শান্তনু দত্তগুপ্ত: মধ্যবিত্তের জন্য এই বাজেটে কী আছে ম্যাডাম? সাংবাদিক সম্মেলনে এই প্রশ্নটা ধেয়ে আসতেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ভুরু কপালে তুলে অদ্ভুত এক মুখভঙ্গি করলেন। ভাবটা এমন, যেন অত্যন্ত গোপন কিছু জানতে চাওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠল, সবাই শুনল, কিন্তু নির্মলা ম্যাডাম উত্তর দিলেন না! স্রেফ এড়িয়ে গেলেন। কারণ, সত্যিই তাঁর উত্তর দেওয়ার মতো কিছু ছিল না। বাজেট বলতে মধ্যবিত্ত বোঝে দু’টি সমীকরণ। প্রথম, আয়কর কাঠামো। এবং দ্বিতীয়, কোন জিনিসের দাম বাড়ল, আর কীসের কমল। এর বাইরে মধ্যবিত্ত যদি কিছু নিয়ে মাথা ঘামায়, তা হল—যা যা ঘোষণা হয়েছে, তাতে আম জনতার সরাসরি কতটা উপকার হবে। নির্মলা ম্যাডামের দেড় ঘণ্টার বাজেট বক্তৃতা কাটাছেঁড়া করলে এর কোনোটিরই হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই মধ্যবিত্ত হতাশ। অবশ্য এইসব হতাশা সাময়িক। মানিয়ে বুঝিয়ে নিতে শিখে গিয়েছে তারা। জেনে গিয়েছে, সমাজের মাঝের চাকা হয়েই চলতে হবে। সবচেয়ে বেশি ভার থাকবে মধ্যবিত্তেরই কাঁধের উপর। কিন্তু এ চাকার ‘মেন্টেনেন্স’ হবে না। কেমন সেই ভার? একবার দেখে নেওয়া যাক।
প্রথমেই আয়কর। এইটে দিতেই হবে। লুকানোর উপায় নেই। কারণ, মধ্যবিত্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চাকরিজীবী। যা আয় করবে, সেটাই সাদা। সরকার দেখবে, আর স্ল্যাব অনুযায়ী টাকা কেটে নেবে। মোদি সরকার বলবে, কেন এত হইচই? গত বছরই তো ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়কর ফ্রি করে দিয়েছি! স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন ৭৫ হাজার। মানে, ১২ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়কর দেওয়ার প্রশ্ন নেই। তাহলে এত কথা কীসের? কিন্তু সরকারের স্যার-ম্যাডামরা... কথা আছে। মূল্যবৃদ্ধি, বিশেষত খাদ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে এই জাহিরনামা কি খাপ খায়? ইনফ্লেশন ইনডেক্সিং কোথায়? অর্থাৎ আয়, জীবন-যাপনের মাত্রা, কর কাঠামো, মূল্যবৃদ্ধির হার... এই সবকটি মাপকাঠির সামঞ্জস্য যে রয়েছে, তার প্রমাণ সূচক তো দেখাতে হবে! তা কিন্তু মধ্যবিত্ত দেখতে পাচ্ছে না। নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য নেই। মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়ের স্কুলের ফি দেবে, দোকান-বাজার করতে গিয়ে জিএসটি দেবে, গাড়ি বা দু’চাকা কিনলে রোড ট্যাক্স ভরবে, ইএমআই দিতে প্রাণপাত করবে, রক্ত জল করা আয়ের টাকায় মাথার ছাদ কিনতে গিয়েও সরকারকে স্ট্যাম্প ডিউটি দেবে। প্রশ্ন সে করতেই পারে, কেন দেব? এই জমি বা ফ্ল্যাটটা হয়তো চার হাত ঘুরেছে। অর্থাৎ, চারবার বিক্রি হয়েছে। এই চারবারই কিন্তু সরকার ৭-৮ শতাংশ করে স্ট্যাম্প ডিউটি নিয়েছে। কী ভূমিকা ছিল সরকারের? স্ত্রীর গয়না বেচে, ধার করে, নিজের যাবতীয় শখ-আহ্লাদ মেরে ওই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক একচিলতে জমি বা ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট কিনছেন। নিজের পরিশ্রমের টাকায়। তারপরও তাঁকেই কর দিতে হবে?
