নিজস্ব প্রতিনিধি, বাঁকুড়া ও আরামবাগ: সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রাজ্যের অন্যান্য জেলার মতো বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও আরামবাগের বহু শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মী চাকরি হারা হয়েছেন। আদালতের রায়ে পুরুলিয়া জেলার প্রায় ৪৫০জনের এবং বাঁকুড়ার ১০০৫জনের চাকরি চলে গিয়েছে। এর ফলে স্কুলগুলি সমস্যায় পড়েছে। শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়ে বৃহস্পতিবার পুরুলিয়া শহরে মিছিলও বের করে এসইউসি।
চাকরি যাওয়ার পরেই হতাশায় ভেঙে পড়েন পুরুলিয়ার শিক্ষক-শিক্ষিকারা। আদালতের এমন রায় হবে কল্পনাও করতে পারছেন না ২০১৬ সালের প্যানেলে নাম থাকা শুভাশিস পান। তিনি গাড়াফুসড় হাইস্কুলের ইংরেজির শিক্ষক। তিনি বলছিলেন, বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা ছিল। কারণ আমরা জানি আমরা যোগ্য। কিন্তু, এতকিছুর পরেও যোগ্য আর অযোগ্য প্রার্থীদের আলাদা করতে পারল না, এর দায় কার?
পুরুলিয়ার বড়াসিনী উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের প্যানেলে চাকরি পাওয়া শিক্ষক অভিষেক দাঁ বলেন, দুর্নীতি করেছেন নেতা মন্ত্রী আমলারা। কিন্তু, সেই দায়ভার আমাদের উপর কেন এসে বার্তাবে? তাঁর সংযোজন, যারা সাদা খাতা জমা দিয়েছিল, তাদের টাকা ফেরত দিতে বলেছে বলে শুনলাম। তার মানে তো তারা অযোগ্য সেটা ‘প্রমাণিত’। আমাদের ব্যাপারটা প্রমাণ না করেই প্যানেলটা বাতিল দেওয়াটা কি ঠিক হল? এই রায় অত্যন্ত হতাশজনক।
বামুনডিহা হাইস্কুলের শিক্ষিকা সুস্মিতা মাহাত বলেন, ভেবেছিলাম যোগ্যদের চাকরি বহাল থাকবে। আমরা মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাব। কিন্তু, এই রায় কল্পনা করতে পারিনি। আদালতের রায়ে বাঁকুড়া জেলরাও ১০০৫জন চাকরিহারা হয়েছেন। বাঁকুড়া গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সুমনা ঘোষ বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে মোট চারজন শিক্ষিকা চাকরিহারা হয়েছেন। কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন বিষয়ে মাত্র একজন শিক্ষিকা ছিলেন। তাঁর চাকরি যাওয়ায় ওই বিষয় পড়ানোর আর কেউ রইলেন না। ওই বিষয়ে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি মিলিয়ে প্রায় ৭০ জন ছাত্রী রয়েছে। বাঁকুড়া মিউনিসিপ্যাল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাধনচন্দ্র ঘোষ বলেন, আমাদের স্কুলে পদার্থবিদ্যার শিক্ষক ও রসায়নের শিক্ষিকার চাকরি যাওয়ায় বিজ্ঞান বিভাগ অথৈ জলে পড়েছে। ওই বিভাগ চালু রাখা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।
বাঁকুড়া জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (মাধ্যমিক) পীযূষকান্তি বেরা বলেন, আমাদের জেলায় ৬৯২ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা, ১২৬ জন করণিক ও ১৮৭ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মীর চাকরি গিয়েছে। আমরা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছি।
আরামবাগ মহকুমাতেও বহু শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীর চাকরি বাতিলের খবর পাওয়া গিয়েছে। এদিন রায় বেরনোর পর কয়েকজন শিক্ষক আরামবাগ স্টেশনের বাইরে গাছতলায় আলোচনায় বসেন। তাঁদের সংগঠনের তরফে খোঁজখবর নেওয়া হয় বাকি শিক্ষকদেরও। এক শিক্ষক মনিরুল ইসলাম বলেন, যোগ্য শিক্ষক ঐক্য মঞ্চ গড়ে আমরা আন্দোলন চালাচ্ছিলাম। এদিনের রায়ে আমরা হতাশ। আমরা পরীক্ষা দিয়ে নিজেদের যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছিলাম। শীঘ্রই কলকাতায় গিয়ে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক হবে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আরামবাগ গার্লস হাইস্কুলের পাঁচজন শিক্ষিকা এবং দু’জন শিক্ষাকর্মীর চাকরি গিয়েছে। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা রাজর্ষি দে বলেন, প্যানেল বাতিলের জেরে স্কুলে শিক্ষক সঙ্কট আরও প্রবল হবে। এমনিতেই অনেক বিষয়ের শিক্ষকের চাহিদা রয়েছে। তারমধ্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা চলে গেলে বিপাকে পড়তে হবে। খানাকুলের ঘোষপুর ইউনিয়ন নেতাজি বিদ্যাপীঠেও পাঁচজনের চাকরি বাতিলের খবর পাওয়া গিয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা ভেঙে পড়েন। সেখানকার প্রধান শিক্ষক অরুণকুমার রায় বলেন, চারজন শিক্ষক ও একজন শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের খবর আমরা পেয়েছি। এই রায়ের ফলে বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিজস্ব চিত্র