বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: একটার পর একটা ঘটনা বলতে গিয়ে শিউরে উঠছিলেন চিকিৎসকরাই। কখনও সংকীর্ণ রাস্তায় কাটাতে গিয়ে দু’টি গাড়ির মাঝখানে পড়ে গিয়ে গুরুতর জখম। কখনও গতি সামলাতে না পেরে ডাম্পারে গিয়ে ধাক্কা। কখনও আবার স্কিড করে বড় গাড়ির চাকার তলায় চলে যাওয়া। মাথা, স্পাইনাল কর্ড এবং ব্রেকিয়াল প্লেক্সাস (ঘাড়ের কাছে অতি সংবেদনশীল অংশ, গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুগুচ্ছ বেরয় এখান থেকে)—শরীরের এই তিন জায়গাই সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। বলা বাহুল্য, উপরের সবক’টি ভয়াবহ বর্ণনাই বাইক দুর্ঘটনার। পিজি হাসপাতালে রাজ্যের সবচেয়ে বড় ট্রমা সেন্টারের তথ্য জানাচ্ছে, রাজ্যে যত পথ দুর্ঘটনা হচ্ছে, তার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই বাইক আরোহীদের সঙ্গে!
নামপ্রকাশের অনিচ্ছুক এক বাইকপ্রেমী যুবক বলছিলেন, ‘শহরে এখন যেসব রেসিং বাইকে নিয়ে টিনএজার বা সদ্য প্রাপ্তবয়স্করা ছুটছেন, সেগুলির ক্ষমতা ৬০০ সিসি থেকে ১৪০০ সিসি পর্যন্ত। সাড়ে ৪-৫ পাঁচ লক্ষ থেকে ৭০-৮০ লক্ষের বাইক ছুটছে। ১০০ কিমি গতি তুলতে ৩-৬ সেকেন্ড লাগছে!’ পিজি হাসপাতালের এক আধিকারিক জানালেন, আরটিএ বা রোড ট্র্যাফিক অ্যাক্সিডেন্টের শিকার বাইক আরোহীদের বেশিরভাগের বয়স মোটামুটি ১৭-২১ বছরের মধ্যে। কোন সময়ে বেশি দুর্ঘটনা হচ্ছে? তাঁর উত্তর ছিল, ‘বহু দুর্ঘটনাগ্রস্তই রেফার হতে হতে আসছেন। ফলে ঘটনার সঠিক সময় পাওয়া কঠিন। তবে শহর এবং আশপাশের অ্যাক্সিডেন্টের কেসে ভোর এবং সন্ধ্যার ঘটনা বেশি পাচ্ছি।’
জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় জখম প্রায় ১০ হাজার মানুষের চিকিৎসা হয়েছে ট্রমা সেন্টারে। এর মধ্যে ৩,৮৩৫ জনই পথ দুর্ঘটনার শিকার। অন্যান্য দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬,২১১ জনের ক্ষেত্রে। মারপিটে চোট আঘাত নিয়ে এসেছিলেন ৬৫৮ জন। রেললাইনে পড়ে বা অন্য কোনওভাবে চোখে আঘাত পেয়ে আসেন ১৯ জন। দুর্ঘটনায় জখম হয়ে ট্রমা সেন্টারে ভর্তি ছিলেন ১,৩৪১ জন। তার মধ্যে শুধুমাত্র পথ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন ৪৬৫ জন। তাঁদের মধ্যে ২৭১ জনই বাইক বা স্কুটার আরোহী। তারপরই পথ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন চারচাকার প্রাইভেট কারের সওয়ারিরা।
শহরের একটি নামকরা প্রাইভেট হাসপাতালের বিশিষ্ট নিউরোসার্জন ডাঃ অমিতাভ চন্দ বলেন, ‘মাথা, মেরুদণ্ড তো বটেই, তবে আমার মতে, বাইক আরোহীদের অন্যতম মারাত্মক আঘাত হল ব্রেকিয়াল প্লেক্সাসে চোট। ঘাড়ের দু’দিকে থাকা এই অংশ থেকে দু’টি হাতের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুগুচ্ছ বের হয়। যেদিকে চোট লাগবে, সেই হাতই আসাড় হয়ে যায়। জীবিত অথচ জড়পদার্থ হয়ে থাকতে হবে। তাই বাইক আরোহীদের বলব, জীবন স্বপ্নের মতো। কত কী করার আছে! সেখানে এত দ্রুত দাঁড়ি টেনে দেবেন!’