Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অযৌক্তিক যুগে যুক্তির প্রতি আর্জি

ভারতের সংবিধানের ১৬৮ অনুচ্ছেদ ‘প্রতিটি রাজ্যের জন্য একটি আইনসভা থাকবে যার মধ্যে থাকবেন রাজ্যপাল’ এবং ... দুটি কক্ষ ... অথবা একটি কক্ষ

অযৌক্তিক যুগে যুক্তির প্রতি আর্জি
  • ১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ভারতের সংবিধানের ১৬৮ অনুচ্ছেদ ‘প্রতিটি রাজ্যের জন্য একটি আইনসভা থাকবে যার মধ্যে থাকবেন রাজ্যপাল’ এবং ... দুটি কক্ষ ... অথবা একটি কক্ষ। আমার সবসময় মনে হয়েছে, রাজ্যের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাজ্যপালের উপস্থিতি অপ্রয়োজনীয়। কেন একজন অনির্বাচিত কর্মকর্তা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত আইনসভার সদস্য হবেন? এক বা একাধিক আইনসভা কক্ষে ভাষণ প্রদান এবং অন্যান্য তথাকথিত ‘আইনসভা’ কার্যাবলির (ধারা ২০২ থেকে ২০৭) মতো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করা যেতে পারে, রাজ্য আইনসভার অংশ হিসেবে রাজ্যপাল না-হয়েও—যেমনটা রয়েছে ইংল্যান্ডের রাজার ভূমিকা।

