স্বরলিপি ভট্টাচার্য: হেমন্তের দুপুর। দক্ষিণ কলকাতার রাস্তা। টুংটুং শব্দে হাতেটানা রিকশা নিয়ে হাজির ‘জওহর’। তিনি সে পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন। অনুরোধ করলাম কিছুক্ষণ আমাদের সঙ্গে তাঁর রিকশা নিয়ে থাকতে। রাজি হলেন। রিকশা জায়গামতো রেখে তৈরি টিম ‘চতুষ্পর্ণী’। কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা। গাড়ি থেকে নেমে সোজা রিকশায় বসে ক্যামেরায় তাকালেন আবীর চট্টোপাধ্যায়। ঝিমনো দুপুর মুহূর্তের ম্যাজিকে যেন সচল হয়ে উঠল।
সদ্য মুক্তি পেয়েছে অর্জুন দত্ত পরিচালিত ‘ডিপ ফ্রিজ’। সে ছবির আড্ডা জমল ফটোশ্যুটের পর। জাতীয় পুরস্কার এই ছবির মুকুটের অন্যতম পালক। সাধারণ দর্শককে কি সিনেমাহলে নিয়ে যায় জাতীয় পুরস্কার? আবীর বললেন, ‘বাংলা ছবির ক্ষেত্রে আমার প্রাক অভিজ্ঞতা বলছে, যায়। ‘বিসর্জন’-এর ক্ষেত্রে যেদিন প্রোমোশন শুরু করেছিলাম, সেদিনই জাতীয় পুরস্কারের খবর পেয়েছিলাম। আশা করি, মানুষ আগ্রহী হবেন। তবে নেতিবাচক দিকও আছে। জাতীয় পুরস্কার মানে অনেক দর্শক মনে করেন কঠিন, গম্ভীর বিষয়। তাঁরা মনে করেন, এমনিই আমাদের জীবনে অনেক ওঠাপড়া চলছে। সিনেমা হলে গিয়ে আমরা গম্ভীর বিষয় দেখব না। সেটাও হতে পারে। তবে অর্জুনের নিজস্ব দর্শক আছে। অপেক্ষাকৃত নবীন পরিচালক হিসেবে ও জাতীয় পুরস্কার পাওয়ায় বেশি খুশি হয়েছিলাম।’
বাংলা ছবিতে সম্পর্কের গল্প বহুদিন ধরে বলা হয়েছে। ‘ডিপ ফ্রিজ’-ও কি তেমনই? নায়কের উত্তর, ‘সাহিত্যনির্ভর ছবি যখন হতো, তখনও সম্পর্কের গল্প হয়েছে। তাবড় পরিচালক, অভিনেতা এই ধরনের ছবি করেছেন। আমরা যেহেতু তাঁদের উত্তরসূরী, তাই আমাদের উপর প্রত্যাশার চাপ বেশি ছিল বলেই আমি মনে করি।’
‘ডিপ ফ্রিজ’ কি একাকিত্বের কথা বলে? বহু মানুষের মাঝে থেকেও সম্পর্কের শীতলতা কি ছবির বিষয় হয়ে উঠেছে? কফির কাপে চুমুক দিয়ে আবীর বললেন, ‘এই ছবির ক্ষেত্রে অনেকগুলো মতামত তৈরি হবে। মানুষ বিভিন্নভাবে ছবিটা দেখবেন। বিভিন্ন আলোচনা হবে। আমার কাছে সেটাও সাফল্যের মাপকাঠি। এই ধরনের ছবির মূল উদ্দেশ্য কিন্তু মানুষকে ভাবানো। বিনোদন অবশ্যই থাকবে। কিন্তু গল্পটা যে সদর্থকভাবে শেষ হচ্ছে, সেটা আমার চিত্রনাট্য পড়ার পরই ভালো লেগেছিল। চরিত্রগুলো যে জার্নির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে মিল রয়েছে বলেই ‘ডিপ ফ্রিজ’ নামটা রাখা হয়েছে।’
