সমৃদ্ধ দত্ত: উন্নয়নের পাঁচালি নামক একটি গান ও সরকারের উন্নয়ন সংক্রান্ত বিস্তারিত পুস্তিকা প্রকাশের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি তাঁর ভাষণে অনেক কিছু বলেছেন। কিন্তু একটি বাক্য বিরোধীরা মন দিয়ে শুনেছিলেন তো? তিনি বলেছিলেন, বিহারে বিজেপি ১০ হাজার টাকা মহিলাদের এককালীন দিয়ে কৃতিত্ব নিচ্ছে! আর আমরা তো বছরে ১২ হাজার টাকা করে দিই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে! ‘এখনও পর্যন্ত’! মনে রাখবেন যে, এখনও পর্যন্ত ১২ হাজার টাকা! এই যে ‘এখনও পর্যন্ত’ শব্দবন্ধ কেউ মিস করেনি তো? ওই শব্দবন্ধের অর্থ কী? তার মানে কি এই নয় যে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অঙ্ক আবার বাড়তে পারে?
পক্ষান্তরে, ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি আবার বহাল হয়ে গেল। ২৬ হাজার আজ নয় কাল হয়তো এরকমই হবে। এসআইআর হয়ে যাওয়ার পর অনুপ্রবেশ ইশ্যু কি আর থাকবে? কারণ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার জন্যই তো এসআইআর করা হচ্ছে বলে বিজেপি প্রবলভাবে প্রচার করেছে। তাহলে ফেব্রুয়ারি মাসে যখন এসআইআর-এর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে, তারপর তো আর অনুপ্রবেশ ইশ্যুর ঝাঁঝ থাকবে না! তাহলে ২০২৬ সালের ভোটে বিজেপির ইশ্যু কী হবে? এখন থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাস্তায় নেমে পড়েছেন। সভা সমাবেশ করছেন। মিছিল করছেন। কিন্তু যাদের এসব করার কথা, তারা কোথায়? বঙ্গ বিজেপি কিংবা বিরোধীদের থেকে এখনও বঙ্গবাসী জানতেই পারছে না যে, বিরোধীরা তাহলে কোন ইশ্যুকে সামনে রেখে এবার লড়াই করবে!
বিরোধীদের একাংশ রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্ক এবং অপরিণতমনস্ক। ইউটিউব, পোর্টাল, সংবাদমাধ্যম, চ্যানেলে প্যানেল আলোচনার মাধ্যমে তাঁরা বাংলা জয় করতে চান। কিন্তু সূক্ষ্ম রাজনৈতিক জ্ঞান ও কৌশল নেই। তৃণমূল একটি ভোটে জয়ী হলে বিরোধীদের এই অংশটি উচ্চগ্রামে বলে থাকে ভাতাজীবী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নেওয়া ভিখারিদের ভোটে জয়ী হয়েছে তৃণমূল। এই অ্যাপ্রোচ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আত্মহত্যা। কারণ তারা ভুলে যায়, ওইসব ভোটারের কাছেই কিন্তু পরের নির্বাচনে আবার ভোট চাইতে যেতে হবে। সাধারণ ভোটের নিয়ম হল, নিজের একটা ভোটব্যাংক আছে। সেটা অটুট থাকবে। এবার তার সঙ্গে যদি প্রতিপক্ষের ভোটের একাংশ দখল করতে পারা যায়, তাহলেই জয়ী হওয়া সম্ভব হবে। যুগ যুগ ধরে এটাই ভোটে জেতার কৌশল। অর্থাৎ আমার দলের নিশ্চিত ভোট প্লাস আমার প্রতিপক্ষের কিছুটা ভোটব্যাংক টেনে নেওয়া। দুয়ে মিলে জয়।
২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে ২০১৯ সালের তুলনায় বিজেপির ২ শতাংশ নিজের ভোট কমে গিয়েছে। তৃণমূলের বেড়েছে। কেন? বিজেপি একবারও কি আত্মসমীক্ষা করছে, তাদের যে ২ শতাংশ ভোট কমেছে, সেই ভোট তো হিন্দু ভোট! হিন্দু ভোট বিজেপির কমে গেল কেন? এটা তো বিপজ্জনক প্রবণতা বিজেপির কাছে? বিজেপির প্রতি মোহভঙ্গ হয়ে যদি বামেদের ভোট আরও সামান্য অংশও বেড়ে যায়, তাহলে বিজেপির ভরাডুবি নিশ্চিত। সিপিএমকে বরং সাম্প্রতিককালে কিছুটা অন্তত ম্যাচিওরড ও সিরিয়াস রাজনীতি করতে দেখা যাচ্ছে। তবে সিপিএমের ডিএনএর মধ্যে ‘আই নো অল, বাকিরা গোরুগাধা’ টাইপ সিনড্রোমের একটি মনোভাব আছে। সেটি যদি সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা না যায় এখনও, তাহলে শূন্যত্যাগ হবে না।
