শোভন চন্দ, কলকাতা; উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিক। কলকাতায় থিয়েটার তৈরি নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বিনোদিনীকে টাকা জোগাড়ের দায়িত্ব দিলেন গিরিশ ঘোষ। ঠিক হল, বিনোদিনীর নামেই হবে এই থিয়েটার। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ১৮৮৩ সালে বিডন স্ট্রিটে তৈরি হল থিয়েটার। কিন্তু নাম রাখা হল স্টার। তৎকালীন সভ্য সমাজের যুক্তি ছিল, বিনোদিনী দাসির নামে থিয়েটারের নামকরণ হলে, বাবুরা কেউ আসবেন না। এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হবেন না। আত্মজীবনী ‘আমার কথা’য় সেই আক্ষেপ ও বঞ্চনার কথা লিখেছেন বিনোদিনী। পরের দিকে হাতিবাগানের কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে (অধুনা বিধান সরণি)-এ স্টার থিয়েটার তৈরি হয়। কিন্তু সুবিচার মেলেনি। মাঝে কেটে গিয়েছে ১৪১ বছর। সম্প্রতি বিনোদিনীর নামে স্টার থিয়েটারের নতুন নামকরণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ এই সংগ্রাম ও স্বপ্নপূরণের কথা তুলে ধরছে ভবানীপুর ৭৫ পল্লি। ৬১তম বর্ষে তাদের এবারের পুজোর থিম ‘বিনোদিনী’। নেতাজি ভবন মেট্রো গেট থেকে বেরলেই মিলবে থিয়েটার পাড়ার আমেজ। শিল্পী অভিজিৎ নন্দীর কথায়, কাঠের বোর্ডের কাট-আউট, প্লাই, বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে মণ্ডপ। ঢোকার মুখে উপরে দু’দিকে গ্যালারির মতো তৈরি করা হয়েছে। যেখানে নানা ধরনের কাট আউট দিয়ে সাজানো হবে। সঙ্গে গিরিশ ঘোষ, রামকৃষ্ণ ও বিনোদিনীর বড় বড় কাট-আউট লাগানো হবে। মায়ের মূর্তি গড়ছেন শিল্পী পরিমল পাল।
ইতিহাসের ঘোর কাটলে ঢুকে পড়তে পারেন হাজরা পার্কে। ১৯৪২ সালে প্রান্তিক মানুষজনের জন্য পুজো শুরু করেছিলেন তৎকালীন কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। স্থান বদলেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে অভিনবত্ব। ৮৩তম বর্ষে তাদের থিম দৃষ্টিকোণ। শিল্পী বিমান সাহার কথায়, এবার মণ্ডপজুড়ে রঙের খেলা। রং দিয়ে দেখানো হয়েছে সমাজের নানা স্তরকে। কুর্নিশ জানানো হয়েছে নানা কালজয়ী সৃষ্টিকে। মণ্ডপের একাংশে ঘরের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। যেখানে রঙিন দরজা-জানালার ফাঁকে রোজকার খেটে খাওয়া মানুষের কথা উঠে এসেছে। অন্যদিকে, রঙের কৌটো সাজিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মোনালিসার ছবি, যামিনী রায়ের নানা শিল্পকর্ম। মা এখানে রণংদেহি নন। রঙের ভাবনা ছুঁয়েছে মাতৃমূর্তিকেও। ২৭ ফুটের দুর্গা মায়ের শাড়ির আঁচলে রঙ করতে ব্যস্ত পুত্র গণেশ। সরস্বতী ব্যস্ত আলপনা দিতে। লক্ষ্ণী একমনে প্যাঁচার গায়ে রং করে চলেছেন। পুজোর আয়োজক সায়নদেব চট্টোপাধ্যায় জানান, এবারে তাদের বাজেট প্রায় ৩২ লক্ষ।
রঙের জগত থেকে বেরিয়ে ফিরতে হবে শিকড়ে। ৭৫ বছরে ভবানীপুর অবসর সর্বজনীনের ভাবনা ‘গোড়ার কথা’। আজকের দ্রুত গতির জীবনে দুর্বল হয়েছে পারিবারিক বন্ধন। হারিয়েছে সেই একান্নবর্তী আমেজ। মানুষ ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর, যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। তাই শিকড়ে ফিরে দেখার বার্তা দিয়েছে ভবানীপুর অবসর। নেপথ্যে শিল্পী বিমল সামন্ত। মূলত বাঁশ দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপ। মায়ের মূর্তিতে রয়েছে সাবেকিয়ানার ছোঁয়া।