Advertisement

রাজ্যের আইনসভা শাখায় গভর্নর বা রাজ্যপালের আসল ভূমিকা হল বিলগুলিতে সম্মতি প্রদান করা। কোনও বিল আইনে পরিণত হওয়ার আগে আইনসভা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য এটি প্রকৃতপক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আইনসভা যাতে সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন না করে তা নিশ্চিত করার জন্য, কোনও ব্যক্তিকে সম্মতি প্রদান বা প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা প্রদান করা প্রয়োজন।
যাচাই হোক, স্থগিত নয়
অনুচ্ছেদ ২০০-তে বলা হয়েছে: ‘যখন কোনও রাজ্যের বিধানসভায় কোনও বিল পাস হয় ... তখন এটি রাজ্যপালের কাছে উপস্থাপন করা হবে এবং রাজ্যপাল ঘোষণা করবেন যে তিনি বিলটিতে সম্মতি দিয়েছেন অথবা তিনি সম্মতি প্রত্যাখ্যান করেছেন অথবা তিনি বিলটি রাষ্ট্রপতির বিবেচনার জন্য সংরক্ষণ করেছেন।’
অনুচ্ছেদ ২০০-র শর্তাবলিতে বলা হয়েছে যে, রাজ্যপাল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিলটি আইনসভায় ফেরত পাঠাতে পারেন ‘বিল বা এর কোনও নির্দিষ্ট বিধান পুনর্বিবেচনা করার’ জন্য এবং ‘তাঁর সুপারিশ অনুসারে যেকোনও সংশোধনী আনার ইচ্ছা বিবেচনা করার জন্য।’ এটি আইনসভার উপর একটি সুস্থ পরীক্ষা কিন্তু আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করার লাইসেন্স নয়।
রাজ্যপালগণ—বিশেষ করে বিরোধী-শাসিত রাজ্যগুলিতে—২০০ অনুচ্ছেদের অধীনে তাঁদেরকে প্রদত্ত ক্ষমতা নিয়ে পাগলামি করেছেন। তাঁরা ধরে নেন যে, তাঁদের চেক বা যাচাই করার ক্ষমতাটি আসলেন স্থগিত করে দেওয়ার লাইসেন্স। তাই, তাঁরা ‘পকেট ভেটো’ আবিষ্কার করেছেন। পকেট ভেটো কেবল অলসভাবে বসে থাকার জন্য; অন্য কথায়, সম্মতি না দেওয়া; সম্মতি আটকে রাখা এবং বিলটিকে পুনর্বিবেচনার জন্য আইনসভায় ফেরত পাঠানো; অথবা রাষ্ট্রপতির বিবেচনার জন্য বিলটি সংরক্ষণ না করা। পকেট ভেটো হল একটি নির্ভেজাল বিদ্বেষ। এটি আইনসভা কর্তৃক পাস হওয়া বিলের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের ইচ্ছাকে ব্যর্থ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। সংবিধানের অধীনে পকেট ভেটোর কোনও অনুমোদন নেই।
সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, যখন কোনও বিল রাজ্যপালের কাছে পেশ করা হয়, তখন তিনি হয় সম্মতি দিতে পারেন; অথবা সম্মতি আটকে রেখে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিলটি পুনর্বিবেচনার জন্য আইনসভায় ফেরত পাঠাতে পারেন; অথবা রাষ্ট্রপতির বিবেচনার জন্য সংরক্ষণ করতে পারেন। বেঞ্চ ‘পকেট ভেটো’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এই সিদ্ধান্তগুলিকে নিশ্চিত করেছে। কিছু বিষয়ে দুটি বেঞ্চের মধ্যে মতবিরোধ ছিল কিন্তু সেই বিষয়গুলি সাধারণ নাগরিককে আতঙ্কিত করে না। বিতর্কের জন্য সেই বিষয়গুলিকে আমরা আইনবিশারদদের উপর ছেড়ে দিতে পারি।
সাধারণ নাগরিকের উদ্বেগ
সাধারণ নাগরিকের কাছে গুরুতর উদ্বেগের বিষয়টি হল, বিলটি বিবেচনার ব্যাপারে রাজ্যপালের জন্য সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুটি বেঞ্চের মধ্যে মত পার্থক্যের কারণগুলি (মেজর পয়েন্ট অফ ডিফারেন্স)। দুই বিচারপতির বেঞ্চ কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল, আর তাতে আপত্তি তুলে বাতিল করে দিয়েছিল পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ। বৃহত্তর বেঞ্চকে ‘লেটার অফ দ্য কনস্টিটিউশন’ দিয়ে রাজি করানো হয়েছিল, যেখানে স্পষ্টভাবে কোনও সময়সীমা নির্দিষ্ট করা হয়নি। বৃহত্তর বেঞ্চ ‘সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের কার্য সম্পাদনের স্থিতিস্থাপকতা’, ‘বিভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং পরিস্থিতি’ এবং ‘আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা’র উপর জোর দিয়েছিল। এই নীতিগুলি তাত্ত্বিক এবং সাংবিধানিকভাবে ব্যতিক্রমী।
যাই হোক, ডঃ আম্বেদকরের সতর্কবাণীও সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনা করা উচিত ছিল। গণপরিষদে তাঁর সমাপনী ভাষণে ডঃ আম্বেদকর বলেছিলেন (যেখানে মানবিক দুর্বলতাগুলির প্রতিফলন ছিল):
‘একটি সংবিধান যতই ভালো হোক না কেন, তা অবশ্যই খারাপ হয়ে যাবে, কারণ এটি কার্যকর করার জন্য যাঁদের ডাক পড়ে তাঁরা যে খারাপের দলে থাকে। সংবিধান যতই খারাপ হোক না কেন, এটি কার্যকর করার জন্য যাঁদের আহ্বান করা হয়, যদি তাঁরা ভালোর দলে থাকেন তবে সেটি ভালো হতে পারে।’
আমি ভয় পাচ্ছি যে, বর্তমানে রাজ্যপালের পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের ‘একটি অংশ’ অবশ্যই ‘উত্তম অংশ’ (গুড লট) নয়। তাঁরা ঠিক যে কী, তার বিচার আমি পাঠকের উপরই ছেড়ে দিচ্ছি। তাঁরা কী করেন এবং কী করেন না, তা ভারতের জনগণের সামনেই ঘটে থাকে। যখন যথাযথভাবে নির্বাচিত আইনসভা কর্তৃক পাস হওয়া কোনও বিল মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে স্থগিত থাকে, তখন সংবিধান কার্যকর হয় না, সেটি বরং ধ্বংসই হয়ে যায়। ব্যর্থ হয় জনগণের ইচ্ছা।
আইনসভার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে রাজ্যপালরা এমন অসংখ্য ‘কীর্তিস্থাপন’ করেছেন, যার সৌজন্যে সাংবিধানিক ভারসাম্য ধ্বংস হয়েছে। এসব বিশেষ করে ঘটেছে ঝাড়খণ্ড, কর্ণাটক, কেরল, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো বিরোধী-শাসিত রাজ্যগুলিতে। পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চের কাছে প্রত্যাশা ছিল যে কর্তৃত্বপূর্ণভাবে সেটি ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করবে। এটি বিশ্লেষণের একটি চমৎকার কাজও করেছে। কিন্তু আদালতের সামনে উপস্থিত করা তথ্যাদি থেকে যা চিত্রিত হয়েছে তা বাস্তবতার থেকে অনেক দূরবর্তী। বস্তুত তার মতামত স্থাপিত হয়েছে একটি তাত্ত্বিক ভিত্তির উপর।
আইন ও বাস্তবতা
আইনকে অবশ্যই বাস্তবতার প্রতি সাড়া দিতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করা হতে পারে, যখন সুপ্রিম কোর্ট এটি ভেবেছিল—তখন তারা সংবিধানের ২১৭ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যাসহ হাইকোর্টের বিচারপতিদের নির্বাচন এবং নিয়োগের জন্য সুপারিশ করার ক্ষমতা নিজের কাছে নিয়েছিল। অনুচ্ছেদ ২০০ একটি গুরুতর সমস্যা তুলে ধরেছে। গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের সারমর্ম নিহিত আইনসভার আইন পাস করার ক্ষমতার মধ্যে। যখন আইনকে অযৌক্তিকভাবে এবং ইচ্ছা করে বাধার মুখে ফেলা হয় তখন কেবল যুক্তির কাছে আবেদন অর্থহীন হয়ে যাবে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