Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

কপিরাইট সুরক্ষার রকমারি

কপিরাইট খেয়েছিস ভাই? দেখ কতদিনে মুক্তি মেলে!’— ‘ইয়ং বংদের চেনা সংলাপ। অথবা আপনার বয়স যাই হোক, আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোরাফেরা করেন, তাহলেও এই সংলাপ আপনার চেনা লাগবে। যদি সে দুনিয়ায় বিচরণের সুযোগ নাও হয়, তাহলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রয়েছেন।

কপিরাইট সুরক্ষার রকমারি
  • ৫ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০

আইনে কপিরাইট সংক্রান্ত কী কী সুবিধা পেতে পারেন? আলোচনায় আইনজীবী মিন্টু চক্রবর্তী এবং সাইবার আইন বিশেষজ্ঞ রাজর্ষি রায়চৌধুরী।

Advertisement

কপিরাইট খেয়েছিস ভাই? দেখ কতদিনে মুক্তি মেলে!’— ‘ইয়ং বংদের চেনা সংলাপ। অথবা আপনার বয়স যাই হোক, আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোরাফেরা করেন, তাহলেও এই সংলাপ আপনার চেনা লাগবে। যদি সে দুনিয়ায় বিচরণের সুযোগ নাও হয়, তাহলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রয়েছেন। অর্থাৎ রবীন্দ্রসঙ্গীতের উপর থেকে কপিরাইট উঠে যাওয়ায় নানা মুনির নানা মত নিশ্চয়ই কানে গিয়েছে। ফলে ‘কপিরাইট’ বিষয়টা যে নেহাত জলবৎ তরলং নয়, এটা বোঝা সহজ। কপিরাইট আইন আদতে কী? আইনজীবী মিন্টু চক্রবর্তী জানালেন, নিজস্ব কর্মদক্ষতা দিয়ে সৃজনশীল ও প্রতিভাযুক্ত কাজকে আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য দ্য কপিরাইট অ্যাক্ট ১৯৫৭-র উৎপত্তি। অর্থাৎ সৃজনশীল কর্মদক্ষতাকে এই আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়া হয়। সেকশন ২ কপিরাইট অ্যাক্ট ১৯৫৭-য় ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে কে বা কারা সৃজনশীল ব্যক্তি এবং কোন ধরনের কাজ সৃজনশীল কাজের আওতায় পড়বে। 
যে কোনও সৃজনশীল কাজের উপর কপিরাইট হতে পারে। লেখা, ছবি আঁকা, গান, ছবি তোলা— এগুলো সবই কপিরাইটের আওতাভুক্ত। সাইবার আইন বিশেষজ্ঞ রাজর্ষি রায়চৌধুরীর কথায়, ‘যে কোনও সৃজনশীল কাজ যেদিন থেকে প্রকাশিত হচ্ছে, সেদিন থেকে তার উপর কপিরাইট ধরা হয়। ধরা যাক, কেউ একটা কবিতা লিখে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করলেন। যে তারিখে পোস্ট হল, সেই তারিখ থেকে কপিরাইট ধরা হবে। যবে থেকে মানুষের সামনে এল, তবে থেকে স্রষ্টার কপিরাইট হল।’
সৃজনশীল কাজের উপর ‘কপিরাইট’ প্রয়োগ করতে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নেওয়ার গুরুত্ব কতটা? মিন্টু ব্যখ্যা করলেন, কপিরাইট অ্যাক্ট অর্থনৈতিক অধিকার এবং নৈতিক অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। এই আইনের ধারায় সেকশন ৪৪ থেকে ৫০এ-তে আলোচনা করা হয়েছে কীভাবে সৃজনশীল কাজকর্মকে কপিরাইট আইনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করা যাবে। ‘রেজিস্ট্রেশন অব কপিরাইট বাধ্যতামূলক নয়। রেজিস্ট্রেশন না করলে কপিরাইট হবে না, এমন নয়। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন করে নিলে ভালো হয়। কারণ, যদি রেজিস্ট্রেশন থাকে, এবং কপিরাইট লঙ্ঘন হয়, তাহলে আদালতে মামলা করা যাবে’, বললেন রাজর্ষি। 