অর্থাৎ, ডায়াপার থেকে অগরু পর্যন্ত শুধু ট্যাক্স গুনে যাবে মধ্যবিত্ত। তারা ব্যাংক থেকে লোনের নামে টাকা নিয়ে বিদেশে চলে যেতে পারবে না। কর্পোরেট ট্যাক্সের মতো তাদের আয়কর মকুব হবে না। কারণ, মধ্যবিত্ত সরকারের ‘বন্ধু’ নয়। তাদের লগ্নিতে কোনো কারখানা হবে না। জিডিপি বৃদ্ধিতে তাদের ভূমিকা চোখে দেখা যাবে না। মধ্যবিত্ত শুধু অর্থনীতিকে কাঁধে তুলে দাঁড়িয়ে থাকার কাজটি করবে। ‘বন্ধু’ কর্পোরেটরা ভোগ্যপণ্য বানাবে, আর মধ্যবিত্ত কিনবে।
এ তো গেল ‘দানধ্যানে’র বিষয়। যা পেলাম, তার প্রায় সবটাই হারালাম। আর কী কী পেলাম না? ১) মধ্যবিত্ত ফ্রিতে রেশন পাবে না। কারণ, তার মাথার উপর ছাদ, ফ্রিজ, এসি, আর ছোট্ট একটা গাড়ি আছে। ২) সে গ্যাসের ভরতুকি পাবে না। পেলেও ১৯ টাকা। ও দিয়ে এক কেজি আলু, একটা দুধের প্যাকেট, এমনকি খান তিনেক ডিম পর্যন্ত হয় না। ৩) সরকারি এলআইজি বা এমআইজি ফ্ল্যাটের জন্য আবেদন করতে পারবে না। কারণ, তাতে পারিবারিক ইনকাম দেখবে। সেটা আবার মানদণ্ড ছাপিয়ে যাচ্ছে। ৪) সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের অধিকাংশ সুবিধা পাবে না। তা সে আয়কর দিক, বা না দিক। মজার ব্যাপার বটে।
আগে বাড়ি-ফ্ল্যাটের জন্য লোন করলে তার সুদের অংশ পুরোটা বাদ হয়ে যেত আয়কর থেকে। আসলের অংশটিও ঢুকে পড়ত দেড় লক্ষ টাকা ছাড়ের আওতায়। চাকরিজীবীদের জন্য সে ছিল এক বড়ো স্বস্তির ব্যাপার। মাথার উপর ছাদ হল, আবার ইএমআইয়ের টাকাটা গায়েও লাগল না। আর এখন? আয়কর কাঠামোর নতুন রেজিমে ছাড়ছুড়ের কোনো ব্যাপারই নেই। পুরানোতে আছে বটে। কিন্তু সে ছাড় দেওয়ার পরও যে টাকা কর দিতে হচ্ছে, তার থেকে কম খসছে নতুনের জাঁতাকলে। সবচেয়ে বড়ো কথা, পুরানো জমানার আয়কর কাঠামোয় এখন ১০ লক্ষ টাকা বার্ষিক আয় পেরিয়ে গেলেই ৩০ শতাংশ হারে ‘মাশুল’ গুনতে হচ্ছে মধ্যবিত্তকে। অথচ, সরকারের হিসাবে ইকনমিকালি ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস বা আর্থিকভাবে দুর্বল কারা? যাঁদের আয় ৮ লক্ষ টাকার কম! তাঁরা এই দেশে সংরক্ষণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। অথচ তার দু’লক্ষ টাকা বেশি আয়ে ৩০ শতাংশ হারে কর গুনতে হচ্ছে। এটা কোন বোম্বাগড়ের যুক্তি? এমন যুক্তি অবশ্য আরও আছে—নতুন কর কাঠামোয় বছরে ২৪ লক্ষ টাকা আয় করলে ৩০ শতাংশ হারে ব্যক্তিগত আয়কর। এক কোটি টাকা আয় করলেও তাই। কেন উচ্চবিত্তের সঙ্গে মধ্যবিত্তের ফারাক থাকবে না?
