সুমন তিওয়ারি, আসানসোল: ডিপ টিউবয়েলের জলকে অনেকেই নিরাপদ মনে করে পান করেন। মানুষের সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে দুর্গাপুর এনআইটির এক গবেষণা। সেই গবেষণায় দেখা গিয়েছে, জটিল রোগে ব্যবহৃত এরিথ্রোমাইসিন, ডায়োক্সিলিনের মতো ১২ অ্যান্টিবায়োটিক মিশে রয়েছে দামোদর অববাহিকার ভূগর্ভস্থ জলে। যা বহু ক্ষেত্রেই জলকে বিষে পরিণত করছে। এই জল খাওয়ার ফলে মানুষের শরীরে আ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স তৈরি হচ্ছে। যার ফলে এই ১২ অ্যান্টিবায়োটিক যেমন মানব শরীরে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে, তেমনি অন্য জটিল রোগ সৃষ্টি করছে। দামোদর নদীতে তেজস্ক্রিয় পদার্থের খোঁজ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রথম নদীর জলে অ্যান্টিবায়োটিকে হদিশ পেয়েছিলেন। এবার গবেষণায় উঠে এল ভূগর্ভস্থ জলেও তা মিশে গিয়েছে।
এক্ষেত্রে বিপদ অনেক বেশি। স্বাভাবিক ভাবে নদীর জল সংগ্রহ করলেও পুরসভা বা জনস্বাস্থ্য ও কারিগরি দপ্তর তা পরিস্রুত করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে মানুষের কাছে পাঠায়। কিন্তু ভূগর্ভস্থ জল মানুষ সরাসরি পানীয় হিসেবে গ্রহণ করে। যা শরীরের ব্যাপক ক্ষতি করছে। এক বা দু’ জায়গায় নয়। ৭৩৫ জায়গা থেকে ভূগর্ভস্থ জলের নমুনা নিয়ে বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি যেমন প্রমাণ করেছেন, তেমনি মানব শরীরে তার ক্ষতির পরিমাপ যুক্ত গ্রাফও তৈরি করেছেন। পূর্ণ বয়স্ক ও শিশু— এই দু’টি ভাগে গ্রাফ তৈরি হয়েছে। দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় নিম্ন দামোদর এলাকায়। সেখানে ভূগর্ভস্থ জলে অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। আরও উদ্বেগের বিষয়, এই মাত্রা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা পত্রে বিজ্ঞানীদের দাবি, শেষ ১৫ বছরে এর মাত্রা ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। এই হারে বাড়লে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ২০২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। জল দূষণের প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে অধিক মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি। যার ফলে ক্যান্সার সহ নানা জটিল রোগ বৃদ্ধি পাবে। এই বৃদ্ধির কারণও তাঁরা ব্যাখা করেছেন। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন পোল্ট্রি ফার্মে মুরগির দ্রুত বৃদ্ধির জন্য মাত্রারিতিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হচ্ছে।
এছাড়া শুয়োর, ভেড়া এমনকী গোরুর উপর অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ বহু গুণ বেড়েছে। এছাড়া মানুষও অনেক বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করছে। উন্নত সুয়ারেজ স্টিস্টেম না থাকায় সেগুলি পরিস্রুত না হয়েই নদীতে মিশে যাচ্ছে। মাটির গভীরেও চলে যাচ্ছে। মাটিতে থাকা পিএইচ, হেভি মেটাল, বাইকর্বোনেট অ্যান্টিবায়োটিকগুলির মাটিতে অবস্থান করতে ও ছড়িয়ে পড়তে অনুঘটকের ভূমিকা নিচ্ছে। এনআইটি দুর্গাপুরের ফিজিক্সের অধ্যাপক হীরক চৌধুরী, প্রতিষ্ঠানে পিএইচডি পড়ুয়া রাজলক্ষ্মী নাথ ও রাশিয়ার বিজ্ঞানী কঙ্কনা শীল এই গবেষণা করেছেন। ১৮ নভেম্বর ‘এনভিরন জিওকেম’ হেলথ ম্যাগাজিনে গবেষণা পত্রটি প্রকাশ পেয়েছে। বিজ্ঞানী হীরক চৌধুরী বলেন, বেশ কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে পানের জন্য ভূগর্ভস্থ জল তোলা এখনই নিষিদ্ধ করতে হবে। জল পরিস্রুত করা এবং সুয়ারেজ সিস্টেমও উন্নত করা প্রয়োজন। গবেষণা চলছে দুর্গাপুর এনআইটিতে।-নিজস্ব চিত্র