সংবাদদাতা, কাটোয়া: সামনেই রথযাত্রা উৎসব। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বসবে মেলা। তাই এখন থেকেই চূড়ান্ত কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছে পূর্বস্থলীর নতুনগ্রামে। নাওয়া-খাওয়া ভুলে শিল্পীরা তৈরি করছেন ছোট বড় বিভিন্ন আকারের কাঠের জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম। পূর্বস্থলীর নতুনগ্রাম থেকে এবার প্রায় ৪০হাজার জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের মূর্তি পাড়ি দেবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। রথের মেলায় লক্ষ্মীলাভের আশায় পুরুষদের পাশাপাশি ব্যস্ততা তুঙ্গে গ্রামের মহিলাদেরও।
পূর্বস্থলী-২ব্লকের পিলা অঞ্চলের নতুনগ্রামকে সকলে ‘কাঠপুতুলের গ্রাম’ নামেই চেনে। গ্রামের ৫০টি পরিবার বংশপরম্পরায় কাঠের পেঁচা তৈরির শিল্পকেই টিকিয়ে রেখেছে। তবে রথের মেলা উপলক্ষ্যে প্রতিবছর কাঠের জগন্নাথ তৈরি করা হয় নতুনগ্রামে।
নতুনগ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই কাঠ দিয়ে বিভিন্ন উচ্চতার রংবেরংয়ের জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের মূর্তি তৈরির কাজ চলছে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রথের মেলায় শিল্পীরা তাঁদের পসরা সাজিয়ে বসেন। দমদম, নাগের বাজার, শ্রীরামপুর, গুপ্তিপাড়া, কালীঘাট, চন্দননগর প্রভৃতি জায়গার রথের মেলায় পাড়ি দেন নতুনগ্রামের কাঠপুতুল শিল্পীরা। তাই এখন গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই চূড়ান্ত ব্যস্ততা শুরু হয়ে গিয়েছে। কেউ মূর্তি তৈরি করে ঝুড়িতে সাজিয়ে রেখেছেন। কেউ আবার কাঠের পুতুলে রং করছেন। গ্রামজুড়ে যেন উৎসবের মেজাজ। গ্রামের বাসিন্দা শিল্পী বিশ্বনাথ সূত্রধর, মাধব ভাস্কর বলেন, আমরা জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের মূর্তি তৈরি করে বিভিন্ন জায়গার রথের মেলায় নিয়ে যাই। ভালোই বিক্রিবাটা হয়। এবারে গ্রামের সব শিল্পীদের নিয়ে প্রায় ৪০হাজার ছোট-বড় জগন্নাথ, সুভদ্রা, বলরাম তৈরি করা হয়েছে। শিল্পীরা বলেন, কাঠের তৈরি জগন্নাথের উপর প্রথমে খড়ি মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। তারপর রং করা হয়। এখানকার শিল্পীরা কাঠের নানা পুতুল, রাজা-রানি, গৌর-নিতাই, লক্ষ্মীপেঁচা তৈরি করে সংসার চালান। রাজ্যের পাশাপাশি বেঙ্গালুরু, দিল্লি, মুম্বইয়ের মতো জায়গায় এখানকার শিল্পীদের শিল্পকর্ম পাড়ি দেয়। কাঠপুতুল তৈরি করে গ্রামের অর্থনৈতিক হাল ফিরেছে। আগে কাটোয়ার অগ্রদ্বীপের কাঠের পুতুল পাড়ি দিয়েছে বিদেশেও। শিল্পীদের তৈরি কাঠের ‘রাশিয়ান ডল’ স্পেনের মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে। আফ্রিকান ডলের আদলে তৈরি কাঠের দুর্গাপ্রতিমা স্থান পেয়েছে বিশ্ববাংলার বিপণন কেন্দ্রগুলিতেও। আগে নতুনগ্রামের শিল্পীরা শুধু কাঠের পেঁচা, রাজা-রানি পুতুল তৈরি করতেন। এখন তাঁরা ঘর সাজানোর জন্য কাঠের নানা সুদৃশ্য জিনিসপত্র, আসবাবপত্র তৈরি করছেন। তাতেও পেঁচার ছোঁয়া থাকছে। ঘর সাজানোর জন্য ছোট পেঁচার চেন, ঘড়ি, সূক্ষ্ম কারুকার্যতে ভরা আসবাবপত্র তৈরি করছেন তাঁরা। ড্রেসিং টেবিল, সোফা, ডাইনিং টেবিল, বসার চেয়ারের সেট এমনকী, পুরনো আমলের সিন্দুক পর্যন্ত তৈরি করছেন। প্রতিটি আসবাবেই গ্রামের ঐতিহ্য তুলে ধরার জন্য কাঠপুতুল ব্যবহার করা হচ্ছে। গ্রামের মহিলা শিল্পী টুম্পা সূত্রধর, মাম্পি সূত্রধরদের কথায়, প্রতিটি বাড়িতেই প্রায় ৩০০-৪০০টি ছোট বড় জগন্নাথ তৈরি হচ্ছে। অনেকেই বিক্রির আশায় কাঠপুতুল নিয়ে দীঘায় যাবেন। নিজস্ব চিত্র