বাংলার বিজেপি নেতানেত্রীদের সঙ্গে রাহুল গান্ধীর বেশ সাদৃশ্য আছে। এই দু পক্ষই সম্ভবত আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়েন যে, তাঁদের প্রধান প্রতিপক্ষ ঠিক কতটা শক্তিশালী। রাহুল গান্ধীর রাজনীতির গতিপ্রকৃতি দেখে যেমন বোঝার উপায় নেই যে, তিনি ঠিক কোন রাজনৈতিক ইশ্যুর প্রতি সিরিয়াস। সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে কোন রাজনীতি সম্পৃক্ত সেটা তিনি যেন বুঝতেই পারেন না। তাঁকে কে বলে দিয়েছে যে, সাধারণ মানুষের কাছে মুকেশ আম্বানি কিংবা গৌতম আদানিরা একজন খলনায়ক? উচ্চবিত্ত, আপার মিডল ক্লাস, মিডল ক্লাস কিংবা গরিব মানুষ, এঁদের কখনও কেউ দেখেছে যে, তাঁরা ভোট দেন আম্বানি আদানি ইশ্যুতে? বরং আম্বানি, আদানির কোম্পানিতে চাকরি পেতে শহুরে যুবসমাজ উদগ্রীব।
যে কোনও সরকারই শিল্পপতিদের তুষ্ট করে। মোদি সরকারও নিশ্চয়ই করছে। অনৈতিক সুযোগ সুবিধাও পাইয়ে দেয় কোনও কোনও শিল্পমহলকে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে ওটা কীভাবে জীবনযাপনের ইশ্যু হতে পারে? সভা সমাবেশে আম্বানি, আদানিদের প্রবল আক্রমণ করে রাহুল গান্ধী কিংবা কংগ্রেসের পলিটিক্যাল কী মুনাফা হয়েছে? কিছুই নয়। বরং কংগ্রেস যেখানে যেখানে ক্ষমতাসীন সেখানে এই দুই শিল্পপতিকেই তো আহ্বান করা যায় শিল্পস্থাপনে! লাল কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া হয় শিল্পসম্মেলনে।
ঠিক যেমন রাহুল গান্ধী দু-তিন বছর ধরে কাস্ট সেন্সাসের দাবিতে সরব হয়েছিলেন। কাস্ট সেন্সাসের পর অনগ্রসরদের জন্য শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণ ৪৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ কিংবা ৭৫ শতাংশও করে দেওয়া হবে বলে তিনি দাবি তোলেন। তাঁর একবারও মনে হয়নি যে, এই দাবি তুলে তিনি সামগ্রিকভাবে উচ্চবর্ণকে যেমন সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে দিলেন কংগ্রেস থেকে, তেমনই জাতপাতের ঊর্ধ্বে থাকা সব জাতির যুবসমাজও মোটেই পছন্দ করল না। যে বিহারের দিকে তাকিয়ে তিনি এই কাস্ট সেন্সাসের রাজনীতি করেছেন, সেখানে তাঁর দল মুখ থুবড়ে পড়ল কেন? ৬১ আসনে লড়াই করে ৬টি আসনে জয়? এটা কোনও ফলাফল হল? রাহুলের ইশ্যু ছিনতাই করে মোদি সরকার বরং ঘোষণা করে দিয়েছে যে, কাস্ট সেন্সাস হবে। এর ফলে রাহুল গান্ধী ও তাঁর দলের আত্মসন্তোষ হতে পারে যে, রাহুলের পথেই হাঁটতে হল মোদি সরকারকে। কিন্তু কংগ্রেসের কী লাভ হল? অনগ্রসরদের একাংশ ভোট দিয়েছে তেজস্বী যাদবকে। বাকি সিংহভাগ ব্যাকওয়ার্ড কাস্টের ভোট পেয়েছে এনডিএ কাস্ট সমীকরণ। রাহুল গান্ধীর দলকে কাস্ট সেন্সাস কোনও সাফল্য দেয়নি। আর সেক্ষেত্রে তো বিজেপিও বলতে পারে যে, রাহুল গান্ধীকে আগে কোনওদিন দেখা গিয়েছে যে, মন্দিরে মন্দিরে ঘুরছেন? বিজেপির চাপেই হিন্দুত্ব রাজনীতিতে তাঁকেও তো ঢুকতে হয়েছে? কারণ উপায় নেই!
