সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: গত কয়েক বছর ধরেই একটা অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি। শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ বা নেপাল—জনরোষ এবং আকস্মিক গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন একের পর এক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব। কোনো দেশে যখন কোনো আন্দোলন বা অস্থিরতার জেরে রাতারাতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে বা প্রবল চাপের মুখে কোনো সরকারের সিদ্ধান্ত বদলে যায়, তখনই অন্যান্য কারণগুলি বিশ্লেষণের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে আসে একটি নির্দিষ্ট শব্দবন্ধ—‘ডিপ স্টেট’।
সাধারণভাবে ‘ডিপ স্টেট’ বলতে বোঝায় নির্বাচিত সরকারের বাইরে থাকা এক অদৃশ্য শক্তিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘প্রকাশ্য সরকারের পিছনে থাকে এক অদৃশ্য সরকার, যার জনগণের প্রতি কোনো দায়িত্ব বা আনুগত্য নেই।’ পরবর্তীতে ১৯২৮ সালে পাবলিক রিলেশনসের পথিকৃৎ এডওয়ার্ড বার্নেস তাঁর ‘প্রোপাগান্ডা’ বইতে এবং সিআইএ-র প্রাক্তন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাইক লোফগ্রেন তাঁদের লেখায় দেখিয়েছেন যে—এই শক্তিই পর্দার অন্তরালে থেকে নীতি নির্ধারণ করে। লোফগ্রেনের মতে, ডিপ স্টেট মূলত জাতীয় প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সংস্থা (যেমন সিআইএ, এফবিআই, এমআই৬, কেজিবি নেটওয়ার্ক), অর্থ বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং কর্পোরেট মিডিয়ার এক গোপন-গভীর সম্পর্কের যোগফল।
‘ডিপ স্টেট’ শব্দটির উৎপত্তি নয়ের দশকে। তুরস্কের রাজনীতিতে। সেখানে সামরিক কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থা, আমলা এবং অপরাধ চক্রের মধ্যে একটা জোট তৈরি হয়েছিল। ট্রেভর অ্যারনসন তাঁর ‘দি টেরর ফ্যাক্টরি’ বইতে দেখিয়েছেন, কীভাবে এফবিআই বা সিআইএ-র মতো সংস্থাগুলি কাউন্টার-টেররিজমের নামে আন্তর্জাতিক বাজেট ও ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নিজেই ‘শত্রু’ তৈরি করে। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আর জে রুমেলের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯০০-১৯৮৭ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংঘাত ও যুদ্ধের মাধ্যমে অন্তত ১৬ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়, যার নেপথ্যে ছিল অস্ত্র ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক স্বার্থ।
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে চোখ রাখলে দেখা যাবে, নিজের পছন্দের শাসককে ক্ষমতায় আনতে বা খনিজ সম্পদের অধিকার নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করে রাখতে সরকার উৎখাত ও ‘কালার রেভলিউশন’ (যেমন ২০০৩ সালে জর্জিয়ায় রোজ রেভলিউশন, ২০০৪ সালে ইউক্রেনে অরেঞ্জ রেভলিউশন) ঘটানো ডিপ স্টেটের পুরানো কৌশল। ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ‘কাল্পনিক তথ্য’ ছড়িয়ে ইরাক আক্রমণ এবং ২০১১ সালে
মার্কিন ডলারের বিকল্প মুদ্রা চালুর উদ্যোগ নেওয়ায় লিবিয়ার গদ্দাফিকে উৎখাত করার নেপথ্যে ছিল তেলের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য মার্কিন ডিপ স্টেটের অন্যতম মাস্টারপ্ল্যান। মার্কিন সমাজ ও মনোবিজ্ঞানী ডঃ আরভিং এল
জানিসের মতে, কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য মূল ধারার মিডিয়া, উৎসব ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যবহার করে জনগণের চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ করে দেয় ডিপ স্টেট।
ফিরে আসা যাক দক্ষিণ এশিয়ার কথায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ বা নেপালে যে একের পর এক জনবিক্ষোভের ঢেউ দেখা গিয়েছে, তার নেপথ্যেও ডিপ স্টেটের উপস্থিতি নিয়েও যুক্তি-পালটা যুক্তি উঠেছে। বাংলাদেশের কোটা বিরোধী আন্দোলন বা নেপালের জেন-জি বিক্ষোভ আপাতদৃষ্টিতে সামাজিক ক্ষোভ থেকে শুরু হলেও, অল্প
সময়ের মধ্যে রক্তক্ষয়ী রূপ নেওয়া এবং সরকারের পতনের পিছনে আমেরিকার মতো বিদেশি শক্তির প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সাহায্য ছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করা এবং চীন ও ভারতকে চাপে রাখাই ছিল এই অস্থিরতার মূল লক্ষ্য।
