সংবাদদাতা, কাটোয়া: মাথার চুল ধরে দু’দিক থেকে দু’জন ঝুলছেন। আবার কখনও মাথার উপরে দু’টি মাটির কলসির উপর তরতরিয়ে সটান একজন মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছেন! আর দু’দিক দিয়ে কয়েকজন মানুষ একে অপরের কাঁধ ধরে ঝুলছেন। এমনই নানা কসরত জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন লোকনৃত্য রায়বেঁশের সঙ্গে। প্রাচীনকাল থেকেই রায়বেঁশে রাঢ় বাংলার লোকসংস্কৃতির আঙিনায় স্মমহিমায় রয়েছে। প্রাচীন এই লোকশিল্প বজায় রাখতে রায়বেঁশে শিল্পীদের আরও উন্নতি চাইছে প্রশাসন। মঙ্গলবার থেকে কাটোয়ায় শুরু হল তিনদিনের রায়বেঁশে প্রশিক্ষণ কর্মশালা।
রায়বেঁশে নৃত্যকে আধুনিক আঙ্গিকে তুলে ধরে যাতে আরও আকর্ষণীয় করা যায় তার জন্যই প্রশিক্ষণ শিবির করেছে পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসন। জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক রামশঙ্কর মণ্ডল বলেন, সারা রাজ্যে দু’লক্ষ লোকশিল্পী সরকারি ভাতা পাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রায়বেঁশে শিল্পীরাও রয়েছেন। এছাড়া এখন সরকারি অনুষ্ঠানে গেলে যাতায়াতের খরচ বাবদ সহায়তাও মিলছে। যাতে আধুনিক প্রজন্মের মধ্য থেকেও এই লোকশিল্পের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। সেই উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ কর্মশালার আয়োজন হয়েছে।
জানা গিয়েছে, পূর্ব বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও হুগলি এই চার জেলা নিয়ে মোট ২৬ টি দল এই কর্মশালায় অংশ নিয়েছে। পুরুষ ও মহিলা মিলে প্রায় ৩০০ রায়বেঁশে শিল্পী রয়েছেন। রয়েছেন দু’জন অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক। এদিন কাটোয়া শহরের সংহতিমঞ্চে এই কর্মশালা শুরু হয়। উপস্থিত ছিলেন কাটোয়ার মহকুমা শাসক অনির্বাণ বোস, বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় সহ অন্যান্যরা। রায়বেঁশের সঙ্গে জড়িয়ে মূলত আত্মরক্ষার কৌশল। মুঘল আমলে লেখা বেশ কয়েকটি গ্রন্থে এই রায়বেঁশে সম্প্রদায়ের উল্লেখ মেলে। লোক গবেষকদের একাংশের দাবি, বাইরে থেকে আসা পর্তুগিজ-সহ অন্য বিদেশি বণিকদের এদেশে ঢোকার পরে সেই সময় বাংলার মেয়েদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছিল। মূলত তাঁদের নিরাপত্তার জন্য প্রতিরোধবাহিনী গড়ে তোলেন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পুরুষ। অস্ত্র হিসেবে তাঁরা ব্যবহার করতেন ‘রায়’ অর্থাৎ উৎকৃষ্ট মানের বাঁশের লাঠি। সেই সময়ে পুরুষেরা দলবদ্ধ হয়ে জলদস্যুদের মোকাবিলা করতেন। কথিত রয়েছে, মগদের ফাঁদে ফেলার জন্য অনেক পুরুষ ‘রাই’ অর্থাৎ রাধা সেজে স্নানের ঘাটে অপেক্ষা করতেন। বাকি দলের লাঠিয়ালরা লুকিয়ে থাকতেন। জলদস্যুরা মহিলাদের ধরতে এলে ছদ্মবেশী মহিলারা বিকট আওয়াজ ও মুখে নানারকম শব্দ করতেন। হতচকিত হয়ে পড়তেই চারপাশ থেকে লাঠিয়ালরা এসে জলদস্যুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন। রাঢ় বাংলার বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, মেদিনীপুর ও দুই বর্ধমানের কিছু অংশে রায়বেঁশে নৃত্যশৈলী বিস্তৃতিলাভ করে। কোশিগ্রামের রায়বেঁশে শিল্পী বাবলু হাজরা, রাজেশ হাজরারা বলেন, রাজস্থানের বিকানির, দিল্লি, মুম্বাই সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমরা এই লোকনৃত্য প্রদর্শনের ডাক পেয়েছি। কাটোয়ায় সংহতি মঞ্চে রায়বেঁশে নৃত্য কর্মশালা। -নিজস্ব চিত্র।