বিজেপি ভোট চুরি করে বলে রাহুল গান্ধী দফায় দফায় বড়ো বড়ো সাংবাদিক সম্মেলন করলেন। মোটরবাইক যাত্রা করলেন গণতন্ত্র রক্ষা করার জন্য বিহারে। অথচ ঠিক বিহারে যখন ভোটপর্ব চলছে, তিনি উধাও! এমনকি যেদিন বিহারের ফলপ্রকাশ হচ্ছে, সেদিন রাহুল গান্ধী বিদেশে চলে গিয়েছেন। তাঁকে এরপর বিহারবাসী কিংবা দেশের অন্য প্রান্তের ভোটাররা কেন সিরিয়াসলি গ্রহণ করবে? মোদির বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতা অসামান্য। তিনি সরকারি অনুষ্ঠানে নানাবিধ তথ্য পরিসংখ্যান বলেন টেলিপ্রম্পটার দেখে দেখে। কিন্তু রাজনৈতিক ভাষণ দেন নিজে থেকেই। তীক্ষ্ণ এবং মেঠো ভাষায়। রাহুল গান্ধী সেই বাগ্মিতা অর্জন করতে ব্যর্থ। আবার রাজ্যে রাজ্যে দলের ঝগড়া মেটাতেও ব্যর্থ। তাঁকে কেউই ভয় পায় না। মোদিকে তাঁর দল রাজ্যে রাজ্যে ভয় পায়। তাঁর একটি অঙ্গুলিহেলনই যথেষ্ট।
২০১৪ সাল থেকে লাগাতার নরেন্দ্র মোদিকে পরাজিত করে চলেছেন কে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন? কারণ সংসদীয় রাজনীতিতে তিনি মোদির মতোই নয়, মোদির থেকেও অনেক বেশিদিন সময় ব্যয় করেছেন। অনেক বেশি অভিজ্ঞ। মোদি রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন সাতের দশকে। কিন্তু এমপি, এমএলএ হননি। মমতা ১৯৮৪ সালেই হয়ে গিয়েছেন এমপি। তাই ভারতীয় রাজনীতির গলিঘুঁজি, ইশ্যু এবং মানুষের পালস তিনি অনেক বেশি বোঝেন।
নরেন্দ্র মোদি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৪ ঘণ্টা এবং ৩৬৫ দিনের রাজনীতিবিদ। শয়নে স্বপনে জাগরণে তাঁদের রাজনীতি। রাহুল গান্ধীর মতোই বাংলার বিরোধী দলগুলির নেতানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া রাজনীতি করতে পারছেন না। তাঁরা লাগাতার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আন্ডারএস্টিমেট করে চলেন। কোনওদিন কোনও ভোটার বুথে প্রবেশ করে এই ভেবে কি ভোট দেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খারাপ কবিতা লেখেন? তাহলে ভোট দেব না! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গভর্নমেন্টকে গরমেন্ট বলেন? তাহলে ভোট দেব না? কিংবা মোদি আদানি আম্বানিদের তুষ্ট করেন? তাহলে ভোট দেব না! এসব কোনও ইশ্যু ভোটে? তাহলে এসব নিয়ে সময় নষ্ট করার কারণ কী?
প্রকৃত সরকার বিরোধী ইশ্যুগুলিকে নিয়ে সারা বছর, সারা মাস, রাস্তায়, সভা সমাবেশে, দেখা যায় না কেন রাহুল গান্ধী কিংবা এরাজ্যে বঙ্গ বিজেপিকে? এসআইআর নিয়ে বিজেপিই বলল যে, এটা করতেই হবে। আবার এখন সেই বঙ্গ বিজেপির আচরণ থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে, তারা এসআইআর নিয়ে নিজেরাই আতঙ্কিত। অর্থাৎ ২ কোটি ৩ কোটি অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার নাম বাদ যাবে বাংলার ভোটার তালিকা থেকে, এই উচ্চকিত প্রচার করা হলেও আদতে সেই অভিমুখে যে যাচ্ছে না এসআইআর, সেটা ক্রমেই স্পষ্ট। বরং বিজেপির নিজের ভোটব্যাংকই তাদের উপর ক্ষুব্ধ।
রাহুল গান্ধীর রাজনীতি এরকম দিশাহীন থাকলে নরেন্দ্র মোদির গদি নিরাপদ। বঙ্গ বিজেপি এরকম দিশাহীন থাকলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুর্সিও নিরাপদ।