Bartaman Logo
২৯ জুলাই, ২০২৬
Advertisement
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গুরু পূর্ণিমার গুরুকথা

‘না হেরিলে ওগো তোমারে/ তমসা ঘনায় চক্ষে’—মহানায়ক উত্তমকুমারের মুখে মহাগায়ক মান্না দে-র কণ্ঠের এই গানের মাধ্যমে গুরুর প্রতি আমরা যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে পারি।

গুরু পূর্ণিমার গুরুকথা
  • ২৯ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ডঃ সায়ন্তন মজুমদার: ‘না হেরিলে ওগো তোমারে/ তমসা ঘনায় চক্ষে’—মহানায়ক উত্তমকুমারের মুখে মহাগায়ক মান্না দে-র কণ্ঠের এই গানের মাধ্যমে গুরুর প্রতি আমরা যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে পারি। তমসো মা জ্যোতির্গময়— প্রতিনিয়ত গুরু আমাদের এই শিক্ষামন্ত্রে দীক্ষিত করেন। কারণ তিনি আমাদের অন্তরের ‘গু’ অর্থাৎ অজ্ঞতাকে ‘রু’ বা বিনাশ করেন।

Advertisement

প্রায় হাজার বছর আগে বঙ্গসাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের প্রথম পদে কবি লুই পা বলেছিলেন, ‘লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ’ মানে গুরুকে জিজ্ঞাসা করে জান। গুরুই পারেন আমাদের সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তরের সন্ধান দিতে। ১২ নং চর্যায় কবি কাহ্ন পা সদগুরুর উপদেশে জগতের লীলা জয় করার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘সদগুরু বোহেঁ জিতেল ভববল’। ভাদে পা ৩৫ নং চর্যার প্রথমেই স্বীকার করেছেন যে এতদিন মোহাবিষ্ট হয়ে শেষে সদগুরুর উপদেশই তাঁর অন্তরের বা চিত্তের স্বরূপ তিনি বুঝতে পেরেছেন। আমাদের এই দেহ একটি নৌকার মতো, সংসারসাগরের তরঙ্গে অগ্রসর হওয়ার জন্য মনকে দাঁড়রূপে ব্যবহার করতে হয়। আর সেই নৌকার সঠিক দিকে চালনার জন্য ৩৮ নং চর্যায় সরহ পা লিখেছেন, ‘সদগুরুবঅণে ধর পতবাল’। বোঝাই যাচ্ছে যে সদগুরুর বচন বা কথাকেই হালরূপে ব্যবহার করতে হবে।
পৌরাণিক মতে, গুরুপূর্ণিমা হল মহাভারতের রচয়িতা মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেবের জন্মদিন। গাত্রবর্ণে তিনি কৃষ্ণ, জন্মভূমি দ্বীপের কারণে দ্বৈপায়ন ও বেদকে চার খণ্ডে ভাগ করেছিলেন বলে তিনি বেদব্যাস। তাঁর মহাকীর্তি মহাভারতের বঙ্গানুবাদক ছিলেন কাশীরাম দাস। মহাভারতের অনুলেখক গণেশবন্দনা দিয়ে শুরু করেই কাশীরাম মূল গ্রন্থ রচয়িতা ব্যাসদেবের বন্দনা করেছিলেন— ‘কিছুমাত্র কোন পাপ না আছে যাঁহার।/ সে ব্যাস-দেবের পদে প্রণাম আমার।।/ ...নমস্কার করি তাঁর চরণ পঙ্কজে।/ পরম আনন্দে কাশীরাম দাস ভজে।।’ কাশীরামের কথায় ব্যাসদেবের চার মুখ, চার হাত, কপালে চাঁদ না থাকলেও তিনি এই ভূমণ্ডলে ত্রিদেব অর্থাৎ ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের সম্মিলিত মূর্তি বলে পরিগণিত হন।
মধ্যযুগীয় কবি কাশীরামের পাশাপাশি মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়ের অন্নদামঙ্গল কাব্যে আমরা ব্যাসদেবকে একটু ভিন্ন রূপে দেখতে পাই। তিনি মনে করেছেন ‘তেজবধ হয় যার প্রাণবধ ভালো তার’। তাই দেবতাদের প্রতিস্পর্ধী হয়ে প্রায় দেবানুগ্রহ ব্যতীত, তিনি দ্বিতীয় কাশী নির্মাণ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু আদি কাশীর মাহাত্ম্য অটুট রাখতে দেবী অন্নপূর্ণার ছলনায় ব্যাসদেবের স্বপ্ন সফল হয়নি —‘ব্যাসবারাণসী হবে ভাবিলাম বসি।/ বাক্যদোষে হইল গর্দভবারাণসী।।’ অর্থাৎ ব্যাসদেব প্রতিষ্ঠিত কাশীতে মৃত্যু হলে গর্দভ হতে হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে 
