বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: পিএফ গ্রাহকরা চাইলে তাঁর জমানো তহবিল থেকে টাকা তুলতে পারেন। ওই টাকা আর ফেরতযোগ্য নয়। কেন্দ্রীয় সরকার দেশের সাত কোটির বেশি পিএফ গ্রাহককে এই সুবিধা দিলেও সবাই সেই সুযোগ পাচ্ছেন না। সূত্রের খবর, এরাজ্যে গত অর্থবর্ষে যাঁরা পিএফ থেকে টাকা তোলার জন্য আবেদন করেছিলেন, তাঁদের একটা বড় অংশই সেই টাকা তুলতে পারেননি। অর্থাৎ তাঁদের ক্লেম বাতিল হয়েছে। টাকা তোলার নিয়মের গেরোতেই আটকে যাচ্ছে পরিষেবা, দাবি করছে দপ্তরই।
এরাজ্যে পিএফ তোলার জন্য আবেদন করেও কতজন টাকা তুলতে পারেননি? সূত্রের খবর, ক্লেমের জন্য গত অর্থবর্ষে এরাজ্য থেকে আবেদন করেছিলেন প্রায় সাড়ে ৩১ লক্ষ গ্রাহক। তাঁদের মধ্যে ক্লেম পাননি সাত লক্ষের বেশি জন। দপ্তরের হিসেব, ২২.৩৯ শতাংশ আবেদনকারীর ক্লেমের টাকা দেয়নি এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন (ইপিএফও)। তবে গতবছরই শুধু নয়, প্রাপ্য টাকা না-দেওয়ার সংস্কৃতি দপ্তরে চলছেই। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ক্লেম পাননি ৫ লক্ষ ৩০ হাজার আবেদনকারী। তার আগের অর্থবর্ষে সেই সংখ্যা ছিল আরও বেশি, ৫ লক্ষ ৩৬ হাজার। তার আগের বছর ক্লেম পাননি ৪ লক্ষ ৭১ হাজার আবেদনকারী।
কেন মিলছে না ক্লেমের টাকা? দপ্তরের কর্তারা বলছেন, একাধিক কারণ দেখিয়ে আটকানো হচ্ছে আবেদন। সেই তালিকায় সবার আগে আছে সরকারি নিয়মের গেরো। কত বছর চাকরি করলে বা পিএফে টাকা জমালে ক্লেমের টাকা পাওয়া যায়, তা নির্দিষ্ট করা থাকলেও জানেন না বেশিরভাগ গ্রাহক। কেন টাকা তুলবেন, ক্লেমের আবেদনে তা জানাতে হয় গ্রাহককে। প্রসঙ্গত, পড়াশুনো, চিকিৎসা খরচ, বিয়ে, বাড়ি তৈরি, বাড়ি সারাই প্রভৃতি নানা কারণে টাকা তোলা যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই টাকার অঙ্ক এবং পিএফের টাকা জমানোর মেয়াদ সংক্রান্ত শর্ত আলাদা আলাদা। এই শর্তের গেরোতেই আটকে যাচ্ছে আবেদন, দাবি করেছেন দপ্তরের কর্তাদের একাংশ। আবার অনেক ক্ষেত্রেই ভুলভাবে আবেদনের যুক্তি দেখিয়ে বাতিল করা হচ্ছে ক্লেম। বেশকিছু ক্ষেত্রে আবার দপ্তর নিজেদের ঘাড়েই দায় নিচ্ছে ক্লেম না দেওয়ার জন্য। তারা জানাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই তহবিলের সর্বশেষ বা ‘আপডেটেড’ তথ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ‘আপলোড’ করা হচ্ছে না দপ্তরের নিজস্ব সিস্টেম-এ। তার ফল ভুগতে হচ্ছে গ্রাহককে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তহবিলে টাকা নেই, এই যুক্তিতেও বাতিল হয়েছে আবেদন। গ্রাহকদের একাংশ বলছেন, বড় অঙ্কের ক্লেম হলে অনেক সময়ই উৎকোচ দাবি করেন দপ্তরের কর্মীদের একাংশ। নানা অজুহাতে টাকা আটকে রাখেন তাঁরা।
অনলাইনে আবেদনের পর, কোনও বিভাগীয় কর্মী বা অফিসারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই যাতে ক্লেমের আবেদন মেলে, সেই সুবিধা বছরকয়েক আগে চালু করে ইপিএফও। আগে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্লেমের ক্ষেত্রে ওই পরিষেবা মিলত। পরবর্তীকালে অটো ক্লেমের অঙ্ক বাড়িয়ে এক লক্ষ টাকা করা হয়। অতিসম্প্রতি কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী মনসুখ মান্ডব্য জানান, অটো ক্লেমের সীমা পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, অনলাইনে আবেদনের এই ‘সুবিধা’ গ্রহণ আদৌ কি সবার পক্ষে নেওয়া সম্ভব হবে? কারণ, নিয়মের গেরো যে রাতারাতি উবে যাবে না। বরং শর্তগুলি গ্রাহকের অজানা থাকলে, তাঁদের আবেদন বাতিল হবে। সেক্ষেত্রে তাঁদের ভোগান্তি বাড়বে বই কমবে না, এমনই দাবি করেছেন অনেকে।