সোমা চক্রবর্তী: গাছ প্রকৃতির রক্ষাকবচ। অক্সিজেনের জোগান থেকে শুরু করে বৃষ্টিপাত ও ভূমিক্ষয় রোধ সহ আরও কত ভাবেই প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে গাছ। কিন্তু এমন গাছও আছে, যে গাছ নিজেই একটা মস্ত জলাধার। এই গাছ তার কাণ্ডের মধ্যে জমিয়ে রাখতে পারে ১ লক্ষ ২০ হাজার লিটার পর্যন্ত জল। শুনতে ভারী আশ্চর্য লাগলেও এটাই সত্যি। একটা সুইমিং পুল বা তার থেকেও বেশি জল ধারণের ক্ষমতা রাখে গাছটি। প্রখর গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন মাটি জলশূন্য হয়ে যায়, বৃষ্টির দেখা মেলে না, সেই সময় এই গাছ একটা গ্রামের সকল মানুষ সহ পশু-পাখি-জীবজন্তুদের জলের জোগান দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
গাছটি অ্যাডানসোনিয়া গোত্রের। প্রচলিত নাম বাওবাব। মাদাগাস্কার ও আফ্রিকায় এর দেখা মেলে। শুষ্ক মরু অঞ্চলের এই উদ্ভিদটি প্রায় দুই হাজার বছর পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। বিশাল কাণ্ডে হাজার বলিরেখা, শান্ত গাম্ভীর্য নিয়ে মরু অঞ্চলে দাঁড়িয়ে থাকা বাওবাবকে দেখে বোঝা যায় না যে, তার অভ্যন্তরে রয়েছে অগাধ জলরাশি। আসলে বাওবাবের কাঠ অনেকটা স্পঞ্জের মতো। যা বৃষ্টির মরশুমে জলকে শোষণ করে ছাল ও কাণ্ডের মধ্যে জমিয়ে রাখে। গ্রীষ্মকালে সেই জলকে ব্যবহার করেই বেঁচে থাকে বাওবাব। তবে তার এই বেঁচে থাকা শুধু নিজের জন্য নয়, তার কাণ্ডে ছিদ্র করে জল পান করে মানুষ ও পশু-পাখি।
বাওবাবের আকৃতি বেশ অদ্ভুত। মাটি থেকে কাণ্ডটি সোজা উপরের দিকে উঠে গিয়েছে। একেবারে মাথায় কিছু ডালপালা আর পাতা। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় গোড়া থেকে গাছটিকে উপড়ে নিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে এবং উপরের দিকে ছড়িয়ে আছে তার শিকড়-বাকড় । প্রায় ৭৫ ফুট লম্বা গাছটি বছরের প্রায় নয় মাসই থাকে পত্রহীন। এর ফল সুপার ফ্রুট। পশ্চিমি দেশগুলোতে ভিটামিন সি, আয়রন, ক্যালশিয়াম সমৃদ্ধ পুষ্টিকর বাওবাব ফলের পাউডার বিক্রি হয় চড়া দামে। মরু অঞ্চলের মানুষজন এই গাছের ফল খান, এর পাতা থেকে বিশেষ এক ধরনের চাটনি তৈরি করেন। এছাড়াও এই গাছের পাতা থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধও তৈরি করা হয়। গাছের গুঁড়িটি এতই বিশাল যে এর ভেতরে মানুষ ঘরের মতোই বসবাস করতে পারে। মরু ঝড়ের প্রকোপ থেকে বাঁচতে বাওবাবের কাণ্ডের গর্তেই আশ্রয় নেয় স্থানীয় অধিবাসীরা। গাছের ছাল থেকে তৈরি হয় দড়ি, কাপড়, নৌকা। এককথায় বাওবাব হল ‘ট্রি অব লাইফ’। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই ‘ট্রি অব লাইফ’-এর জীবনই আজ বিপন্ন। প্রকৃতির পরিবর্তন, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে অনেক অঞ্চলেই বেশ কিছু বাওবাব গাছের মৃত্যু ঘটেছে।
সবুজ প্রকৃতির আরও এক বিস্ময় এম্বাউবা গাছ। দক্ষিণ আমেরিকার গভীর জঙ্গলের সেক্রোপিয়া গোত্রের এই গাছটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিটার। ফাঁপা কাণ্ড ও বিশাল হাতের মতো বিভক্ত পাতাগুলো গাছটিকে এক বিশেষ বৈচিত্র্য প্রদান করেছে। স্থানীয় মানুষদের কাছে গাছটি ‘বৃষ্টির ডাক’ নামে পরিচিত। হ্যাঁ, এ কথা সত্যি যে, গাছটি নিজেই বৃষ্টি নামায়। এক বিশেষ জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই বিস্ময়কর কাজটি সম্পন্ন হয়। এম্বাউবার শিকড় মাটির গভীর থেকে প্রচুর পরিমাণে জল শোষণ করে ও বিশাল পাতাগুলোর মাধ্যমে প্রচুর জলীয় বাষ্প বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় প্রস্বেদন। এর ফলে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ এতটাই বেড়ে যায় যে, সেই জলীয় বাষ্প থেকে মেঘ ঘনীভূত হয় ও বৃষ্টি নামে। যখন বৃষ্টিপাত হয় না, শুষ্ক প্রকৃতির বুকে এম্বাউবার বৃষ্টিপাত প্রাণের স্পর্শ নিয়ে আসে। এই গাছের ফাঁপা কাণ্ড পোকামাকড় ও পিঁপড়েদের আবাসস্থল। এভাবেই এম্বাউবা নীরবে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে।
চলতি মাসের ৫ তারিখ পালিত হল পরিবেশ দিবস। প্রতিবছরই আমরা এই দিনটি পালন করি ছোট ছোট চারাগাছ রোপণ ও নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমাদের এই একটি দিনের কর্মকাণ্ড কি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পক্ষে যথেষ্ট? গাছেদের কাছ থেকে আমরা কি এই শিক্ষাটুকু নিতে পারি না যে, কীভাবে প্রতিদিন নীরব কর্মযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে পরিবেশকে বাঁচাতে হয়! ভাববার সময় এসেছে।