ব্যাসদেবও অন্নপূর্ণা-বিশ্বনাথের কাশীকে আগে থেকেই অভিশপ্ত করে রেখেছিলেন—‘কাশীবাসী লোকের অক্ষয় হবে পাপ।।’ অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্যাসের মধ্যে আমরা যেন নতুন করে পেলাম দেববিরোধী চাঁদ সওদাগরকে। ভারতচন্দ্রের ইষ্টদেবী অন্নপূর্ণার আচরণের প্রতি ব্যাসের প্রশ্নব্যাণ রায়গুণাকর একদিকে যেমন লিপিবদ্ধ করেছেন, তেমনি অন্যদিকে গ্রন্থকার ভারতচন্দ্র মহাগ্রন্থকার ব্যাসদেবের প্রতি সম্মান জ্ঞাপনে নিজ লেখনীতে কার্পণ্য করেননি— ‘ব্যাস নারায়ণ অংশ ঋষিগণ অবতংস/ যাহা হইতে আঠার পুরাণ।/ ভারত পঞ্চম বেদ নানা মত পরিচ্ছেদ/ বেদভাগ বেদান্ত বাখান।।’
আধুনিক যুগের কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তও গুরুপূর্ণিমার পূজ্য ব্যাসদেব প্রসঙ্গে কলম ধরেছেন। ‘কাশীরাম দাস’ নামক চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেটের প্রথমেই সশ্রদ্ধ চিত্তে তিনি ব্যাসদেবের নাম স্মরণ করেছিলেন। শিবের জটাজালে আবদ্ধ গঙ্গার মতো ‘ভারত-রস ঋষি দ্বৈপায়ন,/ ঢালি সংস্কৃত-হ্রদে রাখিলা তেমতি’।
হিন্দু বা প্রেসিডেন্সি কলেজে মাইকেলের সহপাঠী ছিলেন প্রাবন্ধিক ভূদেব মুখোপাধ্যায়। এই বছর তাঁর জন্মদ্বিশতবর্ষ পূর্তির সূচনা হয়েছে। আবার মতান্তরে তিনি মধু কবির সমবয়সি। তাঁর প্রয়াণের প্রায় কুড়ি বছর পরে ১৯০৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বিবিধ প্রবন্ধ : দ্বিতীয় ভাগ’। এর তৃতীয় অধ্যায়ের নাম ছিল ‘তন্ত্রের কথা’। যার প্রারম্ভিক অনুচ্ছেদের নাম ছিল ‘গুরু’। তন্ত্র মতে, প্রকৃত গুরু বলতে তিনি বুঝিয়েছিলেন সিদ্ধিদাতা, পাপধ্বংসকারী, জগৎ-ব্যাপক ও জগন্ময় শিবকে। তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে প্রাবন্ধিকের মত হল, ‘গুরু’ শব্দের ‘গ’ অক্ষর সর্বসিদ্ধি, ‘র’ পাপধ্বংস ও ‘উ’-কার শবকে প্রতীকায়িত করে।   
উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর বা কলকাতার গোরক্ষনাথ মন্দিরের কথা আমরা অনেকেই জানি। শিবকেন্দ্রিক নাথ ধর্মের বিখ্যাত নাথ ধর্মগুরু ছিলেন গোরক্ষনাথ। নাথ সাহিত্য সৃষ্টির একটি নিদর্শন হল উত্তরবঙ্গে প্রচলিত ‘যুগীকাচ’। এর সংকলক ছিলেন রহিম-উদ্দিন মুনশী। সেখানে ধ্রুবপদের মতো বারবার উচ্চারিত হয়েছে— ‘গুরু যে কহেন কথা শিষ্যরে বুঝায়/ আহা রে ঘণ্টার বাদ্য ঘণ্টায় মিশায়।।’
গুরু পূর্ণিমা তিথিটি বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধিলাভের পরে গৌতম বুদ্ধ এবং জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর প্রথম উপদেশ দান করে গুরুতে পরিণত হয়েছিলেন এই দিনে। সারনাথের মৃগদাবে পঞ্চশিষ্যকে বুদ্ধের উপদেশ প্রদানের ঘটনাটি ধর্মচক্র প্রবর্তন দিবস নামে খ্যাত। শান্তিনিকেতনে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে পালিত হয় প্রতিবছর। ১৯৩৩ সালে ঠিক আজকের দিনটিতে অর্থাৎ ২৯ জুলাই বিশ্বরবি  লিখেছিলেন ‘পরিশেষ’ কাব্যভুক্ত ‘প্রার্থনা’ কবিতা। বুদ্ধের প্রতি তাঁর প্রার্থনা ছিল— ‘যাহাদের ভেঙেছে বিশ্বাস, /তোমারি করুণাবিত্তে ভরুক তাদের সর্বনাশ’। 
