সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: টানা বারোদিন দু’ চোখের পাতা এক করতে পারেনি আসানসোল ডিপু পাড়ার মুখোপাধ্যায় পরিবার। তাদের বাড়ির ছেলে আবির। অত্যন্ত মেধাবী। পদার্থবিদ্যায় পোস্ট ডক্টরেট করতে গিয়েছিলেন ইজরায়েলে। পড়তেন ওয়াইজমেন ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে। সেটি রেহভ্ট শহরে অবস্থিত। সে দেশের অন্যতম সেরা গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান। সেখানেই আছড়ে পড়েছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র। আবিরকে আশ্রয় নিতে হয় সেল্টার হাউসে। এভাবে কেটেছে প্রায় দু’সপ্তাহ। অবশেষে কেন্দ্র সরকারের তৎপরতায় আবির মঙ্গলবার সকালে দেশে ফিরেছেন। ইজরায়েল-ইরানের যুদ্ধে বহু মানুষের প্রাণহানির মধ্যে মৃত্যু একটি স্বপ্নেরও! গবেষণা ছেড়ে চলে আসতে হয় আবিরকে। তা হোক। ছেলে যে অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরছে, তাতেই স্বস্তি ফিরেছে মুখোপাধ্যায় পরিবারে।
প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা। ঝকঝকে রেজাল্ট আবিরের। মাধ্যমিক পাশ আসানসোল রামকৃষ্ণ মিশন হাইস্কুল থেকে। আসানসোল ওল্ড স্টেশন হাইস্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক। স্নাতকস্তরে ভর্তি হন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর কলকাতার আইআইএসইআর থেকে ফিজিক্সে ডক্টরেট করেন। স্কলারশিপ নিয়ে পোস্ট ডক্টোরেট করার সুযোগ পান বিশ্বের অন্যতম নামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়াইজমেন ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে। গত বছরই তিনি ইজরায়েলে গিয়েছিলেন। ইজরায়েলের সঙ্গে গাজার যুদ্ধ লেগে থাকলেও পরিবারে উদ্বেগের ছাপ সেভাবে পড়েনি। আবিরদের গবেষণার কাজেও সেই যুদ্ধ কোনও প্রভাব ফেলেনি। এরপর ইরানে ইজরায়েল আক্রমণ করে। তখনও গবেষণারত পড়ুয়াদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়ায়নি। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, ইরান শত চেষ্টা করলেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি ইজরায়েলের ডিফেন্স সিস্টেম ‘আয়রন ডোম’কে হারাতে পারবে না। কিন্তু, তাঁদের সব আত্মবিশ্বাস আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে গত শুক্রবার। তখন গভীর রাত। ঝাঁকে ঝাঁকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়েছে ইজরায়েলের মাটিতে। বাদ যায়নি ওয়াইজমেন ইনস্টিটিউটও। প্রতিষ্ঠানটি ইজরায়েলের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে হামলার খবর পেয়েই চলে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে কড়া ভাষায় ইরানি হামলার নিন্দা করেছিলেন।
সেই আক্রমণের ছবি টিভিতে দেখে আতঙ্কে কুঁকড়ে গিয়েছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। তাঁর বড় ছেলে আবির যে ওই প্রতিষ্ঠানেরই গবেষক ছাত্র! মায়ের মন বাগ মানেনি। পরে অবশ্য তিনি জানতে পারেন, ছেলে ভালো রয়েছে। আধুনিক দেশ ইজরায়েল তাঁদের বেশিরভাগ বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে সেল্টার হাউস করে রেখেছে। আবির যে আবাসনে থাকতেন, তাঁর নিচেও ছিল সেল্টার হাউস। সেখানেই আবির সহ অন্য অনেকেই আশ্রয় নেন। মুখোপাধ্যায়ের পরিবারের লোকজন এদিন বলছিলেন, যখনই ইরান হামলা চালাত সবার আগে আবিরের মোবাইলেই অ্যালার্ট আসত। তখনই তাঁরা দ্রুত সেল্টার হাউসে চলে যেত। সেখানে চলে গেলে যোগাযোগ সব বিচ্ছিন্ন। তখন বাবা, মায়ের চোখ থাকত টিভির পর্দায়। অবশেষে সেই টেনশনের দিন শেষ। আবিরের বাবা শুভাশিস মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘ওরা প্রথমে সড়ক পথে জর্ডন আসে। তারপর ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের বিমানে তাঁদের গাজিয়াবাদে নিয়ে আসা হয়। ছেলেকে সুস্থ ভাবে দেশে ফেরানোর জন্য ভারত সরকারকে ধন্যবাদ। আমার ছেলেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ইজরায়েল সরকারের কাছেও কৃতজ্ঞ। তবে আক্ষেপ একটাই, ওই প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ সবাই পায় না। যুদ্ধের জন্য আমার ছেলেকে ফিরতে হল!’ • একেবারে ডানদিকে আবির।