নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: নার্সিংহোমে প্রসবের পরই দু’লক্ষ টাকার বিনিময়ে সদ্যোজাত ছেলেকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। মাকে জানানো হয়েছিল, মৃত সন্তান প্রসব করেছেন। দেহ দেখতে চাওয়ায় তা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার গল্প শুনিয়েছিল এগরার নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ। ২০২৩সালে ২৪আগস্টের সেই ঘটনার দু’বছর পর সোমবার সেই শিশুকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হল। জন্মের পর এই প্রথম মা ও শিশু পরস্পরকে চাক্ষুষ করল। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা আইনি সহায়তা কর্তৃপক্ষের(ডিএলএসএ) উদ্যোগে কাঁথির হোমে থাকা ওই শিশুকে এদিন তমলুকের নিমতৌড়িতে আনা হয়। চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি কর্তৃপক্ষ ওই শিশুকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়। জন্ম দেওয়ার দু’বছর বাদে শিশুকে প্রথমবার কাছে পেয়ে মায়ের চোখ ভরল জলে। সোমবার এমনই এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী রইল তমলুকের নিমতৌড়ির সিডব্লুসি অফিস চত্বর।
২০২৩ সালে ২৪ আগস্ট পটাশপুর থানার আড়গোয়াল গ্রামের প্রতিমা পাল প্রসববেদনা নিয়ে এগরা শহরের একটি নার্সিংহোমে ভর্তি হন। ওইদিন তিনি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। এটি তাঁর তৃতীয় সন্তান। এর আগে এক ছেলে এবং এক মেয়ে আছে। সন্তান প্রসবের পরই নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ প্রতিমাকে জানিয়েছিল, তিনি মৃত সন্তান প্রসব করেছেন। তার দেহ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে। মা কাঁদতে কাঁদতে নার্সিংহোম থেকে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন।
ওই ঘটনার চারদিন পর ২৮ আগস্ট ওই সদ্যোজাতকে নিয়ে রামনগর থানার দুর্গাপুর গ্রামের এক মহিলা দীঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে ভ্যাকসিন দিতে যায়। ওই মহিলার কাছে সদ্যোজাতর কোনও নথিপত্র না থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। তারা থানায় খবর দেয়। পুলিশ ওই সদ্যোজাতকে উদ্ধার করে। ওই মহিলা এবং এক দালালকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পারে, দু’লক্ষ টাকার বিনিময়ে ওই সদ্যোজাতকে বিক্রি করে দিয়েছিল নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ। রামনগরের দুর্গাপুর গ্রামের ওই মহিলা শিশুটিকে কিনেছিল। নার্সিংহোম এবং ক্রেতার মাঝখানে একজন মধ্যস্থতা করেছিল। পুলিশ নার্সিংহোম মালিক এবং তার স্ত্রীকেও গ্রেফতার করে। চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিটও জমা পড়ে।
দীঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতাল থেকে চারদিনের ওই শিশুকে কাঁথির একটি হোমে রাখা হয়। মা সেই সন্তানকে ফিরে পেতে থানা, সিডব্লুসি অফিস দৌড়ঝাঁপ করলেও পাননি। তাঁকে জানানো হয়, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি শিশুটিকে পাবেন না। গত ৩নভেম্বর প্রতিমা আড়গোয়াল থেকে তমলুকে জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের অফিসে আসেন। ডিএলএসএ-র সেক্রেটারি সুদীপা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘটনাটি জানান। বিচারক এনিয়ে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শিশুকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে কোনও সমস্যা নেই বলেও সুদীপাদেবী জানান। এনিয়ে যাবতীয় নথি জোগাড়ের পর সোমবার বিকেলে শিশুকে মায়ের কোলে তুলে দেওয়া হয়।
প্রতিমাদেবী বলেন, সন্তান জন্ম দেওয়ার পর মুখ দেখতে দেওয়া হয়নি। আমি মৃত সন্তান জন্ম দিয়েছি বলে জানানো হয়েছিল। চারদিন বাদে দীঘা হাসপাতাল থেকে শিশু উদ্ধারের পরই আমি জানতে পারি, আমার বাচ্চা বেঁচে আছে। সেদিন থেকেই শিশুকে কাছে পেতে লড়াই শুরু করি। এতদিন বাদে ডিএলএসএ-র উদ্যোগে সন্তান ফিরে পেলাম। বিক্রি হওয়া শিশুকে দুই বছর পর কাছে পেলেন মা।-নিজস্ব চিত্র