


•মেঘলা কলকাতা। মাঝেমধ্যে রোদ্দুর উঁকি দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার উত্তাপ তেমন গায়ে লাগছে না। একটি বিশেষ ফ্যাশন শ্যুটের উদ্দেশ্যে টিম চতুষ্পর্ণী হাজির ফ্লোটেলে। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা। মনোরম পরিবেশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন উপলক্ষ্যে হবে বিশেষ শ্যুট। নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হলেন অভিনেত্রী শ্রীমা ভট্টাচার্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির জীবনে বটবৃক্ষসম। বাঙালির জীবনে, যাপনে, মননে, চিন্তনে রয়েছেন প্রাণের ঠাকুর। শুধু বাংলা নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আদৃত রবীন্দ্রনাথ। আর পৃথিবীর যে প্রান্তে বাঙালি রয়েছেন, সেখানেই রবি ঠাকুরকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার প্রয়াস। তাঁর জন্মদিন বাঙালির দৈনন্দিনের ভিড়ে আলাদা করে উৎসব পালনের পরিসর তৈরি করে দেয়। সেই উপলক্ষ্যে শ্রীমাকে বিশেষ ভাবে সাজানো হয়েছিল।
রবীন্দ্রজয়ন্তীতে পরার জন্য বেছে রাখা হয়েছিল একটি অফ হোয়াইট সুতির শাড়ি। লাল, হলুদ গঙ্গা-যমুনা পাড়ে কলকার কাজ। রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে আজও বাঙালি কন্যে এই ধরনের নরম সুতির শাড়িতেই সেজে ওঠেন। শ্রীমার লাল ব্লাউজের হাতায় ছিল ঢাকাই বুনন। হাত এবং গলার অংশ সাদা লেস দিয়ে হাইলাইট করা হয়েছে। গলায় চোকার, কানে পাশা এবং হাতে চুড় ও বালা পরানো হয়েছে শ্রীমাকে। চোখের মেকআপে টানা আইলাইনারের ব্যবহার যেন ফেলে আসা সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। সঙ্গে মানানসই লিপস্টিক আর ছোট্ট টিপ। চুলে বিনুনি করে খোঁপা বাঁধা হয়েছিল। তাতে গোলাপ ফুলের বাহার। ব্যস, ফোটোশ্যুটের জন্য এক্কেবারে তৈরি নায়িকা। এবার কোথায় তোলা হবে এই বিশেষ ছবি?
কলকাতার জিয়নকাঠি হাওড়া ব্রিজ। ছবির ফ্রেমে এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারলে কেমন হয়? ফ্লোটেলেই রয়েছে একটি ময়ূরপঙ্ক্ষী। হাওড়া ব্রিজকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে সেই নৌকোয় বসানো হল শ্রীমাকে। হাতে রইল রবি ঠাকুরের সঞ্চয়িতা। সামনে সাজিয়ে দেওয়া হল গয়নার বাক্স, হাতপাখা, ছোট্ট আয়না, জুঁই ফুলের মালা। ঠিক যেন বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা কোনো চরিত্র। ক্যামেরায় চোখ রেখে হাসলেন শ্রীমা। সূর্যও মেঘের আড়াল থেকে মুচকি হেসে উঠল। কখনো বা বই মুড়ে রেখে নদীর ওপ্রান্তে তাকিয়ে রইলেন। মন পড়ে রইল সুদূরে...।
এই হল ছবির ভিতরের ছবি। ফ্যাশন শ্যুটের নেপথ্যের গল্প। রবীন্দ্রজয়ন্তীর জন্য কীভাবে শ্রীমাকে সাজানো যায়, তা নিয়ে দীর্ঘ পরিকল্পনা চলছিল। আলোচনার সময়ই মনে পড়ে যায় জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর কথা। বাঙালি নারীদের আধুনিক করে তোলার ক্ষেত্রে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীর ভূমিকা অপরিসীম। বাঙালি মেয়েদের নতুন শাড়ি পরার ধরন তৈরি করেন তিনি।
