ভাড়াটের সঙ্গে বিবাদ মেটাতে বাড়িওয়ালা কী কী আইনি সাহায্য পাবেন? পরামর্শ দিলেন আইনজীবী মিন্টু চক্রবর্তী।
ভাড়াটের সঙ্গে বিবাদ মেটাতে বাড়িওয়ালা কী কী আইনি সাহায্য পাবেন? পরামর্শ দিলেন আইনজীবী মিন্টু চক্রবর্তী।
বাড়ি নিয়ে বাঙালির আবেগ বরাবর উচ্চ পর্যায়ে। সারা জীবনের সঞ্চয় থেকে একটুকরো আশ্রয় তৈরি হয়। নতুন প্রজন্ম আবার ‘ইনভেস্টমেন্ট’ হিসেবে কিনে ফেলে ফ্ল্যাট। সেই একচিলতে আশ্রয় কখনও আর্থিক প্রয়োজনে ভাড়া দিতে হয়। কখনও বা দূর শহরে থাকার কারণেই ভাড়াটে রাখেন অনেকে। যাতে বাড়িটি একদিকে ব্যবহারও হয়, অন্যদিকে কিছু আর্থিক সংস্থানেরও সুরাহা মেলে। কিন্তু বিপদ অন্যত্র। বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভাড়াটের বিবাদ নতুন নয়। লিখিত চুক্তির বাইরে গেলে আইনের পথ রয়েছে বটে। কিন্তু তা বাড়িওয়ালার জন্য কতটা নিশ্চিন্তির?
বাড়িওয়ালার আশঙ্কা
ভাড়া দেওয়ার আগে প্রথমেই বাড়িওয়ালা ভাবেন, শখের বাড়িটা ভাড়া দিয়ে বিপদে পড়ব না তো? ভাড়াটে ঠিক সময়ে ভাড়া প্রদান করবে তো? নিজের প্রয়োজনে যখন ভাড়া বাড়িটি দরকার পড়বে, তখন ভাড়াটে বাড়ি ছেড়ে দেবে তো? এই সব প্রশ্নে বিব্রত বাড়িওয়ালা এটাও ভাবেন, যদি মামলার প্রয়োজন হয়, তাহলে দেওয়ানি আদালতে কতদিন সময় লাগবে? সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথম জানতে হবে এই ধরনের মামলা কীভাবে এবং কখন করা যায়? প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক, কাকে আপনি ভাড়াটে বলবেন?
ভাড়াটে কে?
আইনজীবী জানালেন, ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল প্রিমাইসি টেন্যান্সি অ্যাক্ট ১৯৯৭’ যাকে বাংলায় বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গ বেআইনি ভাড়াটে আইন— তার সেকশন ২ সাবসেকশন জি-তে কাকে ভাড়াটে বলা হবে, তার সংজ্ঞা দেওয়া রয়েছে। সেকশন ২ সাবসেকশন জি অনুযায়ী, আসল ভাড়াটে মারা গেলে তার সঙ্গে থাকা তার পরিবারবর্গ অর্থাৎ তার স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে এবং তার মৃত ছেলের স্ত্রীকেও ভাড়াটে হিসেবে ধরা হবে। কিন্তু সেকশন ২ জি ডব্লিউ পি টি অ্যাক্ট অনুযায়ী আবাসিক সম্পত্তির (রেসিডেন্সিয়াল প্রপার্টি) ক্ষেত্রে আসল ভাড়াটের স্ত্রী বাদ দিয়ে উল্লিখিত পরিবারের অন্যান্য সদস্য মাত্র পাঁচ বছরের জন্য এই ভাড়াটের অধিকার পাবেন। আর স্ত্রী তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ভাড়াটে হিসেবে এই অধিকার পাবেন। কিন্তু বাণিজ্যিক (নন রেডিডেন্সিয়াল বা কমার্শিয়াল) সম্পত্তির ক্ষেত্রে আসল ভাড়াটের মৃত্যু হলে এরূপ সুবিধে তাঁর উল্লেখিত পরিবারের সদস্য পাবেন না।
বাড়িভাড়ার রকমফের
সেকশন থ্রি সাবসেকশন ই ডব্লিউ পি টি অ্যাক্ট ১৯৯৭ আলোচনা করা হয়েছে, মাসিক ভাড়া আবাসিক সম্পত্তির ক্ষেত্রে ছ’হাজার টাকা বা তার কম হলে এবং তা কলকাতা কর্পোরেশন বা হাওড়া মিউনিসিপাল অঞ্চলের মধ্যে হলে তা ডব্লিউ পি টি অ্যাক্টের আওতায় আসবে। অন্যান্য এলাকাতে তিন হাজার টাকা বা তার কম হলে ডব্লিউ পি টি অ্যাক্টের আওতায় আসবে। বাণিজ্যিক সম্পত্তির ক্ষেত্রে হলে ভাড়ার পরিমাণ দশ হাজার এবং পাঁচ হাজার হলে তা এই আইনের আওতাধীন।
দায়িত্ববোধ
