অরুণ মুখোপাধ্যায়: স্থানটির নাম শোভাবাজার। একেবারে গঙ্গার ঘাট থেকে এক থেকে দুই মিনিট হাঁটলেই ফেরিঘাট। সেখান থেকে চক্ররেলের লাইন পেরলেই বাঁদিকে পড়বে দেবী রাজবল্লভী মায়ের মন্দির। গাছের ছায়ায় একতলা দালান মন্দিরে দেবীর অবস্থান। তার আগে রয়েছে একটি প্রাচীন শিবমন্দির। রাজবল্লভী দেবীর মন্দিরের ওপরে লেখা আছে, ‘শ্রীশ্রী রাজবল্লভী মাতা। স্থাপিত ১১৩৫ সাল। পুনঃসংস্কার। অবিনাশ দত্ত। সেবায়েত অক্ষয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তৎপরে তস্য পুত্র কানাইলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।’
দেবী রাজবল্লভী ধবধবে সাদাকালী। টুকটুকে লাল ঠোঁট। দেবী দ্বিভুজা। এক হাতে খড়্গ। অন্য হাতে পানপাত্র। মাথায় ঝলমলে রাজমুকুট। সাদা শিবের বুকের উপর লাল আলতা রাঙানো পা দিয়ে রণং দেহি মনোভাব নিয়ে দেবী রাজবল্লভী দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দেবীর বামপদের তলায় বসে আছেন শুভ্রকান্তি মহাকাল। মহাকালের গলার মালাটি পেট পর্যন্ত ঝুলছে। কিন্তু দিগম্বর শিবের বাঁ হাতের শিঙ্গা যেন এখনই তিনি বাজাবেন। ডানহাতে লুকিয়ে রয়েছে অসহায়তার স্পর্শ। দেবী রাজবল্লভী ত্রিনেত্রের অধিকারিণী। দুই চোখে রয়েছে রুদ্রাণী ভাব। কপালের কালো চোখের নীচে লাল টিপটি দেবীর সর্ব সৌন্দর্যকে প্রকাশ করেছে। মাথার চুলের বাহারটিও বেশ দেখার মতো। হলুদ শাড়ি দেবীকে মহিমাময়ী করে তুলেছে। মাঝে মধ্যে দেবীর অঙ্গে লাল শাড়িও ওঠে। তখন মনে হয় তিনি শক্তির আধার। রূপে অতুলনীয়া। সারা কলকাতা শহরে এমন সাদাকালী খুঁজে আর পাওয়া যাবে না।
রাজবল্লভী দেবীর পুরোহিত অসীম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। রোজ ভোর পাঁচটার সময় ঘণ্টা বাজিয়ে দেবীকে জাগানো হয়। তারপর ঘট স্নান। ঘটটিই দেবীর প্রতীক। দেবীকে মোছানো হয়। সকাল সাতটার মধ্যেই রাজবল্লভীর পুজো শেষ হয়ে যায়। কাটা ফল, মিষ্টিতে সকালের প্রসাদ সাজানো হয়। অন্নভোগ নেই। সন্ধে সাড়ে ছ’টায় মিষ্টি দিয়ে মায়ের পুজো এবং তারপর সন্ধ্যারতি। রাত দশটায় মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। প্রতি অমাবস্যায় মায়ের কাপড় বদলানো হয়। অদ্ভুত ব্যাপার! কেউ না কেউ মায়ের শাড়ি দান করেন। অনেক আগে থেকেই কোন অমাবস্যায় দেবী কোন শাড়ি পরবেন, তা নির্দিষ্ট থাকে। অমাবস্যা এলেই মরা মানুষের করোটি মা রাজবল্লভীর হাতে রাখা হয়। সেই মাথার খুলিই দেবীর পানপাত্র হয়ে ওঠে। যাতে সুরা ঢালা হয়।
