নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: বিজেপির দাবি মেনে তদন্তের দায়িত্বভার পেয়েছিল সিবিআই। ততদিনে পুলিশও চার্জশিট দাখিল করে দেয়। পরে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ওই চার্জশিটে অভিযুক্ত তিনজনের নাম বাদ দিয়ে নতুন চার্জশিট দাখিল করে। কিন্তু, বিধি বাম! নির্যাতিতার বয়ানের ভিত্তিতে ওই তিনজনের নাম ফের মামলায় যুক্ত করার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিল তমলুক আদালত। অর্থাৎ, পুলিশি তদন্তে সিলমোহর দেওয়া হল বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
খেজুরিতে ভোট পরবর্তী হিংসায় তদন্ত শেষ করে চারজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করে পুলিশ। পরে সিবিআই সেই মামলার তদন্তভার পায়। চারজনের পরিবর্তে মাত্র একজনের নামে চার্জশিট দাখিল করে। তার মানে তিনজনকে মামলা থেকে রেহাই দেওয়া হয়। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া চলকালীন বিষয়টি অন্যদিকে মোড় নেয়। পুলিশের তদন্তেই সিলমোহর দিল পূর্ব মেদিনীপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারকের ফার্স্ট কোর্ট। নিগৃহীতা মহিলার বয়ান নথিভুক্ত করার পর চারজনকেই মামলায় যুক্ত করেছে আদালত। খেজুরি থানার পুলিশ ওই চারজনের বিরুদ্ধেই আদালতে চার্জশিট দিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে গোটা ঘটনায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। ওই মামলায় সিবিআইয়ের আইনজীবী মলয় সিনহা অবশ্য বলেন, ‘ওই কেসে মোট চারজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।’
২০২১ সালে ২ মে বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশিত হয়। পরের দিন খেজুরি ও নন্দীগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় রাজনৈতিক ঝামেলা শুরু হয়। খেজুরি থানার মালদা গ্রামে এক সক্রিয় বিজেপির মহিলা কর্মীর বাড়িতে বোমা ছোঁড়া হয়। গণ্ডগোলের আশঙ্কায় ৪ মে ওই মহিলা তাঁর পুত্রবধূকে আত্মীয় বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। একমাত্র ছেলে কর্মসূত্রে কেরলে ছিলেন। ওইদিন রাতে তিনি বাড়িতে একা ছিলেন। সেই সুযোগে চার দুষ্কৃতী তাঁর বাড়িতে ঢোকে বলে অভিযোগ। তাঁকে ধর্ষণ করে মুখে বিষ ঢেলে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। পরদিন সকালে বাড়ির উঠোনে অর্ধনগ্ন এবং সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
নির্যাতিতার পুত্রবধূ খেজুরি থানায় মীর উসমান, গৌতম দাস, সুশান্ত দাস এবং সুব্রত দাসের বিরুদ্ধে এফআইআর করেন। পুলিস তদন্তে নেমে উসমান ও সুব্রত দাসকে গ্রেপ্তার করে। বাকি দু’জন পলাতক ছিল। ২০২১ সালে ৫ আগস্ট খেজুরি থানার পুলিস ওই ঘটনার চারজনের নামে চার্জশিট পেশ করে। এরপর ৩০ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে মামলার তদন্তভার নেয় সিবিআই। তারা ২০২২ সালে ২৭ এপ্রিল ওই ঘটনার চার্জশিট তমলুক কোর্টে জমা করে। তাতে মীর উসমানের নাম থাকলেও বাকি তিনজনের নাম বাদ থাকে। তখনই সিবিআইয়ের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন নিগৃহীতা ওই বিজেপি কর্মী। অভিযুক্তদের সঙ্গে দলের একাংশের অশুভ আঁতাতে নাম বাদ গিয়েছে বলেও সরব হয়েছিলেন তিনি।
গত ৩ নভেম্বর ওই মামলায় নিগৃহীতার জবানবন্দির ভিত্তিতে আদালত মীর উসমানের সঙ্গে ফের গৌতম দাস, সুশান্ত দাস এবং সুব্রত দাসকেও মামলায় যুক্ত করেছে। গত ৯ নভেম্বর ওই তিনজন জামিন নিয়েছেন। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। চারজনকেই আদালতে উপস্থিত হতে হচ্ছে। নিগৃহীতার জামাই পরিমল মণ্ডল নন্দীগ্রামের সোনাচূড়ার বিজেপি কর্মী। তিনি বলেন, ‘আমার শাশুড়ি পার্টি করার জন্য তাঁর উপর এই ভয়ানক ঘটনা ঘটেছে। শুরুতে দল পাশে থাকলেও এখন আর খোঁজখবর নেয় না। সিবিআইয়ের চার্জশিট থেকে তিনজনের নাম বাদ যাওয়াটা আমাদের কাছে আশ্চর্যজনক লেগেছিল। আদালতের মনে হয়েছে, তিনজনের নাম বাদ যাওয়াটা ঠিক হয়নি। তাই ওদেরকে ফের অভিযুক্ত করা হয়েছে। মোট ১৩ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। আমি ১৯ নভেম্বর সাক্ষ্য দিয়েছি।’