Bartaman Logo
৩০ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নিয়মের নামে শাস্তি!

ই-কেওয়াইসি আজ আর কোনো চমকের বিষয় নয়। সরকারি প্রকল্প থেকে ব্যাংকিং—সর্বত্র প্রায় বাধ্যতামূলক পরিচয় যাচাইয়ের এই পদ্ধতি

নিয়মের নামে শাস্তি!
  • ৩০ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ই-কেওয়াইসি আজ আর কোনো চমকের বিষয় নয়। সরকারি প্রকল্প থেকে ব্যাংকিং—সর্বত্র প্রায় বাধ্যতামূলক পরিচয় যাচাইয়ের এই পদ্ধতি। উদ্দেশ্যও যুক্তিসঙ্গত! ভুয়ো গ্রাহক চিহ্নিত করা, ভরতুকির অপব্যবহার এবং সরকারি অর্থের অপচয় আটকানো তো দরকারই। গত কয়েক বছর ধরে এলপিজি গ্রাহকদেরও তা সম্পূর্ণ করার জন্য বলা হচ্ছে। কিন্তু এবার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নজিরবিহীন। ই-কেওয়াইসি না থাকলে আগামী ১৬ আগস্ট থেকে আর ভরতুকিযুক্ত দামে রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার পাওয়া যাবে না। এতেও চিন্তার কিছু ছিল না। কারণ, সাধারণ গ্রাহক ভরতুকি পান মাত্র ১৯ টাকার কিছু বেশি। কিন্তু না, সংসদে খোদ কেন্দ্র জানিয়েছে, জুন মাসে একটি গৃহস্থালি সিলিন্ডারের প্রকৃত বাজারদর ছিল প্রায় ১,৬৯৫ টাকা। অথচ গ্রাহক তা পাচ্ছেন অনেক কম দামে। সেই ‘গোপন’ ভরতুকিও ই-কেওয়াইসি ছাড়া পাওয়া যাবে না। ফলে সাধারণ গৃহস্থকে ১৬ আগস্ট থেকে ৯৬৮ টাকার বদলে প্রায় ১,৭০০ টাকা কিংবা আরও বেশি দামে কিনতে হবে সিলিন্ডার। উজ্জ্বলা যোজনায় ৩০০ টাকা ভরতুকি পাওয়া প্রান্তিক পরিবারগুলির ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হবে না। অর্থাৎ, একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়ার দায়ে একজন সাধারণ গ্রাহককে গুনতে হবে প্রায় দ্বিগুণ দাম। একে কী বলা যায়? কড়া নিয়ম নাকি শাস্তি? সরকার যাই বলুন না কেন, সাধারণ মানুষের চোখে এটি নিঃসন্দেহে শাস্তি। কারণ, একবিংশ শতাব্দীতে রান্নার গ্যাস আর বিলাসিতার বিষয় নয়। দেশের কোটি কোটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবন এর উপর নির্ভরশীল। তাই গৃহস্থালির এলপিজিকে সরকার বরাবরই সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসাবে বিবেচনা করে এসেছে। সেই কারণেই প্রান্তিক মানুষদের জন্য উজ্জ্বলা যোজনা চালুর কথা বারবার বুক ঠুকে জানান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদি। সেখানে প্রশাসনিক নিয়ম কার্যকর করার নামে সাধারণ মানুষের উপর এভাবে আর্থিক চাপ চাপিয়ে দেওয়া কতটা ন্যায়সংগত, সেটাই এখন সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন। কোনো কোনো ডিস্ট্রিবিউটরের দাবি, তাঁদের অর্ধেকেরও বেশি গ্রাহকের ই-কেওয়াইসি এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। কিন্তু তার মানে তো এটা নয় যে, তাঁরা সবাই নিয়মভঙ্গকারী বা প্রতারক।

Advertisement

বরং বাস্তব চিত্র আরও জটিল। অনেক ক্ষেত্রে যাঁর নামে গ্যাস সংযোগ, তিনি কর্মসূত্রে অন্যত্র থাকেন। কোথাও মূল গ্রাহক মারা গিয়েছেন, কিন্তু পরিবারের সদস্যরা সেই সংযোগ ব্যবহার করছেন। বহু প্রবীণ নাগরিক ডিজিটাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন না। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রযুক্তিগত সমস্যা, বায়োমেট্রিক অর্থাৎ হাতের ছাপ কিংবা চোখের মণি না মেলা, নথিপত্র সংক্রান্ত জটিলতাও কম নয়। আবার অনেকেই হয়তো বারবার চেষ্টা করেও বিভিন্ন প্রশাসনিক সমস্যার কারণে কাজ সম্পূর্ণ করতে পারেননি। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে তাঁদের একধাক্কায় ভরতুকির আওতার বাইরে সরিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই জনমুখী সিদ্ধান্ত হতে পারে না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এর আগে তেল সংস্থাগুলিই জানিয়েছিল যে, ই-কেওয়াইসি না হলেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হবে না। কেবল ভরতুকির অর্থ অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে না। কিন্তু এখন সেই অবস্থান বদল করা হচ্ছে। সরকার যদি নিজেই বারবার নিয়ম বদলায়, তাহলে বিভ্রান্তি আরও বাড়ে। সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে এর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। অনেক পরিবার রান্নার গ্যাসের ব্যবহার কমাতে বাধ্য হবে। কেউ কেউ আবার কাঠ, কয়লা বা অন্যান্য দূষণকারী জ্বালানির দিকে ফিরে যেতে পারেন। ফলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি লক্ষ্য ফের মুখ থুবড়ে পড়বে।
সরকার ও তেল সংস্থাগুলির যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং এলপিজি বিক্রিতে লোকসান সামাল দিতেই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু প্রশ্ন হল, সরকারের আর্থিক চাপ কমানোর সবচেয়ে সহজ পথ কি সাধারণ গ্রাহককে শাস্তি দেওয়া? লোকসানের বোঝা কেন এমন পরিবার বহন করবে, যারা কেবলমাত্র কোনো কারণে ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ করতে পারেনি? ই-কেওয়াইসি বাধ্যতামূলক হোক, তাতে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু তার জন্য প্রকৃত গ্রাহককে আর্থিক শাস্তি দেওয়া কি কোনো সুস্থ প্রশাসনের লক্ষণ? বিশেষ করে পর্যাপ্ত সচেতনতা, সহজ প্রক্রিয়া এবং বাস্তবসম্মত সময়সীমা ছাড়াই। প্রয়োজনে ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে বাড়ি গিয়ে যাচাই, বিশেষ শিবির যাচাই, অ্যাপভিত্তিক পরিষেবা, প্রবীণ ও অসুস্থদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ করানোর দায়িত্ব সরকারের। আর সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার মূল্য তাহলে কেন নাগরিককে চোকাতে হবে? সরকার এখনও চাইলে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিককে সহযোগিতা করা, ভয় দেখানো নয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