আর এই ধরনের ঘটনায় বারবার উঠে এসেছে হাঙ্গেরীয়-আমেরিকান ধনকুবের জর্জ সোরেস এবং তাঁর ‘ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনস’-এর নাম। সিভিল সোসাইটি বা ‘ওপেন সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠার নামে বিভিন্ন দেশে বিদেশি ফান্ডিং দিয়ে সরকার বিরোধী ন্যারেটিভ তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এমনকি, সোরেস এবং ওসিসিআরপি’র মতো একাধিক আন্তর্জাতিক সংগঠন আর্থিক ও রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির রিপোর্ট প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের উপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে বলেও অভিযোগ করে বিজেপি সরকার। বলা হয়, সোরেসের সঙ্গে কংগ্রেসেরও যোগ রয়েছে। যদিও কংগ্রেস এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে। পালটা জানায়, জাতি-হিংসায় দীর্ণ মণিপুর সংকট, অর্থনৈতিক মন্দা এবং আদানির বিরুদ্ধে মার্কিন বিচার বিভাগের তদন্ত থেকে জনগণের নজর ঘোরাতেই বিজেপি এই ‘সোরেস’ বিতর্ক সামনে নিয়ে আসছে। পদ্মশিবির অবশ্য কংগ্রেসের
জবাবে বিশেষ কান দেয়নি। ২০২৪ সালের শেষ পর্বে ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘মিডিয়াপার্ট’-এর একটি রিপোর্টের সূত্র ধরে বিজেপি দাবি করেছিল, জর্জ সোরোসের ‘ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন’ এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাছ থেকে তহবিল পায়। আরও বলা হয়, বাইডেন সরকারের মার্কিন বিদেশ দপ্তরের ডিপ স্টেটের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ওসিসিআরপি-কে ব্যবহার করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আমেরিকা, চীন বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলির ‘ডিপ স্টেট’ ভারতকে ভিতরে থেকে অস্থির করতে চায়। গুরুপতবন্ত সিং পান্নুনের মতো খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রশ্রয় দেওয়া বা ডেভিড
হেডলি-তাহাউর রানার মতো ২৬/১১-র মাস্টারমাইন্ডদের বিচারে বিলম্ব ঘটানো—এসবের নেপথ্যে মার্কিন ও পাক ডিপ স্টেটের কৌশলগত স্বার্থ কাজ করেছে। যদিও তাঁদের মতে, আমেরিকা সরাসরি ভারতের অর্থনীতি বা বাজারের ক্ষতি করতে চায় না। তাই তারা বাংলাদেশ বা নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে ভারতকে সর্বক্ষণ চাপে রাখতে চায়।
অবশ্য চাইলেই কি সব হয়! ভারতে সরাসরি কোনো অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ‘ডিপ স্টেট’ পরিচালনা করতে পারে না। তার প্রধান কারণ ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। যদিও অনেকের দাবি, ভারতেও সিভিল সার্ভিস, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কর্পোরেট ধনকুবেরদের একটি অদৃশ্য সমন্বয় রয়েছে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড়ো প্রভাব ফেলে।
সেই দাবির স্বপক্ষে প্রমাণ হিসাবে ২০১৪ সালের জুন মাসের একটি গোয়েন্দা রিপোর্টের কথা
উল্লেখ করা হয়। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, গ্রিন পিসের মতো বিদেশি
অর্থপুষ্ট এনজিওগুলি ভারতের কয়লা বা
জ্বালানি প্রকল্প আটকে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি ২-৩% কমিয়ে দিয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য বদলে যাচ্ছে ডিপ স্টেটের ধারণা। বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতি পরিচালনা করবে ‘ভার্চুয়াল ডিপ স্টেট’।
অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপফেক এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে নিমেষের মধ্যে লক্ষ লক্ষ তরুণকে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। যা অতীতের যে কোনো আদর্শভিত্তিক আন্দোলনের চেহারার চেয়ে ভিন্ন। এই বাস্তব চিত্রকে মেনে নিচ্ছেন ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকরাও। তাঁদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি বা পাকিস্তানের পরমাণু হুমকির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ভারতেরও একটি নিজস্ব কাউন্টার-নেটওয়ার্ক গঠন করা প্রয়োজন।
এর জন্য বিদেশি এনজিও ও গোপন আর্থিক তহবিলের উপর নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় তথ্যযুদ্ধে কাউন্টার ন্যারেটিভ আনার জন্য দরকার দেশীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক। আবার দেশের নাগরিকদের তথ্য বিদেশি টেক-জায়ান্টদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন সাইবার ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব।
শেষ পর্বে একটা কথা বলতেই হয়, সমস্ত গণআন্দোলনকেই ‘বিদেশি চক্রান্ত’ বলা যেমন সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা আড়াল করার সহজ পন্থা, তেমনই বিশ্বজুড়ে ‘ডিপ স্টেট’-এর অস্তিত্ব ও তাদের ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্তকে ‘রূপকথার কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দেওয়াও চরম অজ্ঞতার পরিচয়। ক্ষমতার এই অদৃশ্য লড়াইয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা করতে গেলে ভারতকে নাগরিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। সেই সঙ্গে ‘অদৃশ্য’ বিদেশি শক্তির উপরেও তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে।