দর্শকাসনে বসে দেশ-বিদেশের হাজারখানেক বিশিষ্ট ব্যক্তি। তিনি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বলে চলেছেন, ভারতে এখন আর খাবারের অভাব নেই। খাবার এখানে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। এবার বিশ্বকে খাবার রপ্তানি করবে ভারত। গত বছরের আগস্ট মাসে প্রবল করতালির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য শেষ করার পরই জানিয়ে দেওয়া হল, চাল-গম সহ কোন কোন খাদ্যপণ্য উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত, কোথায় আমরা প্রথম। কিন্তু সেই বৈঠকে বা পরে কোনও সময়ে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার সুযোগ মেলেনি যে, ভারত খাদ্যে ‘সারপ্লাস’ দেশ হলে কেন বছর বছর ক্ষুধা সূচকে পিছনের সারিতে থাকে? কেন অপুষ্টিতে শেষ হয়ে যাচ্ছে সদ্যজাতকের জীবন? দেশের কতজন মানুষ দু’বেলা পেটভরে খেতে পান, সেই প্রশ্নও করা যায়নি প্রধানমন্ত্রীকে। ফলে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার মতো খাদ্যে স্বনির্ভরতা নিয়েও প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে একতরফা অসত্য বা অর্ধসত্য প্রচার করেছেন, যা তাঁর সরকারের দেওয়া বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গেই মেলে না! যেমন, বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের তালিকা অনুযায়ী, এই ২০২৫-এ বিশ্বের ১২৭টি দেশের তালিকায় ভারতের স্থান হয়েছে ১০২-তে। খাদ্যাভাবে ভারত রয়েছে ‘গুরুতর’ বিভাগে। শুধু এবছর নয়, গত চার-পাঁচ বছর ধরেই ক্ষুধার দুনিয়ায় ক্রমাবনতি হয়েছে ভারতের। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাও নাকি ভারতকে পিছনে ফেলে দিয়েছে।
দেশের মানুষকে খাদ্যে সুরক্ষা দিতে ভারতে ‘জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন’ রয়েছে। চালু রয়েছে মিড ডে মিলের মতো প্রকল্প। দেশের ৮০ কোটি মানুষকে রেশনের মাধ্যমে বিনামূল্যে চাল-গম দেওয়া হয়। তারপরেও একটা বড়ো সংখ্যক মানুষের অপুষ্টিতে ভোগার মূল কারণ নিয়ে মোদি সরকারের কোনও মাথাব্যথা নেই! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষুধা সূচকে ভারতের পিছিয়ে থাকার কারণ এদেশে মোট জনসংখ্যার ১৩.৭ শতাংশ অপুষ্টির শিকার। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার ৩৫.৫ শতাংশ। ভারতে ২.১ শতাংশ শিশু জন্মের পাঁচ বছরের মধ্যে মারা যায়, ২৭.৪ শতাংশ শিশু জন্মায় কম ওজন নিয়ে। এদেশে ১৫-৪৯ বছরের মধ্যে মহিলাদের ৫৩ শতাংশ রক্তাল্পতায় ভোগে। শিশুদের মধ্যে উচ্চতার সাপেক্ষে কম ওজন বা বয়সের তুলনায় কম উচ্চতার হার যথাক্রমে ১৮.৭ শতাংশ এবং ৩৫.৫ শতাংশ। আসলে এই ক্ষতগুলি বছরের পর বছর থেকে গেলেও তার প্রকৃত উপশমের কোনও চেষ্টা হয়নি। যেমন, খাদ্য নিরাপত্তা আইনে রেশনের মাধ্যমে চাল-গম দেওয়া হলেও বহু যোগ্য পরিবার এই প্রকল্পের আওতার বাইরে রয়ে গিয়েছে। আবার খাদ্যে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের অভাবে অপুষ্টি দূর হচ্ছে না। মিড-ডে মিলের ক্ষেত্রে সামান্য বরাদ্দ, সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক স্তরে নানা দুর্নীতি অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দিচ্ছে। আসলে শুধুমাত্র খাদ্যপণ্যের উৎপাদন বাড়ালে প্রধানমন্ত্রীর মতোই শাসকগোষ্ঠীর তরফে স্বনির্ভরতার ঢাক পেটাতে সুবিধা হয় ঠিকই, কিন্তু দেশের সব মানুষকে দু’বেলা পেটভরে পুষ্টিকর খাবার দিতে গেলে খাদ্যের সহজলভ্যতা, গুণমান ও স্থায়িত্বের দিকে নজর দিতে হয়। পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যের সুষ্ঠু ও সুষম বিতরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এদিকে কোনও নজর না দেওয়ায় খাদ্য উৎপাদন ও ক্ষুধার মধ্যে বিস্তর যোজন দূরত্ব তৈরি হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, উৎপাদিত পণ্যের ৪০ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে, যা সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না। খাদ্যের অসম বণ্টন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর অসাম্য ভারতের সমস্যা বৃদ্ধি করছে। আসলে মোদি জমানায় প্রায় সর্বক্ষেত্রেই বৈষম্য বেড়েছে।
এসবের নিট ফল হল, ক্ষুধা সূচকে ভারতের স্কোর। চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে এই সূচক। এক) জনসংখ্যার কত অংশ পর্যাপ্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার পান না, দুই) পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুহার। তিন) শিশুদের উচ্চতা বয়সের তুলনায় কতটা কম এবং চার) শিশুদের ওজন উচ্চতার তুলনায় কতটা কম। মোদির খাদ্যে স্বনির্ভর ভারত এই চারটি মানদণ্ডের বিচারে স্কোর করেছে মাত্র ২৫.৮, যা ‘গুরুতর’ বা ‘সিরিয়াস’ শ্রেণিভুক্ত দেশের তকমা পেয়েছে। চলতি বছরের তালিকা অনুযায়ী, গোটা বিশ্বে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন খাদ্যাভাবে দিন কাটাচ্ছেন। কমপক্ষে ৬৭ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক দেশে এই খাদ্য সংকটের কারণ অবশ্য টানা যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অচলাবস্থা, প্রবল প্রাকৃতিক বিপর্যয় ইত্যাদি। যেমন, সোমালিয়া, কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান, হাইতির মতো দেশ আছে যেখানে খাদ্য সংকট রয়েছে। কিন্তু খাদ্য উৎপাদনে প্রথম সারির দেশ হয়েও এবং বিপুল খাদ্যভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও ভারত কেন ক্ষুধা, অপুষ্টিতে পিছিয়ে থাকা দেশগুলির সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে, তার জবাব তো দিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। দেশের মানুষ প্রকৃত সত্যটা জানতে চায়।