Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

একটা সুন্দর ঘুম

বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নোবেল জয়ী পদার্থবিজ্ঞানী নিলস বোর। তাঁর পারমাণবিক গঠন সংক্রান্ত তথ্য আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি।

একটা সুন্দর ঘুম
  • ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বোমারু বিমানে তোলা হল নিলস বোরকে। অজ্ঞান হয়ে গেলেন তিনি! কী ঘটেছিল, লিখলেন মৃণাল শীল

Advertisement

বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নোবেল জয়ী পদার্থবিজ্ঞানী নিলস বোর। তাঁর পারমাণবিক গঠন সংক্রান্ত তথ্য আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি। ১৯৪৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এই বিজ্ঞানী খবর পান যে, নাৎসিরা তাঁকে গ্রেপ্তার করতে আসছে ওইদিন রাতেই। বোরের বয়স তখন প্রায় ৫৭ বছর। তাঁর দেশ ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন তখন নাৎসিদের দখলে। বোর সে সময় থাকতেন কোপেনহেগেনেই। সবচেয়ে বড়ো কথা তাঁর মা ছিলেন ইহুদি। ফলে নাৎসি বর্ণবাদী আইনের আওতায় তিনি অপরাধী। তবে তাঁকে গ্রেপ্তার করার অন্য উদ্দেশ্য ছিল হিটলারের বাহিনীর। জার্মানরা চেয়েছিল যে, বোরকে গ্রেপ্তার করে তাঁকে জোর করে পারমাণবিক বোমা বানানোর কাজে ব্যবহার করতে। উল্টোদিকে বিরুদ্ধ শক্তি অর্থাৎ মিত্রশক্তিও চাইছিল বোরকে উদ্ধার করে একই কাজে ব্যবহার করতে। তাই তারা বোরকে নাৎসিদের হাত থেকে বাঁচানোর এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা করে। এই অবস্থায় নাৎসি বিরোধী ড্যানিশ প্রতিরোধ আন্দোলনকারীদের মাধ্যমে বোরের কাছে এক বার্তা পৌঁছায়, ‘এখনই বেরিয়ে যান, আমরা আসছি উদ্ধার করতে।’ বোর প্রথমে রাজি হননি। দেশ, সহকর্মী, গবেষণা সবকিছু ছেড়ে যেতে মন চাইছিল না তাঁর। তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি তাঁকে রক্ষা করবে। নাৎসিরা তাঁর কোনও ক্ষতি করবে না। কিন্তু প্রতিরোধ কর্মীরা তাঁকে প্রমাণ দেখান যে, নাৎসিরা ডেনমার্কের ইহুদি জনগোষ্ঠীকে গণগ্রেপ্তারের পরিকল্পনা নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত বোর তাঁর দেশ ছাড়তে সম্মত হন। ১৯৪৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ভোররাতে নাৎসিরা আসার কয়েক মুহূর্ত আগে বোর তাঁর বাড়ি ছাড়েন। মিত্রশক্তির পরিকল্পনা অনুযায়ী জার্মান পাহারা এড়িয়ে তাঁকে একটা ছোটো মাছ ধরার নৌকায় জালের তলায় লুকিয়ে অন্ধকারে সমুদ্রপথে নিয়ে যাওয়া হয় সুইডেনের স্টকহোমে। মিত্রশক্তি ভেবেছিল সুইডেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একটি নিরপেক্ষ দেশ। ফলে বোর সেখানে নিরাপদে থাকবেন। কিন্তু সেখানেও অ্যাডলফ হিটলারের গুপ্তচরদের তৎপরতার কারণে সুইডেন থেকে বোরকে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু প্রশ্ন ছিল জার্মান বোমারু বিমানভরা আকাশে কীভাবে বোরকে আকাশ পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তাছাড়া সুইডেন থেকে ব্রিটেনে যাওয়ার অন্য পথটি জলপথ, সেখানে ধরা পড়ার সম্ভাবনা আরও বেশি। শেষমেশ ডি হেভিল্যান্ড মসকিউটো  নামের একটি যুদ্ধবিমানে করে বোরকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সমস্যা হল বিমানটিতে চালক ছাড়া দ্বিতীয় কোনো যাত্রীর বসার ব্যবস্থাই ছিল না। কারণ বিমানটি আসলে ছিল একটা বোমারু বিমান। শেষে সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হয় যে, বোরকে রাখা হবে ওই বিমানের বোমা বহনের খোপে। ১৯৪৩ সালের ৬ অক্টোবর এই নোবেল জয়ী বিজ্ঞানীকে মালপত্রের মতো করে তোলা হয় সেই বিমানের খোপে, সঙ্গে দেওয়া হয় একটা ফ্লাইট স্যুট আর অক্সিজেন মাস্ক সহ হেলমেট। কথা ছিল, পাইলট ইন্টারকমে বোরকে সংকেত দেওয়া মাত্রই তিনি সেই অক্সিজেন মাস্ক সহ হেলমেটটি পরে ফেলবেন। অবশেষে শুরু হয় সেই যাত্রা। পাইলট প্লেনটি ছাড়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই উঠে গেলেন প্রায় কুড়ি হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায়। কারণ এই উচ্চতায় জার্মান ফাইটার প্লেন পৌঁছতে পারে না। পাইলট ইন্টারকমে বোরকে নির্দেশ দিলেন, ‘এখনই অক্সিজেন মাস্ক পরুন।’ কিন্তু কোনো উত্তর এল না। পাইলট আবারও ডাকলেন, কিন্তু বোরের দিক থেকে কোনো সাড়া নাই। আসলে হেলমেটটা ছিল তুলনামূলকভাবে ছোটো। ফলে বিজ্ঞানী বোর ঠিকভাবে অক্সিজেন মাস্ক আর হেলমেট পরতেই পারেননি। এ কারণে পাইলটের কথা তাঁর কানেই পৌঁছয়নি। বিমান কুড়ি হাজার ফুটের ওপরে উঠতেই অক্সিজেনের অভাবে বোর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। শেষে স্কটল্যান্ড এর কাছে যখন বিমান নামে তখন সবাই ধরেই নিয়েছিল, বোর হয়তো মারা গিয়েছেন। কারণ অত উচ্চতায় শুধু অক্সিজেনই কম, তা নয় তাপমাত্রাও হিমাঙ্কের নীচে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিমানের বোমার খাপ খুলে দেখা যায় বোর অজ্ঞান কিন্তু তাঁর শ্বাস তখনও চলছে। দ্রুত তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। সকলে ভেবেছিল দীর্ঘক্ষণ অক্সিজেনের অভাব হয়তো তাঁর মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি করে দিয়েছে। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পরে তিনি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই বলে ওঠেন, ‘আমি খুব সুন্দর একটা ঘুম দিয়েছি।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