Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

রোমাঞ্চে ভরা গ্র্যান্ড বেঙ্গল সাফারি

জলদাপাড়া, চিলাপাতা ও গোরুমারার জনপ্রিয়তাকে অনেকটাই নিজের কাছে টেনে আনতে সক্ষম শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি। উত্তরবঙ্গের প্রধান শহর শিলিগুড়ি, উওর-পূর্ব ভারতের মূল প্রবেশদ্বার ও একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক শহর।

রোমাঞ্চে ভরা  গ্র্যান্ড বেঙ্গল সাফারি
  • ১৯ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০

জলদাপাড়া, চিলাপাতা ও গোরুমারার জনপ্রিয়তাকে অনেকটাই নিজের কাছে টেনে আনতে সক্ষম শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি। উত্তরবঙ্গের প্রধান শহর শিলিগুড়ি, উওর-পূর্ব ভারতের মূল প্রবেশদ্বার ও একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক শহর। এই শহরের কাছে সালুগাড়ায় ২৯৭ একর জমিতে শাল, শিরীষ, সেগুন ও অর্কিডের ঘেরাটোপে তৈরি বন্যপ্রাণীদের মুক্ত বনাঞ্চল নর্থ বেঙ্গল ওয়াইল্ড লাইফ অ্যানিমাল পার্ক যা বেঙ্গল সাফারি পার্ক নামে পরিচিত। পর্যটকদের কাছে এটি এমনই একটি পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে, যা না দেখলেই নয়। এটি শহরের অন্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে এখন বেশ আকর্ষণীয় জায়গা হয়ে উঠেছে। রীতিমতো রোমাঞ্চিত হবেন এই পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখার পর।
প্রতিবার শীতে যাযাবর পাখিদের শীতকালীন আস্তানা গাজলডোবায় একবার হলেও যাই। কিন্তু সাফারি পার্ক যাওয়া হয়ে ওঠে না। এবার তাই একমাস পূর্বে অনলাইন টিকিট বুকিং করে যাওয়া একেবারে পাকাপাকি করে নিলাম। শিলিগুড়ি স্টেশন থেকে সালুগাড়ায় সাফারি পার্ক ঘণ্টাখানেকের পথ। নির্দিষ্ট দিনে শিলিগুড়ি স্টেশন থেকে টোটো করে পৌঁছে গেলাম বেঙ্গল সাফারি পার্কে। বন্যপ্রাণীদের এই ছোট্ট পৃথিবী যেন অপেক্ষা করেছিল আমাদের একটি সুন্দর রোমাঞ্চে ভরা দিন উপহার দেবে বলে।
পার্কের প্রবেশপথ খুব সুন্দর। দু’পাশে সুবিশাল বনস্পতি। চারদিকে সবুজে মোড়া ঘন বনাঞ্চল ও তারই মাঝে সারি সারি সুউচ্চ বৃক্ষ আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। দমকা বাতাসের দাপটে মর্মরিত তার শাখাপ্রশাখা। শান্ত, নিস্তব্ধ বনাঞ্চলে মাঝে মাঝেই তা সৃষ্টি করে চঞ্চলতা। প্রবেশপথ ধরে সোজা কিছুটা এগিয়ে গেলে চোখে পড়বে টিকিট ঘর ও পার্কে প্রবেশের মূল গেট। গেটে টিকিট পরীক্ষা করে সাফারি গাড়ির নম্বর দেওয়া হয়। তারপর ভিতরে প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়। এখানে এক অন্য ধরনের সাফারির অভিজ্ঞতা হল। কম্বো সাফারি ও গ্র্যান্ড সাফারি। এই দুই ধরনের সাফারি এখানে হয়ে থাকে। সাফারিগুলো আবার চারটি ভাগে বিভক্ত, যেমন টাইগার সাফারি, লেপার্ড সাফারি, হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার সাফারি ও মিক্সড হার্বিভোর সাফারি। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল গ্র্যান্ড সাফারি কারণ উল্লেখিত চারটি ভাগই এই সাফারির অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও রয়েছে জয় রাইড যা এলিফ্যান্ট সাফারি নামে প্রচলিত। সাফারি পার্ক সোমবার ব্যতীত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৫০ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন সাফারির জন্য নির্ধারিত টিকিট মূল্য আছে। অনলাইন বা অফলাইন দু’ভাবেই টিকিট করা যায়। সাফারির গাড়িগুলো এসি টেম্পো ট্রাভেলার। বড় বড় কাচের জানালা ও সবদিক দিয়ে সুরক্ষিত। বেশিরভাগ জাতীয় উদ্যানে হুড খোলা জিপসি গাড়িতে সাফারি করানো হয়ে থাকে। তাই বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার একটা আতঙ্ক সর্বদা মনে কাজ করে। বিশেষ করে বাচ্চাদের সুরক্ষার জন্য এই গাড়িগুলো যথাযথ।
আমরা গ্র্যান্ড সাফারিটাই নিয়েছিলাম। তাই সব ধরনের প্রাণীরই দেখা মিলল। খুব কাছ থেকে দেখতে পেলাম চিতাবাঘ, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার, চিতল হরিণ, ময়ূর ইত্যাদি। অনেক পশু-পাখি দেখে বেশ এক তৃপ্তি অনুভব করছিলাম মনে মনে। কাচের জানালা দিয়ে এত কাছ থেকে বন্যপ্রাণীদের দেখতে পেয়ে শিশুরা যেমন আনন্দে উচ্ছ্বসিত, আমরাও তেমনই চরম উন্মাদনায় বিরল মুহূর্তের ছবি ক্যামেরা বন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এত কাছ থেকে এতকরম পশুর দেখা মিলবে তা সাফারিতে যাওয়ার আগে বুঝিনি। তাই ভীষণ রোমাঞ্চ আর উত্তেজনা অনুভূত হচ্ছিল মনে মনে। কোথা দিয়ে যে সময় কেটে গেল খেয়ালই পড়ল না। মনে হল যেন এক নিমিষেই কেটে গেল এক ঘণ্টার গ্র্যান্ড সাফারি। 
সাফারির পর এবার নেচার পার্ক ঘুরে দেখার পালা। সাফারির টিকিটের সঙ্গেই এই পার্ক ঘুরে দেখার মূল্য ধরা থাকে, তাই আলাদা করে আর টিকিটের প্রয়োজন হয় না। পার্কে রয়েছে একটি জু, বনসাই গার্ডেন, কুমির প্রকল্পের জন্য তৈরি পুকুর, নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার। এছাড়াও রয়েছে মেডিসিনাল প্ল্যান্ট গার্ডেন বা ওষুধ তৈরির নানারকম গাছ। খাবারের জন্য ফুড কোর্ট, ক্যাফেটেরিয়া প্রভৃতি অনেক কিছুই আছে। এই নেচার পার্ক সম্পূর্ণ ঘুরে দেখতে একটা পুরো দিনের প্রয়োজন। 
নিঝুম দুপুর, দূরে ডাকছে কত নাম না জানা পাখি। ঘন জঙ্গলের অনেকটাই ভিতরে চলে এসেছিলাম বেশ খানিকটা পথ। এবার তাই ফেরার পথ ধরে এগতে লাগলাম। নাহলে সন্ধে নামলে আবার পথ ঠাহর করে ফেরা কঠিন হয়ে উঠবে। কিন্তু মন মানতে চাইছিল না। সে তখনও কোন গহন বনের অন্তরে বাস করছে। সুন্দর একটি দিনের রোমাঞ্চে ভরা কিছু গল্প ও কথা নিয়ে সাফারি শেষ করে ঘরে ফিরে এলাম।
কীভাবে যাবেন ও কোথায় থাকবেন: শিয়ালদহ বা হাওড়া থেকে ট্রেনে অথবা বাসে করে নিউ জলপাইগুড়ি কিংবা শিলিগুড়ি আর সেখান থেকে টোটো,অটো বা গাড়ি করে সালুগাড়া। শিলিগুড়িতে থাকার অনেক উন্নত মানের হোটেল রয়েছে।

Advertisement

তপন কুমার মুখোপাধ্যায়

সম্পর্কিত সংবাদ