লন্ডন। নামটা উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে প্রথম কী ভেসে ওঠে? বিগ বেন, টেমস নদী, লাল ডাবল-ডেকার বাস আর ২২১বি বেকার স্ট্রিট! আমিও ছোটোবেলায় এক সময় ওই স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড খেলাটা খেলতাম! শহরটায় পৌঁছে বুঝলাম, এর বিরাট অংশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বহু সাংস্কৃতিক জীবনযাপন আর বৈচিত্রময় খাদ্যসংস্কৃতি। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের স্বাদ যেমন এখানে খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিটি রাস্তাও যেন নিজের মতো করে একটি গল্প বলে।
এই লন্ডন সফরে ঠিক সেইসব গল্পর সন্ধান পাবেন আপনারা। একদিকে প্রবাসী বাঙালিদের সবচেয়ে বড়ো সাংস্কৃতিক উৎসব, অন্যদিকে শহরের বিখ্যাত ফুড মার্কেট, আইকনিক সব স্ট্রিট ফুড এবং এক বাঙালি উদ্যোক্তার গড়ে তোলা জনপ্রিয় রেস্তরাঁ— এসব নিয়েই এই সফর হয়ে উঠেছিল স্বাদ, সংস্কৃতি এবং স্মৃতির এক মেলবন্ধন।
প্রবাসে বাঙালিয়ানা: লন্ডন মহোৎসব
লন্ডনে পৌঁছেই আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল লন্ডন মহোৎসব। বিদেশের মাটিতে থেকেও বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে এত সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিদেশের বুকে চারপাশে এত বাংলা দেখে মনে হচ্ছিল যেন লন্ডনের মাঝেই ছোট্ট একটা আস্ত বাংলা গড়ে উঠেছে। এই উৎসবে আমাদের উপস্থিতির মূল কারণ অবশ্য বিশেষ একটি প্যানেল ডিসকাশন। যার বিষয়, কলকাতার খাদ্যসংস্কৃতির চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সেজন্যই ডাকা হয়েছিল ‘ফুডকা’-কে! কলকাতার বিরিয়ানি, বিখ্যাত মিষ্টি, ট্যাংরা-ঘরানার কলকাতা-চাইনিজ খাবার ইত্যাদি নানা বিষয়ে চলে আলোচনা। মিষ্টি ও কলকাতার চাইনিজ খাবারের প্রতিনিধিত্বও করেন খাদ্যমহলের নামজাদা ব্যক্তিত্বরা। কলকাতা ও তার খাবারদাবার নিয়ে যে আলাপ-আলোচনা হল ও তাতে যেভাবে মানুষজনের আগ্রহ ও উৎসাহ দেখলাম, আমরা নিজেরাও হয়তো আমাদের খাবার নিয়ে ততটা ওয়াকিবহাল নই। ঠিকঠাক সম্মানও দিতে পারি না। এসব দেখে মনে হচ্ছিল, হেঁশেলকে কখনো ভৌগোলিক সীমারেখায় বেঁধে রাখা যায় না।
বোরো মার্কেট: লন্ডনের পার্কস্ট্রিট
প্যানেল আলোচনা শেষ হতেই শুরু হল আমাদের খাদ্যসফর! প্রথম গন্তব্য, বোরো মার্কেট। বলতে পারেন এ যেন লন্ডনের পার্কস্ট্রিট! হাজার বছরের ইতিহাস বহন করা এই বাজার শুধু লন্ডনের নয়, গোটা ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় ফুড মার্কেট। বিভিন্ন প্রদেশের খাবারদাবার, সব উপকরণ একেবারে তাজা। এত তাজা যে এমন জিনিসপত্র আমরাও সচরাচর পাই না। মার্কেটে ঢুকতেই দেখলাম চারপাশে গ্রিলড মিট, সদ্য বেক করা ব্রেড, চিজ, সি-ফুড কত কিছু! এ তো আমাদের মতো পেটুকদের জন্য স্বর্গ! প্রথমেই খেলাম অথেন্টিক পায়েলা। এটি স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এক চালের পদ। ফ্রেশ সি-ফুড, রাইস আর স্প্যানিশ মশলা সব মিলিয়ে মিশিয়ে এক দুর্দান্ত মিল। সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর। বোরো মার্কেটের অন্যতম আকর্ষণ এই পদটি। এরপর যা খেলাম, সেটা খেতে খেতে মনে পড়ছিল আমাদের পুরুলিয়ায় হাঁসের ঝুরো মাংসের কথা। দুটো ফ্রেশ বার্গার ব্রেডের মধ্যে ঠেসে ভরা হাঁসের ঝুরো। এখানে খাবারটির নাম জুসি ডাক স্যান্ডউইচ। দেখতে যেমন সুন্দর আকারেও তেমন। গোদা মাপের জিনিস, একটা খেলেই পেট ভরে যাবে। এই বাজারে রয়েছে বহু বছরের পুরনো চিজের দোকান, হাতে তৈরি চকোলেট, আর্টিজান ব্রেড এবং নানা ধরনের ডেজার্টের স্টল। চকোলেট স্ট্রবেরিও খেলাম। দেখি, লোকজন হুলিয়ে কিনছে। কিন্তু খেয়ে ঠিক পোষাল না। তারপর খানির পানীয় চেখে দেখলাম।
স্থানীয়দের চোখে লন্ডন
যে কোনো শহরকে ঠিকমতো চিনতে হলে সেখানকার স্থানীয় মানুষজনের মতামত নেওয়াটাও জরুরি। জানতে ইচ্ছে করে, তাঁদের কাছে শহরটার সবথেকে পছন্দসই জিনিস কোনটি? আমাদের সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গী ছিলেন আরও এক ফুড ক্রিয়েটর। তাঁর সঙ্গে ঘুরে দেখলাম লন্ডনের কিছু পরিচিত এবং কিছু কম-পরিচিত ফুড স্পট। তিনি আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন সেন্ট জন মেরিলেবোনে। সেখানে ক্লাসিক ব্রিটিশ খাবার আর ছিমছাম অনবদ্য পরিবেশের এক অমোঘ মেলবন্ধন দেখলাম। এরপর পৌঁছে গেলাম জিঞ্জার পিগ-এ। এখানকার বিখ্যাত সসেজ রোল লন্ডনের অন্যতম জনপ্রিয় স্ন্যাক্স। মাখনের স্বাদে ভরা মচমচে পাফ প্যাটি, ভিতরে রসালো মাংসের পুর। প্রথম কামড়েই বোঝা যায়, কেন এটি এত জনপ্রিয়! বিশ্বাস করুন, সসেজে ঠাসা এরকম রোল একটা খেলেই মোটামুটি লাঞ্চ ডান। হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেলাম, রাস্তার দুই পাশে ঐতিহাসিক স্থাপত্য, ছোটো ছোটো কাফে, দেয়াল জুড়ে গ্রাফিতি। ব্যস্ত শহুরে জীবনের মধ্যেও লন্ডনের নিজস্ব ছন্দ যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
লন্ডনের বুকে কলকাতার স্বাদ
দিনের শেষ গন্তব্য ছিল লন্ডনের অন্যতম জনপ্রিয় ভারতীয় রেস্তরাঁ বিকেসি। একজন বাঙালি উদ্যোক্তার হাতে গড়া এই রেস্তরাঁ আজ লন্ডনে ভারতীয়, বিশেষ করে বাঙালি খাবারের অন্যতম পরিচিত ঠিকানা। বাঙালি মোটেই কাঁকড়ার জাত নয়, একজন বাঙালি হয়ে আর এক বাঙালির উদ্যোগে শামিল হব না, সেটা তো হতে পারে না!
পৌঁছে গিয়েছিলাম বিকেসি-তে! আর পৌঁছেই চক্ষু চড়কগাছ! যেমন সুন্দর সাজানো তেমনই তার খাবারদাবার। রেস্তরাঁর আধুনিক সাজসজ্জার মধ্যেও ভারতীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়াচ স্পষ্ট। আর খাবারের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে এখানকার কলকাতা-স্টাইল বিরিয়ানির কথা। দারুণ সেদ্ধ চাল, নরম মাংস, ঠিকঠাক সাইজের একটা আলু আর মোটামুটি যেটুকু মশলা লাগে, সেটুকু। ব্যস। প্রথম চামচ মুখে দিয়েই বুঝলাম জায়গাটায় এত ভিড় হয় কেন! বাংলার স্বাদ এভাবে যদি কেউ বিলেতের মাটিতে এনে ফেলে, সেটা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তার উপর অসাধারণ জুসি কাবাব! হালকা চারকোল ফ্লেভার, ভিতরে নরম রসালো মাংস। সব শেষে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দিল।
শেষ পাতে
এই সফর আমাদের ফের শেখাল খাবার শুধু পেট ভরানোর মাধ্যম নয়, এটা মানুষ, সংস্কৃতি এবং স্মৃতিকে একসঙ্গে বেঁধে রাখার সবচেয়ে সহজ ভাষা। লন্ডনে প্রবাসী বাঙালিদের উচ্ছ্বাস, বোরো মার্কেটের বহুজাতিক স্বাদ, স্থানীয়দের সঙ্গে শহরকে নতুনভাবে আবিষ্কার কিংবা বিকেসি-র এক প্লেট কলকাতার বিরিয়ানি—সবই এই সফরে যোগ করেছে আলাদা মাত্রা। এ যেন সংস্কৃতি ও খাবারের মাধ্যমে পৃথিবীকে নতুন করে জানার এক স্মরণীয় ভ্রমণ, যা অনশ্বর হয়ে থেকে যাবে হৃদয়ে।