মায়ের এই রূপ চমৎকার। মহামায়া রূপে মা শোভাবাজারে প্রতিষ্ঠিতা। অনুমান, গঙ্গার তীরের এই জনপদ জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। চিৎপুর থেকে কালীঘাট যাওয়ার পথ ডাকাতের হুঙ্কারে কেঁপে উঠত। এমনই কোনও এক ডাকাত দেবী রাজবল্লভীর পুজো করে ডাকাতিতে বের হতো। ডাকাত সর্দার পূজিত শ্বেতকালী রাজবল্লভী কেবলই গাছের আড়ালে গঙ্গার পূর্ব পাড়ে নিত্য রুদ্ররসে পূজিত হতেন। এখন শোভাবাজারের অরণ্যভূমি নেই। এখন ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে মানব বসবাসের ক্ষেত্র। মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে এবং ধর্মের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ডাকাতরা উধাও হয়েছে। কিন্তু দেবী রাজবল্লভী এই শোভাবাজারেই থেকে গিয়েছেন। আর তিন বছর পরেই ৩০০ বছর বয়স হবে এই দেবীর। গাছের তলায় কোনও বেদীতে থেকে আকুল ভক্তের ডাকে দেবী হয়তো সাড়া দিতেন। তারপর ভক্তদের ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায় দেবী জনগণের কাছে প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছেন। দেবী রাজবল্লভীর বীজমন্ত্র হল ‘ওঁ ঐং হ্রীং ক্রীং ক্লীং।’
রাজবল্লভী দেবীকে প্রণাম করা হয় ‘সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে’ অথবা ‘কালী কালী মহাকালী কালিকে’ ইত্যাদি মন্ত্রে। রাজবল্লভী মূর্তির বাঁদিকে বস্ত্রহীন যে শিব রয়েছেন তিনি বটুকভৈরব। শিবমন্ত্রেই ভৈরব ও মহাকালের পুজো হয়। কালীপুজোর সময় হোম হয়। নরনারায়ণ সেবার ব্যবস্থাও থাকে। প্রায় কুড়ি বছরের কাছাকাছি পশুবলি বন্ধ। মন্দিরের হাড়িকাঠ অত্যন্ত যত্নে রাখা আছে। কালীপুজো অর্থাৎ কার্তিকী অমাবস্যায় পাঁচটি গোটা ফল বলি দেওয়ার রীতি এখনও চলে আসছে। দেবী রাজবল্লভীর স্থানে দু’টি ঘট আছে। একটি দেবী রাজবল্লভীর, অন্যটি মঙ্গলচণ্ডীর। রাজবল্লভীর ঘট প্রতিষ্ঠিত। স্থায়ীভাবে ভূমির সঙ্গে লগ্ন হয়ে আছে। তোলা যায় না। তাই ঘটে জল কমে গেলে আবার জল ঢেলে তা পূর্ণ করা হয়। প্রত্যেক অমাবস্যায় ঘটের ডাব, পঞ্চপল্লব, মায়ের গায়ের বস্ত্র পরিবর্তন হয়। রাজবল্লভী মন্দিরে দুর্গা, নারায়ণ, রাধা-কৃষ্ণ, গোপাল, শেরওয়ালি, সাঁইবাবা, বজরংবলী, জগন্নাথ, লক্ষ্মী আছেন। রাজবল্লভী মন্দিরের ঠিক বিপরীতে যে দোতলা গৃহটি রয়েছে ওখানে রাজরাজেশ্বর জিউ আছেন। বাংলাদেশের বালিয়াটি অঞ্চলের জমিদার এপার বাংলায় শোভাবাজারে এসে এই বাড়িতে রাজরাজেশ্বরীর প্রতিষ্ঠা করেন। এই বাড়ির নীচে প্রায় একটি কক্ষে স্থানীয় সাহাদের পুঁটে কালী রয়েছেন। একটি প্রস্তর ফলকে লেখা—‘স্বর্গীয় বনমালী সাহা তস্য পুত্র শ্রী জগদ্দুর্লভ সাহা সাং হাটখোলা।’
দুই
ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে কাজিডাঙার মোড়ের কাছেই ডানদিকে রাস্তার ওপর দেবী রাজবল্লভী দেবীর মন্দির। দেবীর গাত্রবর্ণ সাদা। দ্বিভুজা। ডান হাতে বল্লম ও বাম হাতে পদ্ম নিয়ে দেবী সিংহাসনে দাঁড়িয়ে আছেন। বল্লম ও পদ্ম— দুটোই রুপোর তৈরি। আমরা যেমন কালীর রূপ দেখতে অভ্যস্ত, তার থেকে রাজবল্লভীর রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেবীর