরনের ফল, ভাজা মাছ-মাংস। শ্বেতাঙ্গ ট্যুরিস্টরা অনেকটা গদিওয়ালা ক্যাম্প খাটের মতো শয্যায় শুয়ে ‘সান বাথ’ নিচ্ছে। কেউ কেউ জলেও নেমে পড়েছে। জল এখানে শান্ত-স্থির। নানা ধরনের সমুদ্র ক্রীড়ারও ব্যবস্থা আছে এখানে। বাতাস ভর্তি স্পিড বোটে সমুদ্রে ঘোরা বা সমুদ্রে প্যারাশ্যুটিং-এর মতো রোমাঞ্চকর ব্যাপারও আছে। নানা দেশের নানা মানুষ ভিড় জমিয়েছে ঝলমলে সমুদ্র সৈকতে। সে সবই দেখতে দেখতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা কফি আর স্ন্যাক্সের দোকান। দোকানটা আমার বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করল কারণ, দোকানের মালিক একজন শিখ-পাঞ্জাবি। ভারতের বাইরে কোথাও গেলে বাঙালি তো বটেই যেকোনও ভারতীয় দেখলেই যেন তাকে আমার আত্মীয় বলে মনে হয়। কথা বলতে ইচ্ছা হয়। তাই সে দোকানে গিয়ে কফির কাপ হাতে নেওয়ার পর কথা বলতে শুরু করলাম তাঁর সঙ্গে। ভদ্রলোক পাঞ্জাবের লুধিয়ানার বাসিন্দা। গত বারো বছর ধরে থাইল্যান্ডে আছেন পরিবার নিয়ে। একটা রেস্তরাঁও আছে তাঁর ওয়াকিং স্ট্রিট অঞ্চলে। তবে ও অঞ্চল সন্ধ্যার পর জেগে ওঠে, তখনই রেস্তরাঁ চালু হয়। বাড়তি উপার্জনের জন্য তিনি সমুদ্র তটে দোকান খুলেছেন। এ জায়গা সম্পর্কে টুকটাক খবরাখবর নিলাম তার কাছে। তিনিও আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন আমি কোন কোন জায়গা ইতিমধ্যে দেখেছি, কোন কোন জায়গা দেখব? হঠাৎ তিনি বললেন, ‘‘হাতে যদি আপনার ঘণ্টা চারেক সময় থাকে তবে ‘কোরালা আইল্যান্ড’ ঘুরে আসতে পারেন। জায়গাটার আসল নাম অবশ্য ‘কোহ লার্ন’ কিন্তু লোক মুখে কোরাল আইল্যান্ড নাম হয়ে গেছে।’’
আমি জানতে চাইলাম, ‘সে জায়গা কোথায়?’
তিনি বললেন, ‘ওই যে অনেক দূরে সমুদ্রের বুকে সবুজ পাহাড়ের মতো দেখা যাচ্ছে, ওদিকেই সেটা। ছোট পাহাড় ঘেরা সাদা বালির সমুদ্র সৈকত। কোরাল রিফও আছে। গেলে ভালো লাগবে। ট্যুরিস্টদের নিয়ে স্পিড বোট যায়, ফেরিও চলাচল করে।’ এরপর জেটির অবস্থাও তিনি আমাকে দেখিয়ে দিলেন। সে স্থানে আমরা কথা বলছি সেখান থেকে জেটির দূরত্ব আনুমানিক তিন-চার কিলোমিটারের মতো।
সমুদ্র তটের গা বেয়ে যে মেরিন ডাইভ বা রাস্তা আছে সেখান থেকে মোটর চালিত রিকশ ধরে জেটিতে পৌঁছতে দশ মিনিট সময় লাগল। জায়গাটা বেশ জমজমাট। বেশ কিছু স্পিড বোট আর ফেরি দাঁড়িয়ে আছে জেটিতে। কেউ কেউ আবার যাত্রী নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়েছে কোরাল আইল্যান্ডের উদ্দেশে। বেশ কয়েকটা পর্যটন সংস্থা আর ফেরির কাউন্টার আছে। তেমনই একটা কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানলাম পনেরো মিনিটের মধ্যেই একটা স্পিড বোট ছাড়বে। তিন ঘণ্টা পর সেই স্পিড বোট আমাকে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে এখানেই ফিরিয়ে আনবে। স্পিড বোটে যাওয়ার আসার ভাড়া দুশো থাই ভাট। ভারতীয় মুদ্রায় হিসাব করলে টাকার অঙ্কটা দেড় হাজার টাকার মতো। যে বোটে কোরাল আইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই বোটেই আবার যাত্রীদের ফেরার নিয়ম। বিদেশি ট্যুরিস্টদের সেখানে যেতে হলে একটা ফর্ম ভরতে