একটা সময় ছিল যখন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের মেয়েরা গঙ্গাস্নান করতে যেতেন, তখন তাঁদের পালকিসুদ্ধ জলে চুবিয়ে আনা হতো। সেই ঠাকুরবাড়ি থেকেই জ্ঞানদানন্দিনী দেবী তৈরি করেছিলেন এক অন্য ইতিহাস। সতেন্দ্রনাথের মানসিক উদারতা, বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা জ্ঞানদানন্দিনীকেও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করেছিল। তখনকার প্রথামতো অল্প বয়সে বিয়ে। সংসার শুরু করার পর ঠাকুরবাড়ির অন্দরে আর পাঁচজন মেয়ের মতোই জ্ঞানদানন্দিনীর জীবন শুরু হয়। কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথের বিলেত যাত্রা এবং মহর্ষির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে জ্ঞানদার বোম্বাই যাত্রা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সতেন্দ্রনাথ ফরাসি দোকানে অর্ডার দিয়ে স্ত্রীর জন্য বিশেষ পোশাক তৈরি করিয়েছিলেন। একসময় সেসব পোশাক ছেড়ে তিনি নিজের মতো করে শাড়ি পরা শুরু করেন। পার্সিরা ডানদিকে আঁচল দিতেন। জ্ঞানদানন্দিনী বাঁদিকে আঁচল দিয়ে শাড়ি পরা শুরু করেন। সেই থেকেই বাঙালি নারীর শাড়ি পরার নিজস্ব ঘরানা তৈরি হল। এই পরিবর্তনের পথ জ্ঞানদানন্দিনীর জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু মেয়েদের স্বার্থে কঠিন পথে হেঁটেছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সহজ সুন্দর সম্পর্ক ছিল। তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন রবিকে। পরবর্তীতে বহু লেখায় মেজো বউঠানের প্রতি কবির শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে। তাই রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন বাঙালি নারীর আদর্শ পোশাক শাড়ি। শ্রীমাকে সে কারণে শাড়িতেই সাজানো হয়েছিল। সঙ্গে পরানো হয়েছিল সাবেকি নকশার গয়না। বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য ফ্যাশনে ধরে রাখা ছিল উদ্দেশ্য। হাওড়া ব্রিজকে সাক্ষী রেখে কলকাতার গন্ধ মেখে নস্টালজিয়ায় ফিরে যেতে পারেন আপনিও।
মে মাস। গরমের পারদ ঊর্ধ্বমুখী। যদিও এ বছর খানিক ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন বাঙালির কাছে উদ্যাপনের। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় দিনভর। আর সেখানে অংশগ্রহণ করলে বা দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকলেও এই ধরনের সুতির নরম শাড়িই আদর্শ। গরমকে পাত্তা না দেওয়ার সঠিক ফ্যাব্রিক সুতি। সাদা, অফ হোয়াইট, হালকা হলুদ, বেবি পিঙ্ক, পেস্তা সবুজ, আকাশি নীলের মতো হ্যান্ডলুমের শাড়ি এদিনের জন্য বেছে নিতে পারেন। সঙ্গে নানা ধরনের সাবেকি ব্লাউজ ট্রাই করুন। নানা ধরনের সুতোর কাজ যেমন কাঁথা বা গুজরাতি স্টিচ, প্যাচওয়ার্ক, মিক্স অ্যান্ড ম্যাচের ব্লাউজ পরতে পারেন। এই ধরনের লুকে সোনা বা রুপোর গয়না আভিজাত্য তৈরি করে। খুব বেশি গয়না পরার শখ না থাকলে বড়ো কানের দুল বা হাতের স্টেটমেন্ট আংটিতেই আপনার সাজ সম্পূর্ণ হতে পারে।
চুল বাঁধার ধরন বদলে ফেলুন। ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মেলবন্ধনে তৈরি করুন হেয়ার স্টাইল। ঠাকুরমা, দিদিমা যেমন তাঁদের যৌবনে চুল বাঁধতেন, সেই স্টাইল ফিরিয়ে নিয়ে আসুন। কলা বিনুনি, বেড়া বিনুনি, বাগান খোঁপার মতো সাবেকি ধারায় হোক চুলের সাজ। পছন্দমতো জুঁই, বেলি, গোলাপ ফুলের ব্যবহার তাকে আরও সুন্দর করে তুলবে।
সাজকথার মূল্যবান টোটকা হল স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা। পোশাক যেন ব্যক্তিত্বকে ছাপিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবেই শাড়ি বা অন্য যে কোনো পোশাকে আপনার সাজ সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে উঠবে।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য