এরপর আসে সঞ্চয়ের প্রসঙ্গ। এ কথায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ পড়া স্বাভাবিক। কারণ মোক্ষম প্রশ্নটা হল, সংসার টেনে টাকা বাঁচল কোথায় যে জমাব? আগে তাও স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পগুলোতে সুদের হার কিছুটা আকর্ষণীয় ছিল। অবসরের পর পিএফের টাকাটা দিয়ে এমআইএস করে অনেকেরই হেসেখেলে মাস চলে যেত। ওষুধ, দোকানপাট, ইলেকট্রিক বিল দিয়েও। আর এখন? আর হয় না। মূল্যবৃদ্ধি? সে সরকার মানবে না। বেশি বলতে গেলে শাসকের তল্পিবাহকরা চোখ রাঙাবে। আর স্বল্প সঞ্চয়ের সুদ... তলানির দিকে দ্রুত ছুটছে। সেখানে টাকা রেখেও লাভ হচ্ছে না। তাহলে টাকা রাখব কোথায়? সরকার বলছে, কেন? শেয়ার বাজারে টাকা লাগাও। মিউচুয়াল ফান্ডে রাখো। এই দেখো না, বাজেটে কত সুবিধা করে দিয়েছি। ডিভিডেন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডের সুদের অংশ তুলে নিলে কর দিতে হবে না! সোনার বন্ডের ক্ষেত্রেও কত নিয়ম শিথিল করেছি। শেয়ার বাজারটাই যে ভবিষ্যৎ! আরে ম্যাডাম, আপনারা এটুকু বোঝেন না... ওই ৬৫ বছরের লোকটার পিএফের কয়েকটা টাকাই গোটা জীবনের সম্বল। তিনি অ্যাভোকাডো খান না। তাঁর বাড়িতে ফল ঢোকে স্ত্রী অসুস্থ হলে, কিংবা পুজো থাকলে। টাকাটা শেয়ারে খাটিয়ে দিলেন, আর মার্কেট ডুবে গেল। কী হবে তাঁর তখন? আত্মহত্যা করা ছাড়া গতি থাকবে কি? তখন এই সরকারের কোন সামাজিক সুরক্ষা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে? বিশ্বে বহু এমন দেশ আছে, যেখানে কোনো আয়কর দিতে হয় না। সরকার সেখানে অন্যভাবে আয়ের রাস্তা করে নিয়েছে। সেটা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হতে পারে, কিংবা দেশীয় বাজারে বিক্রি হওয়া জিনিসপত্রের উপর শুল্ক চাপিয়ে। অর্থাৎ, আপনি যেমন জীবন যাপন করতে চান, তেমন খরচ করতে হবে। আয় আপনার নিজস্ব। সেটা আপনি নিজের কাছেই রাখুন। আবার ডেনমার্কের মতো দেশও আছে, যেখানে শীর্ষ আয়কর স্ল্যাব ৫৫ শতাংশ। কিন্তু ভারতের সঙ্গে এর ফারাক কী? এক নম্বর স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিষেবা একেবারে বিনামূল্যে। কাজের গ্যারান্টি প্রত্যেকের। এবং পড়াশোনার পর যতদিন না কাজ মিলছে, মোটা অঙ্কের ভাতা দেবে সরকার। আর আছে অবসরের পর বাজারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন। আমাদের মতো হাজার টাকার লোকদেখানো খয়রাতি নয়! নতুন ভারতের সরকার সামাজিক সুরক্ষা দেবে না। কিন্তু আয়কর মধ্যবিত্তের থেকে আদায় করবে। ব্রিটিশদের দেখানো পথে। সেই ১৮৫৭ সালে যা শুরু হয়েছিল। কারণ, সিপাহি বিদ্রোহের পর টনক নড়েছিল ইংরেজ শাসকের। এরা আন্দোলনের জন্য টাকা কোথা থেকে পাচ্ছে? খোচররা খবর দিয়েছিল, মধ্যবিত্তরা জোগাচ্ছে। তখনই আয়ের উপর কর চাপিয়েছিল ব্রিটিশ শাসক। ৯০ শতাংশ! ভাবটা ছিল, এরা ঠিকমতো খেতেই পাবে না, আন্দোলনে টাকা ঢালবে কী? সেই প্রবণতা এখনও চলছে। আর প্রতিদিন জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
