নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: সারদা, রোজভ্যালি থেকেও শিক্ষা হয়নি। মাসে আট শতাংশ সুদের টোপে লক্ষ লক্ষ টাকা রেখে পূর্ব মেদিনীপুরের ৯০০জন প্রায় ৫০কোটি টাকা প্রতারণার শিকার হলেন। কলকাতার হাজরা মোড়ে ওই চিটফান্ড সংস্থার অফিস। মেচেদা, তমলুক, চণ্ডীপুর, নন্দীগ্রাম ও কাঁথিতে এজেন্টদের মাধ্যমে বিপুল টাকা তুলে ওই সংস্থায় বিনিয়োগ করা হয়। গত ৭জুলাই ওই সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং অ্যাকাউন্ট্যান্ট গ্রেপ্তার হয়েছেন। এরপরই এজেন্টরা আমানতকারীদের নিশানায় পড়েছেন। নন্দীগ্রাম থানায় একজন এজেন্টের বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে। ওই থানার মানিকপুর সমবায় সমিতির প্রাক্তন ম্যানেজার ওই চিটফান্ড সংস্থার এজেন্ট ছিলেন। নিজের জমি বিক্রি করে আমানতকারীদের টাকা ফেরানো শুরু করেছেন। ঘটনায় জেলাজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছে।
নন্দীগ্রামের আসদতলায় একটি ব্যাঙ্কের সিএসপি কেন্দ্র চালান সোমক বল। তাঁর বাড়ি ওই থানার গদাইবলবাড় গ্রামে। হাজরামোড়ের ওই চিটফান্ড সংস্থায় টাকা রাখার জন্য তিনি এজেন্ট হিসেবে অনেকের থেকে বিপুল টাকা তুলে জমা করেছেন। ২৫জুলাই ওই এজেন্টের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রাম থানায় এফআইআর করেছেন মহম্মদপুরের পুষ্পেন মাইতি। ৬৩বছর বয়সি পুষ্পেনবাবুর অভিযোগ, মাসে আট শতাংশ সুদের টোপ দেওয়ায় তিনি দু’টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে ১২লক্ষ টাকা তুলে সোমককে দিয়েছেন। ছ’লক্ষ টাকা ফেরত পেলেও বাকি টাকা পাচ্ছেন না। সংস্থার দুই কর্ণধার গ্রেপ্তার হওয়ার পর টাকা পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তাই এজেন্টের বিরুদ্ধে থানায় এফআইআর করেছি।
নন্দীগ্রাম থানার মানিকপুরের গ্রামের বাসিন্দা মহাদেব বেরা নিজের গ্রামের সমবায় সমিতির অবসরপ্রাপ্ত ম্যানেজার। তিনি বিভিন্নজনের কাছ থেকে কমিশনের ভিত্তিতে ১৫লক্ষ টাকা তুলে ওই সংস্থার রেখে এখন বিপাকে পড়েছেন। প্রতারিত আমানতকারীরা সকাল-বিকেল তাঁর বাড়িতে চড়াও হওয়ার পর মহাদেববাবু জমি বিক্রি করে তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ওই সংস্থা মাসে আট শতাংশ সুদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আমি কমিশনের ভিত্তিতে টাকা তুলে ওই সংস্থায় জমা করতাম। আচমকা সংস্থা থেকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত ৭জুলাই ওই সংস্থার দু’জন কর্তা গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জেনেছি। টাকা ফেরতে দাবিতে আমরা ফোরাম গড়েছি। সেই ফোরাম এনিয়ে আন্দোলন করছে।
চণ্ডীপুর থানার হাঁসচড়ার গুরুপদ জানা, চণ্ডীপুরের নাসিমুল হক, কাঁথির মলয় মাইতি, তমলুকের আশিস মাইতি ওই সংস্থার এজেন্ট। তাঁদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা সংস্থার অফিসে জমা পড়েছে। এখন সংস্থার কর্তারা আমানতকারীদের টাকা দেওয়া বন্ধ করতেই এজেন্টরা বেকায়দায় পড়েছেন। কেউ কেউ ঘরছাড়া রয়েছেন। ঘটনায় বিপাকে পড়েছেন প্রায় ৯০০আমানতকারী। তাঁরা প্রায় ৫০কোটি টাকা রেখে সর্বস্বান্ত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
নন্দীগ্রামের ব্যাঙ্কমিত্র তথা ওই সংস্থার এজেন্ট সোমক বল বলেন, আমি নিজে ২১লক্ষ টাকা রেখে নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। এছাড়াও নিজের আত্মীয়স্বজন ও পরিজনদের কাছ থেকে আরও অনেক টাকা রেখেছি। কোম্পানি টাকা ফেরানো বন্ধ করে দেওয়ায় আমার মতো অনেকেই সমস্যায় পড়েছেন। পুষ্পেনবাবু আমার বিরুদ্ধে এফআইআর করেছেন বলে জেনেছি। আমানতকারীদের জন্য ফোরাম গড়ে লড়াই করছি।
হাঁসচড়ার গুরুপদবাবু বলেন, কোম্পানি এভাবে প্রতারণা করবে ভাবতে পারিনি। আমরা বিপুল টাকা জমা রেখে এখন বেকায়দায় পড়েছি। গত ৬জুন ফোরামের সঙ্গে কোম্পানির কর্তাদের শেষবার মিটিং হয়। তারপর ৭জুলাই অ্যাকাউন্টে হিসেব বহির্ভূত লেনদেনের ঘটনায় কোম্পানির দুই কর্তা গ্রেপ্তার হয়েছেন। এখন সমস্যা আরও বাড়ল।