জিভ বের করা নেই। মুখটিতে লক্ষ্মীশ্রী গড়ন। শুধু দেবীর মুখ দেখলে মা লক্ষ্মী বলে ভ্রম হতে পারে। জানা যায়, বর্ধমানের মহারাজা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সম্ভবত কাছেই সরস্বতী নদী থেকে রাজবল্লভ নামে এক জেলে দেবীমূর্তি উদ্ধার করেন। সেই থেকে দেবীর নাম রাজবল্লভী। দেবী মোটেই ভয়ানক নন। একেবারে শান্ত, সমাহিত মূর্তি। দেবীর পদতলে দুই শিবের অবস্থান। একজন মহাদেব, অন্যজন মহাকাল। মন্দির খোলে সকাল দশটা-সাড়ে দশটার মধ্যে। আর বেলা বারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় মন্দির খোলে। সন্ধ্যারতির পর সাড়ে সাতটায় মন্দির বন্ধ হয়ে যায়। বহু আগে বলিদান হতো। কিন্তু পরবর্তীকালে বলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
একদা দেবী রাজবল্লভীর মূর্তি ছিল মাটির। পরে রামনারায়ণ সরকারের প্রচেষ্টায় বিশিষ্ট শিল্পী দিয়ে ঢালাইয়ের মূর্তি নির্মাণ করা হয়। মূর্তি অপরূপা।
দেবী রাজবল্লভীর গর্ভগৃহে রয়েছেন ষষ্ঠী, শীতলা, মঙ্গলচণ্ডী, কালীর ঘট।
একদা এই অঞ্চল ছিল ঘন অরণ্যাবৃত। লোকে বলে, প্রথমে খড়ের চাল করে মন্দির হয়। পরবর্তীকালে রাজবল্লভী দেবীর মন্দির নতুন করে প্রতিষ্ঠা হয়। বৈশাখী পূর্ণিমার দিন মায়ের মন্দিরে উৎসব হয়। আর মন্দির উৎসবের চেহারা নেয় দীপান্বিতা অমাবস্যায়। দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়। অন্ন, ভাজা, চাটনি, পায়েস, মিষ্টি ইত্যাদি সাজিয়ে দেবীর ভোগদান পর্ব চলে। আর নৈবেদ্যে থাকে ফল, মিষ্টান্ন। পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করেন— ‘সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে শরণ্যে ত্রম্বকে গৌরী নারায়ণী নমোহস্তুতে। সর্বদেবতাভ্যং সর্বদেবীভ্যং নমঃ এষ সচন্দন গন্ধপুষ্প রাজবল্লভী নমঃ।’
তিন
সুলতান মহম্মদ ঘোরি তখন দিল্লির শাসক। আর ভুরসুট পরগনার রাজা ছিলেন শনি ভাঙ্গড়। শনি ভাঙ্গড়ের পর টানা ৪০ বছর সিংহাসনে রাজত্ব করেছেন চতুরানন। তাঁর জামাই রাজা সদানন্দ ভুরসুট পরগনার দায়িত্ব পেলেন। তিনিই মা রাজবল্লভী দেবীর প্রতিষ্ঠাতা। দেবী রাজবল্লভীর নাম থেকেই প্রথমে রাজবল্লভীহাট, তারপর কালক্রমে গ্রামের নাম হয়ে ওঠে রাজবলহাট। হাওড়া-তারকেশ্বর ট্রেন লাইনে হরিপাল একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন। স্টেশন থেকে বাসে, ট্রেকারে, টোটোয় চেপে রাজবলহাট যাওয়া যায়। একেবারে দেবী রাজবল্লভীর দ্বার পর্যন্ত, মন্দিরের সামনে পর্যন্ত যাওয়া যায়।
বেশ সুন্দর গ্রাম্য পরিবেশ। চারদিকে গাছের সবুজ। মন্দিরে ঢোকার মুখেই একটি নহবতখানা আছে। এই নহবতখানা পেরিয়েই মন্দিরের চত্বরে প্রবেশ করতে হয়। বিশাল চত্বর। বটগাছকে আশ্রয় করে অনেক ভক্ত বিশ্রাম নিচ্ছেন। একটি পবিত্র পুকুর রয়েছে। এই পুকুরে অনেক ভক্ত মানুষ স্নান করেন। শোনা যায়, যদি পরপর তিনদিন এই পুকুরে ভক্তরা স্নান করেন তাহলে রোগ ব্যাধি থেকে তাঁরা মুক্ত হন। ফলে রোগমুক্তির তাড়নায় প্রচুর মানুষ এই পুকুরে স্নান করেন।
