সুজয় সরকার, হিলি: আলো-আড়ম্বরের থিমে নয়, ঐতিহ্য, রীতি ও বিশ্বাস আজও বালুরঘাটের হোসেনপুর এলাকার চৌধুরী পরিবারের ডাকরাচণ্ডী পুজোর মূল আকর্ষণ। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ডাকরাচণ্ডীর পুজো এবছর ৩৮৯ বছরে পড়ছে। এই পুজো এলাকায় জমিদার সুধীর চন্দ্র চৌধুরীর পুজো নামে পরিচিত। তাঁর পিতা জমিদার শশীভূষণ মণ্ডলকে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা চৌধুরী উপাধি প্রদান করেছিলেন।
এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু ঘটনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। কথিত আছে, এক সময় এই অঞ্চল ঘন জঙ্গল ও আত্রেয়ী নদীর প্রবাহপথ ছিল। সেই জঙ্গলে পঞ্চবটী বনে ঋষিরা পঞ্চমুণ্ডীর আসনে দেবী দুর্গার সাধনায় মগ্ন থাকতেন। কাল প্রবাহে সেই আসন মাটির তলায় চাপা পড়ে যায়। পরে চৌধুরী পরিবারের পূর্বপুরুষ রামচন্দ্র মণ্ডল স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেই আসন উদ্ধার করে এই দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। এরপর থেকে স্থানীয় ডাকরা মৌজা ও চণ্ডী সাধনার বিষয় দু’টি যুক্ত হয়ে এখানকার মা দুর্গা ‘ডাকরাচণ্ডী’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
পরিবারের বর্তমান সদস্যরা জানিয়েছেন, জন্মাষ্টমীতে কাঠামো পুজোর মধ্যদিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। রীতি মেনে পেরেক ব্যবহার না করে বাঁশ, খড় ও আঠা দিয়ে তৈরি হয় প্রতিমা। প্রতি বছর নতুন করে এক কাঠামোতে ডাকের সাজে প্রতিমা তৈরি করা হয়। ষষ্ঠীতে প্রতিমার রং ও চক্ষুদান করা হয়। তবে একটা সময় পর্যন্ত এই পুজোতে বংশানুক্রমিক ভাবে মৃৎশিল্পী, পুরোহিত, পুজোর জোগাড়ি, ভোগ রান্নার ঠাকুর ও ঢাকি বংশপরম্পরায় অপরিবর্তিত থাকলেও বর্তমানে সে নিয়মে পরিবর্তন এসেছে। বৈষ্ণব মতে আয়োজিত এখনকার পুজোয় দিনে দেবীর ভোগে থাকে মিষ্টি, পায়েস, লুচি ও ফল। রাতে দেওয়া হয় নিরামিষ অন্নভোগ। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে যথাক্রমে সাত, আট ও নয় রকম ভাজায় ভোগ দেওয়া হয়।
ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত সন্ধ্যায় পরিবেশিত হয় মঙ্গলচণ্ডীর পালা গান। অষ্টমীতে পুষ্পাঞ্জলি দিতে প্রচুর ভক্ত মায়ের মন্দিরে ভিড় জমান। নবমীর দিন সন্ধ্যারতির পরে মায়ের চরণ থেকে ফুল পড়ার দৃশ্য দেখতে বহু ভক্ত উপস্থিত হন। দশমীর সকালে মন্দির প্রাঙ্গণে আগুন নাচ ও চামুণ্ডার মুখা নৃত্য পরিবেশিত হয়। বিজয়া দশমীতে চৌধুরী বাড়ির সামনে দেবীকে বরণ করে ও আশীর্বাদ নিয়ে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে করে আত্রেয়ী নদীতে প্রতিমা নিরঞ্জন করেন। একটা সময় পর্যন্ত নিয়ম মেনে নদীতে বিসর্জনের আগে প্রতিমা নৌকোতে করে সাত পাক ঘোরানো হতো। ১৯৯০ সালের পর থেকে এই নিয়ম বন্ধ হয়েছে। চৌধুরী পরিবারের বর্তমান সদস্য ও পুজো উদ্যোক্তা সুপ্রিয় কুমার চৌধুরী এই পুজোর আয়োজন করছেন। তিনি বলেন, পারিবারিক পুজো হলেও এই পুজোতে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। নিজস্ব চিত্র