সেকশন ৪ এবং সেকশন ৫ ডব্লিউ পি টি অ্যাক্ট ১৯৯৭-এর আলোচনায় রয়েছে, বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটের দায়িত্ববোধ। বাড়িওয়ালার দায়িত্ব ভাড়াটেকে বাড়ি ভাড়ার রসিদ দেওয়া। পর্যাপ্ত অত্যাবশ্যক পরিবেষার ব্যবস্থা তাকে করে দেওয়া। এবং ভাড়াবাড়ির পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ করা। সেরকমই ভাড়াটের দায়িত্ব চুক্তির প্রত্যেকটা নিয়ম সঠিকভাবে মেনে চলা। যদি দেখা যায়, বাড়িওয়ালা ভাড়া পাওয়ার পর ভাড়ার রসিদ প্রদান করেন না, তাহলে ভাড়াটে বাড়ি ভাড়াটি মানি অর্ডার করে পাঠাতে পারবেন। সেটাও যদি বাড়িওয়ালা নিতে অস্বীকার করেন, তাহলে রেন্ট কন্ট্রোলের কাছে বাড়িওয়ালার নামে ভাড়া দিতে পারেন ভাড়াটে।
নোটিস
এই ধরনের মামলার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হল নোটিস। অর্থাৎ সেকশন ৬ সাবসেকশন ৪ ডব্লিউ পি টি অ্যাক্ট ১৯৯৭ অনুযায়ী, ভাড়াটেকে উচ্ছেদ করতে গেলে বাড়িওয়ালাকে অন্তত এক মাসের নোটিস ভাড়াটেকে দেওয়া বাধ্যতামূলক। সেকশন ৬-এ এও বলা আছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে ভাড়াটেকে উচ্ছেদ করা যেতে পারে। অর্থাৎ ১) বাড়ি ভাড়া সঠিক সময়ে না দেওয়া। ২) ভাড়াটে চুক্তি না মেনে চললে তার বিরুদ্ধে দেওয়ানি আদালতে উচ্ছেদের মামলা করা যেতে পারে।
অন্য আইন
সকল বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটের চুক্তি এক নয়। ফলে এবার দেখে নেওয়া যাক, কারা ডব্লিউ পি টি অ্যাক্ট ১৯৯৭-এর আওতায় থাকবেন না? যেসব ভাড়াটের সঙ্গে বাড়িওয়ালার ১১ মাসের ‘লিভ অ্যান্ড লাইসেন্স’ চুক্তি হবে, যাদের ভাড়া আবাসিক সম্পত্তির ক্ষেত্রে ৬ হাজারের অধিক এবং বাণিজ্যিক সম্পত্তির ক্ষেত্রে ১০ হাজারের অধিক হবে সেক্ষেত্রে তাঁরা ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট ১৮৮২-এর আওতায় থাকবেন। সেক্ষেত্রে বাড়িওয়ালাকে ‘লাইসেন্সর’ এবং ভাড়াটেকে ‘লাইসেন্সি’ বলা হবে এবং ভাড়াকে ‘লাইসেন্স ফি’ হিসেবে ধরা হবে।
নোটিস বাধ্যতামূলক নয়
কোনও কোনও ক্ষেত্রে ভাড়াটে উচ্ছেদের সময় নোটিস দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। আপনার সঙ্গে সেই পরিস্থিতির মিল রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে নিন। সেকশন ১০৬ টি পি অ্যাক্ট অনুযায়ী, ১৫ দিনের নোটিস দেওয়া যেতে পারে। যদিও এই নোটিস দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। লাইসেন্সি নোটিস পাওয়ার পর লাইসেন্স অংশ যদি লাইসেন্সরকে হস্তান্তর না করেন, তখন তাঁকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এবং তার বিরুদ্ধে দেওয়ানি আদালতে উচ্ছেদের মামলা করা যেতে পারে।
রেজিস্ট্রেশন
আইনজীবী এও জানালেন, বর্তমানে উচ্ছেদের মামলা দীর্ঘদিন ধরে চলে না। এই মামলার তাড়াতাড়ি নিষ্পত্তি ঘটে। শুধুমাত্র মামলা করার সময় উল্লিখিত নিয়মগুলি বাড়িওয়ালা বা লাইসেন্সরকে দেখিয়ে নিতে হবে। বর্তমান ক্ষেত্রে বেশিরভাগ জায়গায় এখন লিভ লাইসেন্স চুক্তিই হয়। সেক্ষেত্রে ডব্লিউ পি টি অ্যাক্টের যেসব নিয়মাবলি রয়েছে, সেগুলি প্রযোজ্য নয়। লিভ লাইসেন্স চুক্তির মেয়াদ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১১ মাসের হয়। তারও একটি কারণ রয়েছে। অর্থাৎ ১২ মাস বা তার অধিক কোনও চুক্তি করা হলে সেটা সেকশন ১৭ ডি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী সেটাকে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। সেই রেজিস্ট্রেশন করার থেকে দূরে থাকার জন্যই বেশিরভাগ বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটে ১১ মাসের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য