সারা পশ্চিমবঙ্গে এমন শ্বেতকালী প্রায় দুর্লভ। আগেই বলেছি, কলকাতা শোভাবাজারের রাজবল্লভী, ব্যান্ডেলের কাজিডাঙায় রাজবল্লভী এবং রাজবলহাটের রাজবল্লভী দেবী ভক্তি এবং ভক্তের দৃষ্টিতে একই সুরে বাঁধা। রাজবলহাটের দেবী রাজবল্লভী এবং ব্যান্ডেলের রাজবল্লভী দুই বোন। এই প্রচার দীর্ঘকাল যাবৎ এই অঞ্চলে চলে আসছে।
দেবীর রূপ যেন শরৎকালীন জ্যোৎস্নার আলোর মতো উজ্জ্বল। গায়ের রং ধবধবে সাদা। অনেকেই তাই বলেন শ্বেতকালী। মাথায় অপূর্ব সুন্দর মুকুট। ত্রিনয়না দেবী, দ্বিভুজা। দেবীর ডান হাতে একটি তীক্ষ্ণ ছুরি। নিম্নমুখী। আর সামনের দিকে প্রসারিত বামহাতে রয়েছে মধুপাত্র। কেউ কেউ বলেন, রুধির-পাত্র। দেবী তাঁর ভুবনভোলানো হাসি এবং আনন্দে ভরা যে সুন্দর চোখে তাকিয়ে আছেন ভক্তের দিকে, সেই চোখে রয়েছে অভয়াশক্তি। পায়ের কাছে শুয়ে আছেন দেব কালভৈরব। কালভৈরবের বুকের মাঝখানে দেবীর ডান পা এবং বাঁ পা রয়েছে বসে থাকা সুদর্শন বিরূপাক্ষের মাথার ওপর। এই তিন শ্বেতকালীর রূপেও একটা অদ্ভুত সাদৃশ্য লক্ষ করলাম।
রাজবলহাটে রাজবল্লভী দেবীর মূর্তি গঙ্গামাটি দ্বারা নির্মিত। বারো বা চোদ্দো বছর অন্তর দেবীর নবকলেবর হয়। সেই পবিত্র অনুষ্ঠানটি হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়। দুর্গাপুজোর সময় দেবী রাজবল্লভী দুর্গার রূপ ধারণ করেন। দুর্গাপুজোর যা নিয়মবিধি সব মেনে চলা হয়। কলাবউকে নিয়ে আসা হয়।
দেবী-মন্দিরের সামনে যে পুকুর সেখানে একটি স্থান আছে, যেখানে দুর্গাপুজোর নবমীতে মহিষবলির পর কাটা দেহটিকে ফেলে দেওয়া হয়। সেই দেহাংশ কবর দেওয়া হয়। গল্পকথা, রাজা সদানন্দ রায় একদিন তপস্যায় বসেছেন। সেই সময় রাজা দেবীর অলৌকিক দর্শন পান। দেবী রাজবল্লভীর নির্দেশ, মন্দির নির্মাণ করতে হবে। আর দেবীর পুজোর ব্যবস্থা করতে হবে। রাজা দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। এই অঞ্চল তখন ঘন অরণ্যাবৃত ছিল। সেই ঘন জঙ্গল রাজার নির্দেশে পরিষ্কার করা হয়। তারপর এখানে দেবী রাজবল্লভীর মন্দিরসহ নাটমন্দির, নহবতখানা, শিবমন্দির, রন্ধনশালা তৈরি করা হয়। এ এক আজব পৃথিবী। যেখানে কিছুই স্থায়ী নয়। সদানন্দ রায় নির্মিত রাজবল্লভী মন্দিরসহ নহবতখানা, শিবমন্দির কিছুই একসময় রইল না। কালের প্রবাহে সব নষ্ট হয়ে গেল। অনেক পরে রাজা রুদ্রনারায়ণ নতুন করে এই মন্দির নির্মাণ করে দেন। ১৩৪০ বঙ্গাব্দে মন্দিরের সংস্কার হয় স্থানীয় ব্যক্তিদের আর্থিক দানে। ১৩৪৬ বঙ্গাব্দে নাটমন্দির এবং ওই বছরেই ৪ আষাঢ় নহবতখানা তৈরি হয়। সবই স্থানীয় সম্পন্ন মানুষ এবং ভক্তবৃন্দ নির্মাণ করে দিলেন।