আসলে এই দেশে তাই মধ্যবিত্ত হওয়াটা সবচেয়ে বড়ো অপরাধ। হয় প্রচুর সম্পত্তির অধিকারী হও, না হলে প্রান্তিক। প্রথম শ্রেণিতে পড়ে ভারতের জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ। এই অংশটি অনেক ছক্কাপাঞ্জা করে কর কম দিতে পারে, সরকারের অন্দর মহলে এদের আনাগোনা থাকে, ৪০০ কোটি টাকা কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে ‘ডোনেট’ করে তার বিনিময়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট হাতাতে পারে। দ্বিতীয় অর্থাৎ প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ রেশন দোকানে লাইনে দাঁড়িয়ে বিনামূল্যে চাল-গমটা পেয়ে যাবেন। ১০০ দিনের কাজে জব কার্ড হয়ে যাবে তাঁর। আয়ুষ্মান ভারতের কার্ড দেখিয়ে বিনা পয়সায় চিকিৎসাটাও হয়ে যাবে। সঙ্গে তো রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা আছেই। এর একটিও সুবিধা মধ্যবিত্ত পাবে না। আর পাওয়ার সুযোগ থাকলেও লজ্জার মাথা খুইয়ে লাইনে দাঁড়াতে পারবে না। ঠিক যেভাবে দিনের পর দিন ক্লাস না হওয়া সত্ত্বেও ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলে ফেলে রাখতে পারে না তারা। কষ্ট করে হলেও বেসরকারি ইংরেজি মিডিয়ামে ভরতি করায়, আর মাসের শেষে হাপরের মতো শ্বাস তোলে। কারণ, আয় ছাপিয়ে ধারের খাতায় ঢুকে পড়েছে সংসার। মধ্যবিত্ত অসহায় হচ্ছে। আরো। অর্থনীতিতে প্রতি বছর গড়ে ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হবে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দিকে তাকালে বোঝা যাবে, গত পাঁচ বছরে ৭ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে মূল্যবৃদ্ধির হার। সেই অনুপাতে বেতন কিন্তু চাকরিজীবীদের বাড়েনি! অর্থাৎ, সোজা কথায় খরচ বেড়েছে। সেটাও মানিয়ে নিয়েছে মধ্যবিত্ত। সে মুখ ফুটে বলতে পারেনি, তুমি আয়কর নাও, সেস চাপাও, জিএসটির নামে লুট করো। কিন্তু সেই অনুপাতে একনম্বর স্বাস্থ্য-শিক্ষা সহ যাবতীয় পরিষেবা দাও। তার পিছনে যেন আমাকে খরচ করতে না হয়। আর যদি না পারো, অন্য ব্যবস্থা দেখো আয়ের। আমাদের ঘাড় ভেঙো না। আমরা শুধু ভোট ব্যাংক নই। মানুষও। এবং এই দেশের নাগরিক। যে মধ্যবিত্ত আয়কর দিচ্ছে এবং ১২ লক্ষ টাকা উপার্জন পর্যন্ত পৌঁছাতে না পেরে যে দিতে পারছে না... দু’জনই। কারণ, দু’পক্ষেরই প্রাপ্তি শূন্য। নাগরিকের কর্তব্য মধ্যবিত্ত পালন করছে। মুখ বুজে। তোমাদেরও শাসকের কর্তব্য পালন করতে হবে।