সংবাদদাতা, ডোমকল: ১৯৪৭-এর ১৮আগস্ট। ওই দিন জানা গিয়েছে, মুর্শিদাবাদ পূর্ব পাকিস্তানে নয়, ভারতেই থাকছে। নবাবি মুলুক তখন সেজেছে স্বাধীনতার সাজে। কিন্তু জেলার ছয়টি গ্রামে তখনও হতাশার অন্ধকার। রানিনগরের চর বাথানপাড়া, খেদুরপাড়া, তারানগর, চর সরন্দাজপুর, চর মাঝারদিয়াড় ও চর বাঁশগাড়া—পদ্মার ধারের এই সমস্ত গ্রামকে মানচিত্রের ভুলে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তানে। অবশেষে ১২বছরের প্রতীক্ষা শেষে ১৯৫৯সালের ১৫ জানুয়ারি মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলেন এসমস্ত গ্রামের বাসিন্দারা। নেহেরু-নুন চুক্তি অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতের মানচিত্রে ফের তৎকালীন ওই সমস্ত গ্রামের জায়গায় হয়েছিল। তাই এখনও ১৫জানুয়ারি দিনটি বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে পালন করেন এলাকার লোকজন।
পরাধীন ভারতবর্ষে পদ্মার তীর ঘেঁষে বাঁশগাড়া, চর সরন্দাজপুর, তারানগর, চর মাঝারদিয়াড়, খেদুরপাড়া ও চর বাথানপাড়া গ্রাম গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে এই বড় এলাকা ভেঙে রানিনগর ১ ও ২ ব্লকের ১৪টি পৃথক গ্রামে বিভক্ত হয়েছে।
সেসময়ে গ্রামগুলির দু’পাশেই পদ্মা নদী বয়ে যেত। ভারতীয় অংশের দিকে পদ্মার একটি শাখানদী ও পূর্ব পাকিস্তানের দিকে মূল পদ্মা ছিল। গ্রামের প্রবীণরা জানান, মূল পদ্মার বদলে শাখা পদ্মাকেই সীমান্ত ধরা হয়েছিল। ফলে নদীর এপারে থেকেও এখানকার বাসিন্দারা ভিনদেশি হয়ে গিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল এক পরিকল্পিত রাজনৈতিক মানচিত্র বিভ্রাট।
১৮ আগস্ট যখন মুর্শিদাবাদকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, তখন ওই শাখানদীকেই সীমান্ত ধরা হয়। সেকারণে স্বাধীন ভারতের মানচিত্রে শাখা পদ্মার ওপারের গ্রামগুলি প্রথমে ঠাঁই পায়নি। চর বাথানপাড়ায় গড়ে উঠেছিল পাকিস্তান আর্মির ক্যাম্প। তেরঙার স্বপ্ন দেখা এলাকার মানুষ এক অচেনা শাসনের শিকলে বন্দি হয়েছিলেন। কিন্তু হাল না ছেড়ে এর প্রতিবাদে সামিল হন তাঁরা।
অবশেষে ১৯৫৮সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুনের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৫৯সালের ১৫জানুয়ারি, দুপুর ১২টা ১৫মিনিটে চর বাথানপাড়ায় পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ভারতের তেরঙা পতাকা তোলা হয়। চারপাশে তখন ঢাকঢোলের বাজনা।
চর দুর্গাপুর হাইস্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক অনুকূলচন্দ্র সরকার বলেন, ১৯৪৭সালে দেশ স্বাধীন হলেও আমাদের এসমস্ত গ্রামে স্বাধীনতা এসেছিল ১২বছর পর। ১৫জানুয়ারি তাই আমাদের কাছে একটা তারিখ নয়, আমাদের অস্তিত্বের ইতিহাস। প্রতিবছর ১৫জানুয়ারি এখানে ভারত সংযুক্তিকরণ দিবস উদযাপিত হয়।