সন্দীপ স্বর্ণকার, নয়াদিল্লি: আধার এবং ভোটার কার্ড, এই দুই পরিচয়পত্রকে প্রামাণ্য নথি হিসেবে মান্যতা দিতে হবে। ইন্টেনসিভ রিভিশন সংক্রান্ত মামলায় সোমবার নির্বাচন কমিশনকে এই বার্তাই দিল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বারবার কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদীর কাছে জানতে চাইলেন, কেন আধার, ভোটার এবং রেশন কার্ডকে প্রামাণ্য নথি হিসেবে গ্রাহ্য করা হবে না? কমিশনের আইনজীবী বোঝানোর চেষ্টা করেন, ‘রেশন কার্ডে বহু ক্ষেত্রে গোলমাল থাকে।’ এই যুক্তি শুনে দৃশ্যত বিরক্ত বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘রেশন কার্ড না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু আধার? ভোটার পরিচয়পত্র? এই দু’টি কেন নিচ্ছেন না?’ শুনানির পর্যবেক্ষণে কমিশনের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘যে ১১টি নথি ইনিউমারেশন ফর্মের সঙ্গে প্রামাণ্য হিসেবে নিচ্ছেন, সেগুলোও তো জাল হতে পারে। তাহলে?’
ইন্টেনসিভ রিভিশন নিয়ে উত্তাল হয়ে রয়েছে গোটা দেশ। বিহার দিয়ে শুরু হলেও এরপর যে বাংলা এবং তারপর অন্য রাজ্যের পালা, তা পরিষ্কার করে দিয়েছে কমিশন। ফলে উদ্বেগের মেঘ শুধু ভোটমুখী বিহারে আটকে নেই। সেখানে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রয়েছে কমিশনের নির্দেশিত নথি। ফলে এদিনের শুনানির দিকে নজর ছিল সব মহলের। একদিকে সুপ্রিম কোর্ট, অন্যদিকে সংসদ। কমিশন এবং সরকারকে বস্তুতই ইন্টেনসিভ রিভিশন ইস্যুতে নাজেহাল হতে হয়েছে। সংসদ চত্বরে সকাল থেকেই ছিল বিক্ষোভ। মল্লিকার্জুন খাড়্গের ঘরে রাহুল গান্ধী, ডেরেক ও’ব্রায়েন, কানিমোঝিদের মতো বিরোধীরা একজোট হয়ে ঠিক করে নেন, এসআইআর ইস্যুতে বিরোধিতা চলবেই। সেই মতো সংসদের দুই কক্ষে সম্মিলিত বিরোধীরা ওয়েলে নেমে প্রবল প্রতিবাদও জানিয়েছে। দফায় দফায় মুলতুবি হয়েছে অধিবেশন।
আর এই ইস্যুতে অবশ্যই কেন্দ্র তথা কমিশনকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বিশেষত বিচার্য নথি নিয়ে। বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেছেন, ‘আজকাল সব নথিই জাল হতে পারে। আধার এখন যেখানে প্রায় সবকিছুর সঙ্গেই যুক্ত, তা না নেওয়ার কী অর্থ? ভোটার তালিকায় গণহারে নাম বাদ দিচ্ছেন। অথচ উচিত উল্টোটাই। গণহারে নাম অন্তর্ভুক্ত করা। আধার এবং ভোটার কার্ড, এই দু’টিকে প্রামাণ্য নথির তালিকায় যুক্ত করুন।’ যদিও এ বিষয়ে এদিন কোনও ‘নির্দেশ’ দেয়নি আদালত। বিচারপতি সূর্য কান্ত জানিয়ে দেন, ‘মঙ্গলবার সকালে জানাব, কবে বিস্তারিত শুনানি হবে।’ চাপে পড়ে কমিশনের আইনজীবী বলেন, ‘আধার নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। আধার আইনেই সেটি বলা আছে। তবে আমরা তো ইনিউমারেশন ফর্মে আধার নিচ্ছি। ভোটার পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়েই তো ফর্ম জমা নেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া ১ আগস্ট খসড়া তালিকাই প্রকাশ হবে। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে কেউ নিজেদের নাম তোলা বা কারেকশনের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তারপরই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হবে।’
পাল্টা সওয়ালে মূল আবেদনকারী অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মসের আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট ১০ জুলাই বলার পরও আধার-ভোটারকে মান্যতা দেওয়া হয়নি। আদালত অবমাননা করা হয়েছে। তাই এই খসড়া তালিকাও প্রকাশ হওয়া উচিত নয়।’ খসড়া তালিকা প্রকাশে স্থগিতাদেশ না দিলেও বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘এখন স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে না ঠিকই। তবে চূড়ান্ত শুনানি শেষে যদি দেখা যায়, প্রক্রিয়ায় কোনও বেআইনি ঘটনা ঘটেছে, পুরো প্রক্রিয়াই বাতিল করে দেবে কোর্ট।’ আইনজীবী কপিল সিবাল আদালতে জানান, ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকারও এ ব্যাপারে মামলা ফাইল করেছে।’ ফলে এসআইআর রুখতে আইনি পদক্ষেপে যুক্ত হল বাংলা। বিহারের পর পশ্চিমবঙ্গে শুরু হবে এসআইআর। তাই আগে থেকেই এই মামলায় যুক্ত হয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে রাখল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার।