সংবাদদাতা, কাটোয়া: নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত নার্সের শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। সেই সঙ্গে উদ্বেগ বাড়ছে পূর্ব বর্ধমানে। ওই নার্সের মঙ্গলকোট থানা এলাকায়। কলকাতার বারাসতের বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে তাঁকে কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অবস্থার অবনতি হওয়ায় রেফার করা হয় বর্ধমান মেডিকেলে। সেখানে প্রায় দু’দিন ভর্তি ছিলেন। মঙ্গলবার কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালের চারজন নার্স সহ দু’ জন চিকিৎসককে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, বর্ধমান মেডিকেলেরও সাতজন চিকিৎসক সহ বেশ কয়েকজনে নিভৃতবাসে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জেলার মুখ্যস্বাস্থ্য আধিকারিক জয়রাম হেমব্রম এদিন বলেছেন, ‘সব মিলিয়ে মোট ৪৮ জনকে কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। টানা ২১ দিন তাঁদের ঘরবন্দি থাকতে হবে। রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। গোটা ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বর্ধমান মেডিকেলে চারটি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। কারও উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসা শুরু হবে। প্রয়োজন মতো বেডের সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে।
কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালের সুপার বিপ্লব মণ্ডল বলেন, ‘আক্রান্ত নার্স আমাদের হাসপাতালে দু’ঘন্টা ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসা করেছিলেন দু’জন মেডিকেল অফিসার। চারজন নার্সও চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে যুক্ত ছিলেন৷ সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও যে অ্যাম্বুলেন্সে করে আক্রান্ত নার্সকে বর্ধমান মেডিকেলে পাঠানো হয়েছিল, তার চালককেও হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে। আরও কারা কারা ওই নার্সের সংস্পর্শে এসেছিলেন, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজ্যে একজন নার্স সহ দু’জনের শরীরে নিপা ভাইরাসের সন্ধান মিলেছে। নার্সের পরিবার সূত্রে খবর, গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁর জ্বরের উপসর্গ দেখা দেয়। তিনি বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মরত। ৩১ ডিসেম্বর জ্বর গায়েই তিনি কাজ করেন সেখানে। ২ জানুয়ারি তাঁর বাবা হাওড়া স্টেশন থেকে মঙ্গলকোটের বাড়িতে নিয়ে আসেন। ওই দিনই কাটোয়া শহরের সার্কাস ময়দানের এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। ভোর রাতে তিনি বাড়িতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ৩ জানুয়ারি গ্রামেরই একটি গাড়ি করে নার্সকে তড়িঘড়ি কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়৷ দু’ ঘন্টা থাকার পরেই তাঁকে বর্ধমান মেডিকেলে স্থানান্তরিত করা হয়।
এদিন আক্রান্ত নার্সের মা কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘মেয়ের শরীরের অবস্থা ভালো নেই৷ বারাসতের ওই হাসপাতালে কাজ করা অবস্থাতেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল আমার মেয়ে।’ গ্রামের বাড়িতেই স্বামী ও এক ছেলেকে নিয়ে থাকেন তিনি। পাশে কাকার বাড়িতে থাকেন নার্সের ঠাকুমা। এদিন গ্রামে স্বাস্থ্যদপ্তরের কোনও টিমকে দেখা যায়নি। গ্রামের বাসিন্দারা জানান, পঞ্চায়েত থেকে স্যানিটাইজ করার জন্য কয়েকজন এসেছিলেন। আক্রান্তের ঠাকুমা অনিতা রায়চৌধুরী বলেন,‘নাতনি অসুস্থ হওয়ার পরেই আমরা গিয়ে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলাম৷ কিন্তু এখন শুনলাম নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত। কি করব বুঝে উঠতে পারছি না। গ্রামের বাসিন্দা অমিতাভ রায়চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের ভয় লাগছে। গ্রামের কয়েকজন যুবক আক্রান্তকে গাড়িতে করে কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। তাঁরাও অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ এদিকে, কাটোয়া হাসপাতালের যে চারজন নার্সকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে, তাঁদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা। তাঁকে নিবিড় নজরদারিতে রাখা হয়েছে৷ আক্রান্ত নার্সকে প্রথমে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল৷ সেখানে যে মেডিক্যাল অফিসার ও নার্স চিকিৎসা করেছিলেন, তাঁরা এখন কোয়ারেন্টাইনে।