ইদানীং বাংলা ছবির সাফল্যে ‘ফ্যান ক্লাব’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আবীরের মত, ‘অনুরাগী শব্দটা আমার কাছে খুব সম্মানের। এটা যে খুব দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক তা কিন্তু নয়। সারাজীবন কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয় না। কিন্তু তাঁরা আমাদের কাজ দেখে প্রশংসা করেন। আমাদের ভালোবাসেন। ছবি হিট করার ক্ষেত্রে ফ্যান ক্লাবের ভূমিকা তো রয়েইছে। এখন সেটা আরও বাড়ছে। বিভিন্ন দক্ষিণী ছবির কার্টসিতে ফ্যান ক্লাবগুলির নাম দেওয়া থাকে। প্রতিটা ফ্যান ক্লাবের নিজস্ব কিছু ঘরানা রয়েছে। আমার ক্ষেত্রে দেখেছি, আমার কাছ থেকে যে ধরনের কাজ ওঁরা চান, সেটা অন্যদের মতো নয়। ফ্যান ক্লাব বলতে ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো দেখতে যাওয়া, মালা পরানো, পটকা ফাটানো— এই ধরনের ফ্যান ক্লাব আমার অতটা নেই। সেটা নিয়ে আমার কোনও দুঃখও নেই। কারণ আমি যে ধরনের কাজ করি, তার সঙ্গে এই স্টাইলটা মেলে না। আবার শহরে বা শহরের বাইরে নানা কাজে গিয়ে বহু মানুষকে দেখে খুশি হয়েছি, নানা ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁরা আমার ছবি দেখেছেন। আমার সঙ্গে আলোচনা করেছেন।’
রাস্ট রঙের পাঞ্জাবি এবং নীল শার্ট, ফ্যাশন শ্যুটে দুটো লুক তৈরি হয়েছিল আবীরের। সব ধরনের পোশাকেই সমান স্বচ্ছন্দ অভিনেতা। পর্দায় তিনি চরিত্র হয়ে ওঠেন। কখনও তা ফেলুদা, ব্যোমকেশের মতো আইকনিক চরিত্র। কখনও বা তাঁকে হতে হয় দায়িত্ববান স্বামী। অথবা বিশ্বস্ত বন্ধু। চরিত্র অনুযায়ী বদলে যায় সাজপোশাক। কিন্তু বাস্তবে ফ্যাশন নিয়ে কতটা সচেতন নায়ক? হেসে বললেন, ‘আমি ওল্ড স্কুল। মিনিমালিস্ট। কোথায় যাচ্ছি, কী অনুষ্ঠান, তার উপর পোশাক নির্ভর করে। তাছাড়া যাঁরা আমার সঙ্গে কাজ করেন, তাঁদের উপরও অনেকটা নির্ভর করি। হয়তো কোথাও যাওয়ার আগে কোনও নির্দিষ্ট ডিজাইনারের পোশাক না পরলেও একবার ফোন করে আলোচনা করে নিলাম যে, কোন ধরনের পোশাক পরব। এটা হয়েই থাকে।’
কাজের প্রয়োজনে নানা রঙের পোশাক পরতে হয় তাঁকে। কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দ? আবীরের উত্তর, ‘এমনিতে প্যাস্টেল শেড পছন্দ করি। আবার উজ্জ্বল রং পরতেও অসুবিধে নেই। আমার স্ত্রী নন্দিনী মাঝেমধ্যেই বলে, আজ আর কালো নয়। আমি এতটাই কালো রঙের ভক্ত (হাসি)। সেটা আমার কালেকশন দেখলেই বোঝা যাবে। নিজের পোশাক অনেক বছর হয়ে গেল আমি আর নিজে কিনি না। যেটুকু কেনার নন্দিনীই কেনে।’ পোশাক আরামদায়ক কি না, সেটা নায়কের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পোশাক যেন ব্যক্তিত্বকে ছাপিয়ে না যায়, সেটাও জরুরি।