১৯৬৮ সালে অশোক মিত্র ‘পশ্চিমবঙ্গের পূজাপার্বণ ও মেলা’ গ্রন্থটি লেখেন। বইটি থেকে জানা যায়, সেই সময় হাওড়া-আমতা মার্টিন রেল ছিল। সেই রেলপথে একটি স্টেশন ছিল, তার নাম আঁটপুর। এই আঁটপুর থেকে রাজবলহাটে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। তখন রাজবল্লভী দেবীর মন্দির ছিল একটি সাধারণ বাড়ির মতো। তার সামনে ছিল প্রাঙ্গণ। যা প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। বিস্তৃত মন্দিরের প্রবেশপথে নহবতখানা ছিল। সেখানে রোজ ভোর ও সন্ধ্যায় সানাই বাজিয়ে সুরের মূর্ছনা সৃষ্টি করা হতো। রাজবল্লভী মন্দিরের নিজস্ব একটি জলঘড়ি আছে যা দেখে দুর্গাপুজোর সময় নির্ধারণ করা হতো। এখনও তাই হয়। মন্দিরের প্রাঙ্গণে দু’টি শিবমন্দির ছিল। রাজবল্লভী মন্দিরের সামনে নাটমন্দিরের কাছে বুড়াশিবের আলাদা মন্দির ছিল। প্রতি বছর চৈত্র মাসে বুড়াশিব মন্দিরে গাজন এবং চড়ক উৎসব অনুষ্ঠিত হতো।
দেবী রাজবল্লভীর মন্দির চত্বরে চারটি শিবমন্দির আছে। প্রত্যেক শিবের আলাদা আলাদা নাম। বাণেশ্বর, ত্র্যম্বকেশ্বর, সোমেশ্বর, রাজরাজেশ্বর ও নন্দীশ্বর। রাজরাজেশ্বর ও নন্দীশ্বর এক মন্দিরে অবস্থান করছেন। দেবী রাজবল্লভী কীভাবে রাজবলহাটে তাঁর নিজস্ব স্থায়ী জায়গা তৈরি করে নিলেন, এ নিয়ে জনশ্রুতি আছে। এক বৃদ্ধ মালাকারের বাড়িতে অচেনা অজানা এক সুন্দরী মেয়ে এসে উপস্থিত। বৃদ্ধ মালাকার প্রথমে জানতে চেষ্টা করেন মেয়েটির বাবা-মা ও ঠিকানার সন্ধান। কিছুই না পেয়ে মালাকার নিজের বাড়িতেই বালিকাকে লালন করতে থাকেন। মেয়েটি বড় হয়। একসময় কাছাকাছি কংসাবতী নদী দিয়ে ধনী সদাগর সপ্তডিঙা সাজিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই বালিকাটি নদীতীরে গিয়ে নাচগানের আকর্ষণে মাঝিদের বলেন নৌকা থামাতে। নৌকা থামে। কিন্তু বালিকার কথায় নয়। সদাগর বালিকাটির রূপের আকর্ষণে ওই বালিকাকে অপহরণ করার জন্য নৌকা থামান। নির্দেশ দেন, বালিকাকে নৌকায় তুলতে। অবাক কাণ্ড! বালিকাটি পা ঠেকানো মাত্রই ছ’টি নৌকো নদীতে ডুবে যায়। সদাগর তখন দৈববাণী পান। তিনি জানতে পারেন, যে বালিকার পদস্পর্শে ছয়টি নৌকা ডুবে গেছে তিনি হচ্ছেন দেবী ভগবতী। সপ্তম নৌকায় পা দিতে যাওয়ার সময় সদাগর স্বয়ং দেবীর কাছে ক্ষমা চান। প্রাণভিক্ষা করেন। তাঁর অনুনয়, বিনয়ে সন্তুষ্ট হয়ে বালিকা ওই স্থানে দেবীর মন্দির নির্মাণ ও পুজোর আয়োজন করার নির্দেশ দিয়ে অদৃশ্য হন। ধীরে ধীরে দেখা যায়, সদাগরের ডুবে যাওয়া ছয়টি নৌকো দেবীর কৃপায় জলে ভেসে উঠল। দেরি না করে সদাগর দৈব নির্দেশ অনুযায়ী রাজবল্লভী দেবীর পূজার্চনার বন্দোবস্ত করতে শুরু করেন। তারপর একদিন পুজো শুরু হয়ে যায়। এইভাবেই রাজবলহাট গ্রামে রাজবল্লভী দেবীর পুজোর প্রচলন হয় ১২৪২ খ্রিস্টাব্দে।