রবীন্দ্রসূত্র ধরে ‘গুরু’ নামাঙ্কিত সাহিত্য সৃষ্টির কথায় আসব। রূপক-সাংকেতিক শ্রেণির ‘অচলায়তন’ নাটকটিকে ১৯১৮ সালে রূপান্তরিত নাটক ‘গুরু’ রূপে প্রকাশ করেন গুরুদেব। নাটকটির যবনিকা উত্তোলিত হয়েছে গুরু আসার আশাতীত প্রতীক্ষা মাধ্যমে। আর যবনিকা পতন ঘটেছে নববর্ষের সজল ধারায় সকল পাপ ধৌত করে গুরুর আগমনিতে। যুগব্যাপী প্রতিষ্ঠিত অচলায়তনকে ভেঙে নবরূপে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গুরু এনেছিলেন যুগান্তর। জীর্ণ পুঁথিসর্বস্ব জ্ঞান অপসৃত করে তিনি নিয়ে এসেছিলেন প্রাণ জাগানো হৃদয়ের বাণী। তিনি যেন সর্বভূতে, সর্বদলে বিরাজিত ও বিকশিত এক শতদলপদ্ম। ‘ও অকূলের কুল’ গানে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর পূর্ণ স্বরূপ। তিনি অগতির গতি, অনাথের নাথ, পতিতের পতি, রতনের হার ও পরানের বঁধু। তাঁর অপরূপ রূপ, মনোহর কথাতে আমরা পাই জন্মের সুখ ও মরণের ব্যথা। তাঁর মধ্যেই রয়েছে ভিখারির ধন, অবোলার বোল যুগপৎ জনমের দোলা ও মরণের কোল। তিনি কঠিনদের প্রণত করেন, কোমলদের সঙ্গে খেলা করেন। শিক্ষার সারকথা তাঁর মাধ্যমেই মূর্ত হয়েছে, ‘খোলা জায়গাতেই সব পাপ পালিয়ে যায়’। বহু আগে শিক্ষার লক্ষ্যরূপে সে কথাই বলা হয়েছিল ‘সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে।’ তাই নাট্যান্তে দুয়ারভাঙা সেই জ্যোতির্ময়ের, নবীন আশায় খড়গহস্ত, তিমিরবিদারী সেই উদার অভ্যুদয়ীর, সেই দুঃসহ-নির্দয় ও একইসঙ্গে নির্মল-নির্ভয়, চিত্তমাঝে অরুণবহ্নি জ্বালানো মৃত্যুলোপী গুরুর জয়ধ্বনি অনুরণিত  হয়েছে।
এ যাবৎ আলোচনায় গুরুকেন্দ্রিক সাহিত্য রচনা পুরুষের একচেটিয়া বলে মনে করে নিলে খুব ভুল হবে। সমনামে ‘মাসিক বসুমতী’ পত্রিকায় ১৯৩৭ সালের কার্তিক মাসে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী। সম্পর্কে তিনি গুরুদেবের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা। তাঁর মতে, গুরুদর্শনে আসে পূর্ণ আত্মসমর্পণের নিশ্চিন্ততা। আমাদের চেতনভূমিতে তিনটি প্ল্যাটফর্মে তিনটি চেয়ার দখল করে ত্রিবিধ জ্ঞান প্রদান করেন গুরু—মস্তিষ্কে, হৃদয়ে ও আত্মায়। তাঁর আত্মদর্শনে, গুরু পূর্ণিমার তিথি বিশেষ করে গুরুভাবে ভগবানকে ভাবনার ও পূজার তিথি। পাশাপাশি কাব্যকথাতেও তিনি বলেছেন, ‘শ্রাবণ পূর্ণিমায় এ কি হেরি নূতন বিলাস! / বিশ্ব-আত্মা তুমি গুরুরূপে হইলে প্রকাশ! /...আত্মজ্ঞান উৎস আজি/ হলে জ্ঞানী মানবের দেহে/ জ্ঞান-আলো বিতরিয়ে/ গুরুপূজা নিলে গেহে গেহে!’ গুরুর হৃদয়কে মহাবটবৃক্ষের মতো বলেছেন তিনি। 
গুরু প্রসঙ্গে শুধুমাত্র ভক্তি গদগদ চাটুকারিতাকেই প্রাধান্য দেননি সরলা, গৃহী গুরুর সাধারণ গৃহস্থের মতো লৌকিক ব্যবহার অধিকতর হলে গুরুরূপে ‘অলৌকিকতার বৈদ্যুতীবাহী তারটি একদিন কট্ করে কেটে যেতে পারে’ বলে আশঙ্কাও করেছিলেন। অপ্রাকৃত অশরীরী 
অনুভূতির উপাদানে গুরুকে গড়ে নেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। তোতা পাখির মতো গুরু শব্দজপে বা পথঘাট হতে কুড়িয়ে নিলেই গুরু লাভ হয় না। গুরুকে যে যথেষ্ট আয়াসে অর্জন করে নিতে হয়। গুরুর প্রতি ভগবান সম্ভাষণেরও সমর্থক ছিলেন না। তিনি গুরুকে অনুকরণ না করে অনুসরণ করতে বলেন। শুধুমাত্র গুরুর ভাবকে না ধরে থেকে, তাঁর মধ্যে থাকা সব থেকে কাজের জিনিস তেজকে ধরতে বলেছিলেন তিনি। 
সরলার এই ভাবনা সরল মনে সমাজ হয়তো সব সময় মানেনি বা মানবেও না। কিন্তু গুরুকরণে এ কথা আমাদের যোগ্য দিক নির্দেশিকা হতে পারে। যথার্থ গুরুজি কি জয়!
 লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