‘দুর্গা’ শব্দটি বিভিন্ন অর্থের দ্যোতক। যিনি দুর্জ্ঞেয়া, অর্থাৎ যাঁর তত্ত্ব দূরধিগম্য—তিনিই দুর্গা। তিনি কৃপা করে জানালে তবেই তাঁর তত্ত্ব জানা সম্ভব—“তুমি কৃপা কর যারে সে তোমারে জানতে পারে।” শাস্ত্রবচনে আছে:
‘দুর্গা’ শব্দটি বিভিন্ন অর্থের দ্যোতক। যিনি দুর্জ্ঞেয়া, অর্থাৎ যাঁর তত্ত্ব দূরধিগম্য—তিনিই দুর্গা। তিনি কৃপা করে জানালে তবেই তাঁর তত্ত্ব জানা সম্ভব—“তুমি কৃপা কর যারে সে তোমারে জানতে পারে।” শাস্ত্রবচনে আছে:
দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।/ উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মতঃ।।/ রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।/ ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিতঃ।।
—‘দ’ অক্ষরটি দৈত্যনাশক, ‘উ’কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ্’ রোগনাশক, ‘গ’-কার পাপনাশক এবং ‘অ’-কার ভয়-শত্রুনাশক। অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, ভয় ও শত্রু হতে যিনি রক্ষা করেন—তিনিই দুর্গা। আবার যিনি ‘দুর্গ’ নামক অসুরকে নাশ করেন তিনিই নিত্য দুর্গা নামে খ্যাত—‘দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা।’ এই দুর্গাই সমস্ত শক্তির আধার, নিখিল দেবগণের শক্তিসমূহের ঘনীভূত মূর্তি—নিঃশেষদেবগণশক্তিসমূহমূর্ত্যা। তিনি স্নেহময়ী জননী। তাই তাঁর নয়ন থেকে করুণাধারা সতত বর্ষিত হচ্ছে—“মায়ের স্নেহ-চক্ষে প্রেম-বক্ষে অমিয় ঝরে।” যুদ্ধে যখন তিনি অতি ভীষণা তখনও তাঁর আঁখি করুণায় ঢল ঢল। চিত্তে কৃপা সমরনিষ্ঠুরতা—হৃদয়ে মুক্তিপ্রদ কৃপা এবং যুদ্ধে মৃত্যুপ্রদ কঠোরতা, মায়ের মধ্যে এই দুই ভাবের অপূর্ব সমন্বয়।
দেবীর বাহন সিংহ। সিংহ দুর্দান্ত শক্তিশালী পশু, রজোগুণের প্রতীক। লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, রজোগুণের মধ্যে রয়েছে এক প্রচণ্ড শক্তির উচ্ছ্বাস। “সত্ত্বগুণের অনুগত হলে সেই শক্তি লোকস্থিতির সহায়ক হয়ে ওঠে। সর্বসত্ত্বময়ী দেবী মহামায়া অসুরের বিরুদ্ধে রজোগুণের প্রতীক সিংহকে স্বীয় পক্ষে রেখেছেন আপন নিয়ন্ত্রণাধীনে। সিংহ... আসুরিকতা ও পাশবিকতার উচ্ছেদ সাধনপূর্বক দেবীর লোকস্থিতিমূলক পুণ্য কর্মের সহায়কারী।... দেবী দুর্গার মহাপূজা করে মহাশক্তি অর্জন আমাদের পরম কাম্য। কিন্তু সত্ত্বগুণের প্রভূত অনুশীলনের দ্বারা সে মহাশক্তির সদুপযোগও শিক্ষা করা চাই। রজোগুণের প্রতীক সিংহকে আপন বাহনভুক্ত করে সর্বসত্ত্বময়ী দেবী আমাদিগকে সে শিক্ষাই কি দিচ্ছেন না?” এর আর একটি দিকও আছে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আছে পশুশক্তি। পুরুষকার ও সাধন-ভজনের দ্বারা মানুষ যখন যথার্থ মনুষ্যত্বে উপনীত হয় তখন তার পশুভাব কেটে গিয়ে দেবভাব জাগ্রত হয়। আর তখনই সে প্রকৃত শরণাগত হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে, সার্থক জীবনের অধিকারী হয়। দেবীর চরণতলে সিংহ সেই ভাবেরই প্রতীক। দেবীর সম্মুখে বাঁদিকে অসুর। অসুর অর্থাৎ সুরবিরোধী। দৈবশক্তির সঙ্গে আসুরিক শক্তির সংগ্রাম চিরকালের। এই সংগ্রাম বাইরে যেমন অনবরত চলছে, সেরূপ চলছে অন্তরেও, সাধকের সাধনার ক্ষেত্রে। সুতরাং অসুর মানুষের প্রবহমান জীবনের প্রতীক। দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা ও অজ্ঞান—এগুলি আসুরিক সম্পদ।” অপরপক্ষে নির্ভীকতা, শুদ্ধ ব্যবহার, জ্ঞান ও যোগনিষ্ঠা, দান, বাহ্যেন্দ্রিয়ের সংযম, যজ্ঞ, বেদপাঠ, তপস্যা, সরলতা, অহিংসা, সত্য, ক্রোধহীনতা, ত্যাগ, শান্তি, পরদোষ প্রকাশ না করা, জীবে দয়া, লোভরাহিত্য, মৃদুতা, অসৎ চিন্তা ও কর্মে লজ্জা, অচপলতা, তেজ, ক্ষমা, ধৈর্য, বাহ্যাভ্যন্তর শৌচ, দ্বেষশূন্যতা, অনভিমান—এগুলি দৈবী সম্পদ।
স্বামী প্রমেয়ানন্দের ‘পূজা-বিজ্ঞান’ থেকে