হয়। টিকিট কিনে ফর্ম ফিলআপ করার পর আমার হাতে একটা সবুজ রঙের ব্যান্ড পরিয়ে দিল। এক এক কোম্পানির এক এক রঙের ব্যান্ড। যা দেখে শনাক্ত করা যায় কে কোন বোট বা ট্রাভেল কোম্পানির যাত্রী। জেটির প্রথম খানিকটা অংশ কংক্রিটের তারপর সেখান থেকে নামতে হয় ফাইবারের তৈরি সমুদ্রের ঢেউয়ে দুলতে থাকা ভাসমান জেটিতে। তার গায়েই লাগানো থাকে স্পিড বোটগুলো। ভাসমান দোদুল্যমান জেটিতে শরীরের ভারসাম্য রেখে চলতে হয়। নইলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
সাদা রাজহাঁসের মতো একটা স্পিড বোট। চালক আর তার সহযোগী ছাড়া আমরা আটজন যাত্রী। ভেসে পড়ল স্পিড বোট। প্রথমে ধীর গতিতে তারপর দুরন্ত গতিতে। জল ছিটকে আসছে গায়ে। যাত্রীদের চোখে মুখে গতির উল্লাস। মাথার ওপর ঝলমলে নীল আকাশ, স্বচ্ছ সমুদ্রের জল। ভালো করে খেয়াল করলে জলের নীচের উদ্ভিদও দেখা যাচ্ছে। আমরা যাচ্ছি সেদিকে, সবুজ পাহাড় আছে যেদিকে। তবে বোট কিন্তু সরাসরি আমাদের কোরাল আইল্যান্ডে নিয়ে গেল না। বোট আমাদের নিয়ে উপস্থিত হল সমুদ্রের ভিতর থেকে উঠে আসা কংক্রিটের স্তম্ভের ওপর কাঠের একটা প্লাটফর্মের গায়ে। চালক জানাল, এখানে এক ঘণ্টা বোট দাঁড়াবে। এ জায়গায় স্কুবা ডাইভিং, ওয়াটার প্যারাসেলিং ইত্যাদির ব্যবস্থা আছে। চারপাশে সমুদ্র ঘেরা সেই জায়গায় একটা ছোট রেস্তরাঁ আছে। বসবার জন্য ফাইবারের চেয়ারও আছে। দেখলাম পাটাতনের একটা অংশ থেকে ডাইভিং মাস্ক, পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে জলে নামানো হচ্ছে। বসে বসে দেখলাম, চারপাশের সমুদ্রের সৌন্দর্য, জলের ভিতর থেকে কিছু দূরে জেগে থাকা সবুজ পাহাড় আর সমুদ্র ক্রীড়া। বোট আমাদের নিয়ে আবার রওনা হল। আমাদের কাছে এগিয়ে আসতে লাগল সমুদ্রের বুক থেকে উঠে আসা খাড়া স্তম্ভের মতো পাথরগুলো। তার গায়ে সবুজ গাছপালা। বহু হাজার বছর আগে সম্ভবত এ জায়গায় সমুদ্রের বুক থেকে উঠে আসা পাহাড় ছিল। অথবা সমুদ্র তখনও এখানে বিস্তার লাভ করেনি। ওই স্তম্ভ আকৃতির পাথরগুলো আজও মহাকালের সাক্ষ্যবহন করে চলেছে। ভারী সুন্দর দেখতে সমুদ্রর বুকে এ জায়গা। স্পিড বোটের চালক বলল, বহু হলিউড সিনেমার শ্যুটিং হয় এ জায়গায়। তবে জলের বুকে জেগে থাকা ওই সব পাহাড়ে নামতে হলে বিশেষ সরকারি অনুমতি নিতে হয়।
এক সময় তাদের পাশ কাটিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম কোহ লার্ন বা কোরাল আইল্যান্ডে। এখানেও প্রথমে ফাইবারে ভাসমান জেটির পর কংক্রিটের জেটি ধরে দ্বীপের বেলাভূমিতে পৌঁছতে হয়। বোট থেকে নামার সময় চালক জানাল, ঘড়ি ধরে ঠিক দুপুর দুটোয় বোট জেটি ছেড়ে যাবে। সময়ের ব্যাপারটা যেন সবাই বিশেষভাবে খেয়াল রাখেন।
বোট থেকে নেমে জেটি পেরিয়ে সমুদ্র তটে নেমে পড়লাম। ধবধবে সাদা বালির সমুদ্র তট। সৈকতে সার বেঁধে বেশ কিছু দোকান আছে। খাবার, টি শার্ট, সুভেনিরের দোকান। তটের খানিকটা তফাতেই অর্ধ চন্দ্রাকারে সৈকতকে ঘিরে থাকা সবুজ টিলা। পর্যটকদের বেশ ভিড়ও আছে। কেউ সাদা বালু তটে শুয়ে টুপি দিয়ে মুখ ঢেকে সান বাথ নিচ্ছে, কেউ বা আবার জলে পা ভিজিয়ে স্নান করতে নেমেছে। সমুদ্র তট এত পরিষ্কার এবং জল এত স্বচ্ছ যে, আকর্ষণ প্রত্যাখ্যান করতে পারলাম না। হাঁটু পর্যন্ত জলে নেমে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। জলের নীচেও ধবধবে সাদা বালি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এমন কাকচক্ষু সমুদ্রের জল আমি খুব কম সমুদ্র তটেই দেখেছি। তবে তফাত থেকে জলকে নীল দেখায় আকাশের নীল ছায়া পড়ার কারণে। বেশ অনেকটা সময় ধরে সমুদ্রের জলে ঘুরে বেড়ানোর পর তটে উঠে এলাম। ঘুরতে শুরু করলাম দোকানগুলোতে। ছোট একটা দোকানে এক বৃদ্ধ বসেছিলেন টি-শার্ট ইত্যাদি জামা-কাপড় বিক্রি করছিলেন। খেয়াল করে দেখলাম তার তালপাতার ছাউনি দেওয়া দোকানের পিছন থেকে রাস্তা উঠে গেছে টিলার দিকে। তার কাছে জানতে চাইলাম, ‘ও পথ দিয়ে ওপরে যাওয়া যায়।’
সে বলল, ‘যায়। তবে ওপরে কোনও ঘর-বাড়ি, দোকান পাট নেই। এ জায়গায় রাতে কোনও মানুষ থাকে না। সূর্য ডোবার আগেই আমাদেরও এই দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে হয় জিনিসপত্র নিয়ে। এটাই সরকারি নিয়ম। তবে ওপরে উঠতে কোনও নিষেধ নেই। খানিক ওপরে উঠলেই একটা ছোট সমতল ফাঁকা জায়গা আছে। সেখানে দাঁড়ালে আপনি ওপাশে পাটায়া শহর দেখতে পাবেন।’
সে দৃশ্য দেখার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। উঠতে শুরু করলাম টিলার গায়ের পথ বেয়ে। পথ খুব খাড়া নয়, পাকদণ্ডীর মতো ধীরে ধীরে ওপরে উঠেছে। পথের দু’পাশে সবুজ বনানী। মাঝে মাঝে ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে। যত ওপরে উঠতে লাগলাম তত নীচের সমুদ্র তটের কোলাহল, বোট চলাচলের শব্দ কমে আসতে লাগল। এক সময় পৌঁছে গেলাম টিলার গায়ে থাকের মতো সমতল জায়গাতে। সত্যিই সেখান থেকে নীচের সমুদ্র তট আর সামনে সমুদ্রের অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। অন্য দিকের পাটায়ার সমুদ্র তটরেখাও দেখা যাচ্ছে। সে দিকের বড় বড় বিল্ডিংগুলোকে খেলনা গাড়ির মতো দেখতে লাগছে। আর পায়ের নীচে সমুদ্রের বুকে স্নানরত মানুষগুলোকেও বিন্দুর মতো লাগছে আর বোটগুলোকেও খেলনার মতো। যে জায়গায় আমি দাঁড়িয়ে সে জায়গার বাতাস এত নির্মল যে উঠতে গিয়ে আমার সামান্য যে হাঁফ ধরেছিল অক্সিজেন সমৃদ্ধ বাতাসে তা যেন নিমেষেই দূর হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে খেয়াল করলাম দেড়টা বাজে। এবার আমাকে ফিরতে হবে। বোট ছাড়ার সময় দেওয়া হয়েছে ঠিক দুটো।
ওপরে উঠতে বেশি সময় লাগলেও নীচে নামতে তার অর্ধেক সময় লাগল। নীচে ফিরে দেখলাম সমুদ্র তট অনেকটাই ফাঁকা হতে শুরু করেছে। একের পর এক বোট জেটি ছেড়ে ট্যুরিস্টদের নিয়ে রওনা হতে শুরু করেছে পাটায়ার দিকে। জেটিতে আমার বোট যেখানে বাঁধা ছিল সেখানে গিয়ে দেখলাম বোট নেই। চারপাশে যে বোটগুলো দাঁড়িয়ে আছে তাদের মধ্যেও সে নেই। বাধ্য হয়ে এক বোট কর্মীকে জিজ্ঞেস করাতে সে আমার হাতের ব্যান্ড আর বোটের বিবরণ শুনে বলল, ‘তোমার বোট তো খানিক আগেই তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে। ফেরার আগে তোমাকে তারা খোঁজাখুঁজিও করছিল।’ আমি বললাম, ‘আমার বোট তো দুটোর সময় ছাড়ার কথা!’
