মৃণালকান্তি দাস: দুনিয়ার নানা প্রান্তে তরুণদের পদধ্বনি এখন এক নতুন রাজনৈতিক ভাষা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করছে। মাদাগাস্কার থেকে পেরু, মরক্কো থেকে সার্বিয়া, নেপাল থেকে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশ— সব প্রান্তেই ‘জেনারেশন জেড’ প্রজন্মের নেতৃত্বে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। কোথাও তারা প্রতিবাদ করেছে সরকারি ব্ল্যাকআউট ও অর্থনৈতিক সংকটের। কোথাও তারা বিরোধিতা করছে সরকারি সেন্সরশিপ ও দুর্নীতি-স্বজনপোষণের। দ্রব্যমূল্যের অতিরিক্ত দাম, জ্বালানি সংকট, গণতন্ত্রের অভাব তাদের লড়াইয়ের ইস্যু হয়ে উঠছে। তারা রাজনৈতিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। স্লোগান উঠছে ‘আমাদের ভবিষ্যৎ আমাদেরই’। সম্প্রতি তার সাক্ষী থাকল ভারতও।
নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান! পুলিশের লাঠি, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস। ভয়, রাগ। আর তার পাশেই ব্যঙ্গ, ইয়ার্কি, ফাজলামি। প্রতিবাদের চেনা ছবির আড়াল থেকে উঁকি মারে অচেনা এক ভাষা। হেসে, হাসিয়ে, ব্যঙ্গ করে, দেওয়ালে ছবি এঁকে বিক্ষোভে শামিল হচ্ছে নয়া প্রজন্ম। জেন জি-র হাত ধরে রাস্তা দেখছে প্রতিবাদের নতুন প্রজন্ম। গত কয়েক দিনে এমনই বৈচিত্রে ভরা লড়াইয়ের সাক্ষী থেকে ছিল দিল্লির যন্তর মন্তর। মূলত নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে আন্দোলন চললেও নানা মত, নানা পথ জুড়ে গিয়েছিল তার সঙ্গে। সবাই কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। কারও কাছে সেই প্রতিষ্ঠান সরকার, কারও কাছে স্কুল। কারও মুখে পড়াশোনার চাপ, কারও মুখে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি বা ই-২০ পেট্রল নিয়ে বিতর্ক। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সাফল্যের পর সমাজমাধ্যমে নতুন একটি পেজ তৈরি হয়ে
গিয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ই-২০ জনতা পার্টি’। দাবি, ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি বয়কটের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পরিবহণমন্ত্রী নীতিন গাদকারির ইস্তফা। আরও এক নতুন ইস্যু...।
ডিজিটাল বিস্ফোরণের যুগে দাঁড়িয়ে জেনারেশন জেড ঠিক কোন পথে চলেছে, তা নিয়ে একটা চালু ধারণা রয়েছে। সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে মগ্ন, নিজেদের আশপাশটা সম্পর্কে অসচেতন, দায়িত্বজ্ঞানহীন, অধৈর্য, স্বার্থপর... ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এর সব ক’টাই কি সত্যি? জেনারেশন জেড স্পষ্টবাদী, এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই কারও। সেই স্পষ্টবাদিতা, সত্যকথন অনেক সময়েই অপ্রিয় করে তোলে তাদের, এ-ও ঘটনা। রাখঢাক করে কথা না বলা, প্রচলিতকে প্রশ্ন করা, প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করা— এ সবই জেন জির বৈশিষ্ট্য। আর একটা শিক্ষণীয় গুণ, নিজেদের বিপন্নতা না লুকোনো। অন্যের কটাক্ষে পাত্তা নয়, সঙ্গীর খোঁজে না গিয়ে নিজেতেই মগ্ন এই নতুন প্রজন্ম।