কপিরাইট চালু তো হল। কিন্তু কতদিন তা কার্যকর থাকবে? কপিরাইট অ্যাক্ট ১৯৫৭ সেকশন ২২-২৯-এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সৃজনশীল ব্যক্তিরা তাদের সৃজনশীল কাজকে এই আইনের আওতায় কতদিন পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারবে। সাহিত্য, নাটক, বাদ্যযন্ত্র, বা শৈল্পিক কাজের সঙ্গে যুক্তদের মৃত্যুর দিন থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত সৃজনশীল কাজের উপর এই আইনের সুরক্ষা পাবেন। কোনও ব্যক্তি যদি তাঁর সৃজনশীল কাজ প্রকাশিত হওয়ার আগে মারা যান, তারপর যদি সেই সৃজনশীল কাজ প্রকাশিত হয়, তাহলে প্রকাশিত হওয়ার দিন থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত এই আইনের আওতায় প্রকাশিত কাজ সুরক্ষিত থাকবে। এধরনের কাজকে সাধারণত ‘মরণোত্তর প্রকাশনী’ বলা হয়। স্রষ্টার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার ‘কপিরাইট হোল্ড’ করে। ‘ল অব সাকসেশন’ অনুযায়ী স্রষ্টার উত্তরাধিকারীরা মামলা করতে পারেন। রাজর্ষির কথায়, ‘একটা বাড়ির উত্তরাধিকার যেভাবে পাবেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, এটার উত্তরাধিকারও তেমন ভাবেই পাবেন। এটাও একটা সম্পত্তি, এটাকে বলে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি।’ 
কপিরাইট লঙ্ঘন হলে কী করণীয়? মিন্টু জানালেন, সৃজনশীল ব্যক্তির কাজ আইনত অনুমতি না নিয়ে ব্যবহার করলে, এই আইন অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা (সিভিল) এবং ফৌজদারি মামলা (ক্রিমিনাল) করা যেতে পারে। দু’ভাবেই সাজা হতে পারে। কপিরাইট অ্যাক্ট ১৯৫৭, সেকশন ৫৪ থেকে ৬২-এ দেওয়ানি মামলা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ৬৩-৬৯-এ ফৌজদারি মামলার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দেওয়ানি মামলা করতে গেলে ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট জুরিসডিকশনে আবেদন করতে হবে। ফৌজদারি মামলা করতে গেলে মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এই ধরনের মামলায় হস্তক্ষেপ করতে পারবেন। 
‘কপিরাইট অ্যাক্ট ১৯৫৭’ এখনও পর্যন্ত মোট ১২বার সংশোধন করা হয়েছে। ২০১২-র সংশোধনে বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন সৃজনশীল ব্যক্তি কী কী সুবিধা পেতে পারেন তা কপিরাইট আইনে আলোচনা ও সংশোধন করা হয়েছে। 
শুধুমাত্র মানব বুদ্ধিমত্তার উপরই কপিরাইট থাকতে পারে। কিন্তু এআই-এর যুগে কোনটা যন্ত্রের কারসাজি, আর কোনটা মানুষের তৈরি তা বোঝা সহজ নয়। 
রাজর্ষি ব্যাখ্যা করলেন: ধরুন, এআইকে একটা কমান্ড দিলাম। এআই একটা ছবি এঁকে দিল। এটা কি আমি নিজস্ব কাজ বলতে পারি? কমান্ড তো আমিই দিয়েছি। তাও এটা নিজস্ব কাজ বলা যাবে না। এআই জেনারেটেড কাজের ক্ষেত্রে কপিরাইট কখন হবে, তা নিয়ে এখনও পর্যন্ত ভারতীয় আইনে কোনও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। আবার সফটওয়্যারে কেউ একটা কোড লিখলেন। অথবা সফটওয়্যার ডিজাইন করলেন, কেউ কোনও ওয়েবসাইট ডিজাইন করলেন, ভারতীয় আইনে এটার কিন্তু কোনও কপিরাইট নেই। মার্কিন আইন অনুযায়ী আবার এর কপিরাইট হবে। অনেক বড় কোম্পানি মার্কিন মুলুকে নিজেদের অফিস রয়েছে, খাতায়-কলমে এমন দেখিয়ে কপিরাইট করিয়ে নেন। একবার কপিরাইট হয়ে গেলে সারা পৃথিবীতে সেটা প্রযোজ্য। 
সৃজনশীল কাজের কতটা অংশ কপিরাইট যোগ্য নয়? কোনও মিউজিক ট্র্যাক ১০ সেকেন্ডের কম চালালে কপিরাইটের কোনও সমস্যা থাকবে না বলে জানালেন রাজর্ষি। এর থেকে বাঁচার উপায়? তাঁর পরামর্শ, ‘কোনও ব্যক্তির সৃজনশীল কোনও সৃষ্টির অংশ ব্যবহার করলে স্রষ্টাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। অথবা তাঁর অনুমতি নিতে হবে। তা না করলে স্রষ্টা আইনত ব্যবস্থা নিতে পারেন। এছাড়াও যে কোনও সার্চ ইঞ্জিন থেকে ছবি ব্যবহার করলে দেখে নিতে হবে, সেটা ‘লাইন্সেসেবল’ নাকি ‘ফ্রি প্রোডাক্ট’। লাইসেন্স হোল্ডার হলে তাঁর অনুমতি ব্যতীত ব্যবহার হলে তিনি মামলা করতে পারেন।’   
স্বরলিপি ভট্টাচার্য

সম্পর্কিত সংবাদ