লোকটা বলল, ‘ওই সময়ই বোট ছেড়েছে। এখানে বোট সময় মেনে চলে।’
ব্যাপার কী হল। আমার ঘড়িতে তো এখনও দুটো বাজতে দশ মিনিট বাকি। আর এরপরই আমি ব্যাপারটা ধরতে পারলাম। থাইল্যান্ডের সময় আমাদের ভারতের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে। আমার ঘড়ি এ দেশের সময়ের সঙ্গে মেলানো হয়নি। তাতেই বিপত্তি।
এবার আমাকে তবে অন্য বোটে ফিরতে হবে। সে ব্যবস্থা করার জন্য যে বোটগুলো জেটি ছেড়ে যাচ্ছে তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগলাম। কিন্তু কেউ তাদের বোটে আমাকে তুলতে রাজি হল না। এমন নিয়ম নাকি নেই। আর তাদের কাছে এ কথাও জানতে পারলাম, এ দ্বীপে কোনও টিকিট কাউন্টার নেই, যেখান থেকে টিকিট কেটে আমি পাটায়া ফিরে যেতে পারি। তবে কি বিদেশে এই নির্জন দ্বীপে আমাকে একলা রাত্রিবাস করতে হবে! বুঝলাম এ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে হলে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।
জেটি ছেড়ে যাওয়া বোটগুলোর চলে যাওয়ার দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা ব্যাপার আমার মাথায় এল। আমি জেটি থেকে ছুটলাম সেই বুড়োর কাছে, যার কাছ থেকে টি-শার্ট কিনেছিলাম। আমার সব কথা শুনে বৃদ্ধ বলল, ‘আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারি, কিন্তু দুটো ব্যাপার, আমার দোকানের মালপত্র গুছিয়ে নৌকায় নিয়ে যেতে আরও ঘণ্টা খানেক সময় লাগবে। আর আমার নৌকাতে কিন্তু ইঞ্জিন নেই। দাঁড় বেয়ে আমি ফিরি। কাজেই কুড়ি-পঁচিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে তোমার এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।’
আমি বললাম তাতে আমার কোনও সমস্যা নেই। যেভাবেই হোক ফেরাটাই আমার বড় কথা।
এক ঘণ্টা পর বুড়ো তার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে জেটির দিকে রওনা হল। সমুদ্র সৈকত এখন জনশূন্য। দোকানগুলোর ঝাঁপও অধিকাংশই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
দোকানিদের বোট বা নৌকাগুলো বাঁধা থাকে জেটির কাছে এক জায়গায়। ছিপ নৌকার মতো দেখতে লম্বাটে, সরু একটা নৌকা। তাতেই বুড়ো মালপত্র আর আমাকে নিয়ে উঠে বসল। তারপর কাছি খুলে দাঁড় বাইতে শুরু করল। সূর্য এখন ঢলতে শুরু করেছে। পিছনের জনহীন দ্বীপ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকলাম আমরা। বুড়ো আমাকে আগে যা বলেনি তা হল নৌকার দুলুনির কথা। যদিও অতি সামান্য ঢেউ শান্ত সমুদ্রে। কিন্তু দ্বীপ থেকে কিছুটা এগতেই দুলতে শুরু করল নৌকা। বিশেষত যখন আমরা সমুদ্রের বুকের পাথরের স্তম্ভগুলোর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন নৌকা এমনভাবে এপাশ-ওপাশ কাত হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি নৌকা উল্টে যাবে। কারণ জলরাশি পাথরের গায়ে ঘা খেয়ে ওঠা-নামা করছে। এও এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। বুড়ো দোকানি দাঁড় বাইতে বাইতে আমাকে আশ্বাস দিয়ে বলল, ‘ভয় নেই, আমরা ঠিক পৌঁছে যাব। গত চল্লিশ বছর আমি এভাবেই আসা-যাওয়া করি। এমনকী ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও ঠিক পৌঁছে গেছি।’
তার কথাই সত্যি হল শেষ পর্যন্ত। সমুদ্রে সূর্যের ডুবে যাওয়া দেখতে দেখতে পাটায়ার জেটিতে এক সময় ঠিক পৌঁছে গেল নৌকা। শহরের নিয়নের আলোগুলো তখন রাত জাগার প্রস্তুতিতে জেগে উঠেছে। রাতই এ শহরের দিন। এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা বুকে নিয়ে নৌকা থেকে নামার সময় বুড়োকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কত টাকা দিতে হবে?’
বুড়ো হেসে বলল, ‘টাকা দিতে হবে না। তবে ঘড়ির সময়টা মিলিয়ে নিও।’ 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