তারা কেবল কথার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় না, তারা সমস্যার আসল সমাধান দেখতে চায়। এই প্রজন্ম সমাজ, দেশ এবং বিশ্বের পরিবর্তন আনতে উদ্বিগ্ন, সোচ্চার এবং সক্রিয়। সর্বোপরি তারা বিশ্বাসী ‘আমি’র শক্তিতে এবং তারা বিশ্বাসী ‘এখন’-এর শক্তিতে। এই বিশ্বাসই মূল পার্থক্য গড়ে দেয়। তারা বিশ্বাস করে, পরিবর্তন শুরু হয় ‘আমি’ থেকে। আর এভাবেই সবাই নিজের নিজের জায়গা থেকে আনতে পারে সম্মিলিত পরিবর্তন। সব সময় ইন্টারনেটে থাকা বা কিছু এখনই করতে চাওয়ার তাড়না কিন্তু তাদের কিছু চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি করে। তারা ক্রমাগত পুরানো কথা শুনতে আর ইচ্ছুক নয়, তারা চায় নতুন এবং বাস্তব কিছু। তারা অবিলম্বে পরিবর্তন চায়, সাফল্যের সংজ্ঞা তাদের কাছে ভিন্ন। তারা তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চায়। তাদের কাছে অনলাইন–জীবন কখনো বাস্তবের চেয়েও বেশি বাস্তব। তাই তারা ইন্টারনেট ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মের উপর চড়ে বিপ্লবী আন্দোলনের কথা চিন্তা করতে পারে। ক্ষমতাধর বা পাওয়ার ফিগারের সঙ্গে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।
এ কথা ঠিক, জেন জি আন্দোলন এখনও কোনো একক ‘আন্তর্জাতিক সংগঠন’ হয়ে উঠতে পারেনি, বরং ‘গ্লোবাল কনভারসেশন’। যেখানে সর্বত্র তরুণ প্রজন্ম আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন, গণতন্ত্র কেবল ভোটের চক্রের নাম নয়। গণতন্ত্র হল প্রতিদিনের কণ্ঠ, প্রতিদিনের আলোচনার পরিসর। এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রজন্মের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল ‘কানেকটিভ অ্যাকশন’। তারা বিশেষ কোনো প্রথাগত আদর্শগত বা সংগঠনগত জায়গা থেকে নয়, বরং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নেটওয়ার্ক নোড ও প্রতীকের মাধ্যমে নিজেরা একত্র হচ্ছে ও সমাবেশ করছে। তারা সবাই নেতা— এমন একটা অবস্থান থেকে নিজেদের রাজনীতি জানান দিচ্ছে। উদার গণতন্ত্র হোক বা অগণতান্ত্রিক দেশ হোক, দুই ক্ষেত্রেই তরুণ প্রজন্ম মনে করছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ কম। তারা আরও বেশি সুযোগ চায়। গোটা দুনিয়ায় তাদের প্রতিবাদের ইস্যু দুর্নীতি, অপশাসন, দৈনন্দিন ব্যয়ে অতিরিক্ত বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাশা।
একইসঙ্গে চোখে পড়েছে ভাষা আর শব্দের অজস্র নতুন নতুন বাঁকবদল। প্রচলিত শব্দের নতুন ভোকাবুলারি বা শব্দভাণ্ডার, নতুন বানান, রাস্তার কথ্য ভাষা, গালি, স্ল্যাং, তুই তোকারি প্রচুর ব্যবহৃত হয়েছে সাম্প্রতিক আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার মুখে। স্লোগান ও গ্রাফিতিতেও ছিল ভিন্নতা ও নতুনত্ব। বিপ্লবের সময় ভাষার এই বাঁকবদল নতুন কিছু নয়। ইউরোপে শিল্পবিপ্লব আমূল বদলে দিয়েছিল ইংরেজি ভাষাকে। মূলত জার্মান ও লাতিননির্ভর ইংরেজি ভাষা পরিবর্তিত হয়ে নিয়েছিল একেবারেই নতুন এক অ্যাংলো-স্যাংক্সন কথ্য ভাষার আঙ্গিক। আর এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বা ইন্টারনেট ও স্মার্ট প্রযুক্তি এই প্রজন্মের ভাষা একেবারেই পালটে দিয়েছে।
এখন পপ সংস্কৃতির নানা চরিত্র বা প্রতীক ব্যবহার করছেন প্রতিবাদীরা, তাঁরা যে একটা লক্ষ্যে বিশ্বাসী, একই মূল্যবোধে বিশ্বাসী, তা বোঝাতে। দক্ষিণপন্থীদের অনলাইন মিম থেকে ‘পেপে’ ব্যাঙ গ্রহণ করেছিলেন ২০১৯ সালে হংকং-এর গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনকারীরা। চিলি এবং বেইরুটে বিক্ষোভ প্রদর্শনকারীরা হলিউড ছবির ‘জোকার’-এর মুখোশ পরেছিলেন, দুর্নীতি এবং অসাম্যের বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান যাতে চটজলদি বোঝা যায়। আর আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্ম ব্যবহার করেছেন ‘ককরোচ’। এই প্রতীকগুলি সহজে চেনা যায়, গ্রহণ করা যায়, রাষ্ট্রের নিপীড়নের থেকে বাঁচাও সহজ হয়।
তরুণদের কাছে রাজনীতি আর সংস্কৃতি অবিচ্ছেদ্য। এই ছবিগুলি সহজে রাষ্ট্রের সীমানা পার করে যায়, ক্ষোভ-দুঃখের বার্তা পৌঁছে দিয়ে সকলের সমর্থন সহজে আকর্ষণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে জেন-জি ‘অ্যানিমে’, অর্থাৎ জাপানের অ্যানিমেটেড টিভি শো বা চলচ্চিত্র থেকে এবং অন্যান্য পপ সংস্কৃতি থেকে প্রতীক বেছে নিচ্ছে তাদের সমবেত পরিচিতির স্বাক্ষর রাখতে, তাদের প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা বোঝাতে। সাবেক রীতি মেনে রাজনৈতিক দলের পতাকার নীচে তারা জড়ো হচ্ছে না। কারণ তাদের দৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি নিষ্কর্মা, দুর্নীতিগ্রস্ত। তরুণ প্রজন্মের কাছে যে বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলির সঙ্গে দলগুলির কোনো সংযোগই নেই। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এর ফলে নিজেদের মতামত প্রকাশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ডিজিটাল বিনোদনের উপভোক্তা-সংস্কৃতি। জেন জি-রা জানে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি গোলিয়াথকেই একজন ডেভিডের মুখোমুখি হতে হয়!
সংবাদসংস্থা দ্য প্রিন্ট-এ সাংবাদিক বীর সাংভি লিখেছেন, যন্তর মন্তরে আন্দোলনের শক্তির পিছনে দু’টি কারণ ছিল। প্রথমটি, প্রশ্নপত্র ফাঁস। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি গভীর অসন্তোষ কাজ করছিল, সরকারের দম্ভ। অনেকের মনে হয়েছে, সরকার মনে করছে তাদের হাতে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী আছে বলেই তারা যা খুশি করতে পারে। অনেক দিন ধরে সরকার কঠোর অবস্থানে ছিল। তাদের ধারণা ছিল, লাঠিপেটা করলে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে। কারণ, সরকার গর্ব করে বলে, তারা আন্দোলনে প্রভাবিত হয় না। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, যখন অভিযোগই হয় অহংকারের, তখন তার জবাবে আরও অহংকার দেখানো সবচেয়ে
বড়ো ভুল।
কখনো কখনো একগুঁয়েমির চেয়ে সাধারণ বুদ্ধিই বেশি কার্যকর— এই সহজ পাঠটি সরকার শেষপর্যন্ত শিখেছে...। সরকার অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করতে পারে, সংসদ উপেক্ষা করতে পারে, সংসদ সদস্য কিনে নিতে পারে। কিন্তু প্রতিবাদের শক্তি আলাদা। তা রাস্তায় প্রকাশ পায়, মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। আর শেষপর্যন্ত রাজনীতিবিদদের সেই কণ্ঠ শুনতেই হয়!