শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: আজ থেকে ছুটি, আর পাঠশালা নাই...! এমনই আশঙ্কা ক্রমেই গ্রাস করছে পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে। তিন জেলারই উচ্চ মাধ্যমিক পাশ পড়ুয়াদের একটা বড় অংশের উচ্চশিক্ষায় কোনও আগ্রহই নেই। ফলে, আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়েও কলেজগুলিতে অর্ধেকেরও বেশি আসন ফাঁকাই পড়ে রইল! উধাও হতে বসেছে কলেজ-ক্যাম্পাসের সেই চেনা কোলাহল। উচ্চশিক্ষার এমন হাল দেখে উৎকণ্ঠায় অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে শিক্ষা অনুরাগীরা। সবারই অশনি সঙ্কেত একটাই—‘ভবিষ্যতে কলেজগুলির অস্তিত্ব থাকবে তো?’
গত ১৮ জুন থেকে ভর্তির অনলাইন পোর্টাল চালু হয়। ৭ জুলাই ছিল আবেদনের শেষ দিন। পরে রাজ্য সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ১৫ জুলাই পর্যন্ত করে। মঙ্গলবার পার হল সময়সীমা। টানা ২৮ দিন ধরে চলা এই ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তিন জেলার উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ পড়ুয়াদের একটা বিরাট অংশ। তথ্য বলছে, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৬টি ডিগ্রি কলেজ মিলিয়ে মোট আসন সংখ্যা ৭৪ হাজার ৩৮১টি। আবেদন করেছেন মাত্র ২৬ হাজার ৩৮৪ ছাত্রছাত্রী। প্রত্যেক আবেদনকারী কলেজে ভর্তি হলেও শুধুমাত্র এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাঁকা থাকছে ৪৮ হাজার আসন। বহু কলেজে অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যার মতো বিষয়ে কোনও ছাত্রছাত্রী পাওয়া যাবে না বলেই আশঙ্কা। মোট আবেদনকারীর সংখ্যা দেখে একাধিক কলেজের প্রিন্সিপাল হতাশায় ডুব দেন। তাঁদের আক্ষেপ, এভাবে চলতে থাকলে আগামীদিনে কলেজের অস্তিত্ব বলে কিছু থাকবে না
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ামক অভিজিৎ রায়চৌধুরীকে স্নাতকে ভর্তির জন্য নোডাল অফিসার করা হয়েছে। এদিন অভিজিৎবাবু বলছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন কলেজে মোট আসন সংখ্যা ৭৪ হাজার ৩৮১। আবেদনকারীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৩৪৮ জন। এক একজন একাধিক কলেজে আবেদন জমা করেছেন।’ জানা গিয়েছে, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬টি কলেজের মধ্যে পাঁচটি স্বশাসিত। মেদিনীপুরে একটি বেসরকারি ডিগ্রি কলেজ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাদবাকি ৫০টি কলেজে ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হবেন।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা সদর তাম্রলিপ্ত মহাবিদ্যালয়ে মোট আসন ২ হাজার ৩১৫টি। অথচ, ফার্স্ট প্রেফারেন্স হিসেবে আবেদন জমা পড়েছে মাত্র ৫৯৭টি। সাধারণত দেখা গিয়েছে, এঁরাই ভর্তি হন। এক একজন নিজের পছন্দের কলেজ ছাড়াও অন্য কলেজে আবেদন করে রাখেন। তাই মোট আবেদনের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এদিন কলেজের অধ্যক্ষ অতীতের সোনালি দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলছিলেন, ‘জেলার ঐতিহ্যবাহী আমাদের এই কলেজে একসময় দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগর এলাকা থেকে প্রচুর ছাত্রছাত্রী ভর্তি হতেন। তাঁদের তাম্রলিপ্ত মহাবিদ্যালয়ের প্রতি অদ্ভুত একটা টান ছিল। কলেজের বয়েজ ও গার্লস হস্টেল গমগম করত। ধারেকাছে অজস্র মেসবাড়ি গজিয়ে উঠেছিল। সেগুলিতে ভাড়া থেকে পড়াশোনা করতেন। সেসব আজ শুধুই স্মৃতি! ২০২৪ সালে আমাদের দেড় হাজার ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছিলেন। রেজিস্ট্রেশনের সময় সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছিল ১ হাজার ০৫৬ জন। এ বছর ওই সংখ্যক পড়ুয়াও পাওয়া যাবে না।’
পালপাড়া যোগদা সৎসঙ্গ মহাবিদ্যালয়ে মোট আসন সংখ্যা ১ হাজার ৫৬২টি। ফার্স্ট প্রেফারেন্স হিসেবে আবেদন জমা পড়েছে মাত্র ৩৬৬টি। তাঁরাই ভর্তি হবেন বলে কলেজ কর্তৃপক্ষ একরকম নিশ্চিত। সেই হিসেবে তিন-চতুর্থাংশ আসন ফাঁকা থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। মুগবেড়িয়া গঙ্গাধর কলেজের অধ্যক্ষ স্বপনকুমার মিশ্র বলেন, ‘আমাদের কলেজে মোট আসন সংখ্যা ১ হাজার ৯৫০টি। তারমধ্যে ফার্স্ট প্রেফারেন্স হিসেবে ৬৮৭টি আবেদন জমা পড়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে কলেজে সব আসনে ছাত্রছাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। এবছর অবস্থাটা বেশ শোচনীয়।’ সবমিলিয়ে ‘হীরক রাজার দেশ’কে মনে করিয়ে দিচ্ছে তিন জেলার উচ্চশিক্ষার হাল!