নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: লালগোলা লস্করপুর হাইস্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক সুকান্ত ভট্টাচার্য্য। বীরভূমের মহম্মদবাজারের কৃষক পরিবারের ছেলে সুকান্তবাবু। ২০১৬ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে তিনি শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছিলেন। ২০০৬ সালে মাধ্যমিকে ভালো ফল করেন। তারপর পদার্থবিদ্যা নিয়ে বহরমপুরের কেএন কলেজ থেকে স্নাতক করেন। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করে বারাসাত স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি শেষ করেছেন গত বছর। লস্করপুর হাইস্কুলের পড়ুয়াদের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন সুকান্তবাবু। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে চাকরি হারানোর পর স্কুল ছেড়েছেন তিনি। কিন্তু, পড়ুয়ারা তাঁকে ছাড়তে নারাজ। স্কুল ছাড়ার শেষমুহূর্তে পড়ুয়ারা তাঁকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। গত বছর বিয়ে করেছেন সুকান্তবাবু। বিয়ের খরচের জন্য চড়া সুদে লোন নিয়েছিলেন তিনি। সেই লোনের টাকা শোধ করছিলেন মাস মাইনে থেকে। পরিবারে একমাত্র সরকারি চাকরিজীবী তিনি। তাঁর উপরেই মা-বাবা এবং দাদা বউদির সংসার অনেকটা ভরসা করে। বহরমপুরের কাশিমবাজারে ভাড়াবাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে থাকলেও মহম্মদবাজারের বাড়িতেও তিনিই ভরসা। সুপ্রিম রায়ের দুদিন পরেও এখনও দিশেহারা সুকান্তবাবু। কী করবেন আগামীতে? কী করে সংসার চলবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। আগামী মাসের বাড়ি ভাড়া কোথা থেকে দেবেন, তা নিয়েও চিন্তায় পড়েছেন তিনি। এই অবস্থায় এখন সংসার চালানোরও উপায় খুঁজছেন তিনি।
সুকান্তবাবু বলেন, আমি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক হিসেবে পড়াতাম। অনেক টিউশনিও করাতাম। সেসব ছেড়ে দিয়ে পাঁচ বছর আগে স্কুলের সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর গত বছর পিএইচডি কমপ্লিট করেছি। পোস্ট ডক্টরেট করতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তারই মধ্যে এই রায়। আমাদের পরিবারে আমি একমাত্র সরকারি চাকরি করতাম। সেটাও থাকল না। তিনি বলেন, লস্করপুর হাইস্কুলের পড়ুয়ারা আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয়। ওদের না দেখতে পেয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে। শুক্রবার পড়ুয়ারা বিদ্যালয় থেকে ভিডিও কলে আমার সঙ্গে কথা বলে। ওদের ভেজা চোখগুলি আমাকে খুবই কষ্ট দিচ্ছে। আমাকে বারবার স্কুলে ফেরার জন্য বলছে। কিন্তু, আমার চাকরিটাই তো নেই। কী করে স্কুলে যাব?
ওই স্কুলের এক ছাত্রী বলে, আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন সুকান্ত স্যার। উনি ক্লাসে এলে আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়া শুনতাম। বিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়ও সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন। স্যারকে ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করছি। ওঁর ক্লাস আমরা খুব মিস করছি।
লস্করপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গির আলম বলেন, সুকান্তবাবু ফিজিক্স অনার্স এর পর এমএসসি, বিএড করেছেন। তারপর পিএইচডি করেছেন। অসাধারণ শিক্ষক। ক্লান্তিহীনভাবে ছেলে মেয়েদের পাশে থাকেন। স্কুলের অন্যান্য কাজে সব সময় ব্যস্ত থাকতেন। এভাবে ওঁর চাকরি চলে যাওয়াটা আমরা মানতে পারছি না। -নিজস্ব চিত্র